শিক্ষা, সভ্যতা আর দরিদ্র-দরদের তো বড়ই বড়াই করো.

savarবেশ ক’রাত থেকে ভালো ঘুম হচ্ছে না। ঘুম হচ্ছে না বললে ভুল হবে, আসলে ঘুমুতে পারছি না। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখা সাভার ট্র্যাজেডির মর্মস্পর্শী ছবি আর ভিডিওচিত্র হৃদয়কে এতোটাই ভারাক্রান্ত করে তুলেছে যে, দু’চোখের পাতা এক করলে ধংসস্তুপের ভেতোরের সে ভয়ঙ্কর, বিভৎস লাশের ছবি ও সচলচিত্রগুলো মন-জমিনে কঠিন কুঠারাঘাত করে। থেকে থেকে কেঁপে উঠি। চোখ ভিজে যায়। এপাশ ওপাশ করে কেটে যায় রাত ছেঁড়াফাড়া ঘুমে। সত্যি বলতে কি, সাভারের ভয়াবহ ধংসস্তুপের সংবাদ এবং ছবি হৃদয়টাকে এতোটাই দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে যে, দেশ থেকে বহু দূরে কানাডার এই ক্যালগেরি শহরেও নিদ্রাদেবী স্বস্তিতে বসতে পারছে না আমার চোখের ‘পরে। বুক বয়ে ভারি নিঃশ্বাস ঝরে, সাভারের ধংসযজ্ঞ যেনো ছড়িয়ে আছে আমারই ঘরে।

বাংলাদেশের রাত তো আরো কষ্টের। পাহাড়তুল্য ভারী শোকের চাদরে ঢাকা। দেশের নরম মনের মানুষগুলোর মনের অবস্থা বুঝতে কষ্ট হয় না। সেখানে এমন কষ্টের রাত কাটতে চায় না! দুরবস্থাপূর্ণ এমন দুঃসময় সময় হাঁটতে চায় না!  চরম দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের মর্মস্পর্শী আহাজারি, করে রেখেছে বাতাস ভারি। লাশের ওপরে লাশ! গড়ে উঠছে লাশের স্তুপ!! বাইতে পারছে না বাংলার মাঝি লাশের তরি! অঙ্গ হারানো; প্রিয়জনের সঙ্গ হারানো মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাসে, হাওয়ায় এখন দুঃখ ভাসে; সময় পোড়ে শোকের তাপে।

কতো মানুষ হয়েছে লাশ? ধ্ববংসস্তুপে কতো অভাগার আটকে গেছে শ্বাস? মিলবে না সে হিসেব কোনোদিন। হতভাগাদের স্বজনরাই শুধু খুঁজে ফিরবে ভারি বাতাসে প্রিয়জনের মুখ; আর রাতের আকাশে তারার মাঝে…., বধূ খুঁজে ফিরবে স্বামীকে, পিতা খুঁজে ফিরবে তার সন্তানকে, সন্তান খুঁজবে পিতাকে, ভাই বোনকে ও বোন ভাইকে। অন্যদিকে আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, খুব একটা বেশী সময় অপেক্ষা করতে হয় না আর একটা ‘সাভার ট্র্যাজেডি’ দেখার জন্য। হায় নিয়তি! তবে কি বাঙ্গালী হয়ে জন্মটাই মহাপাপ? যার প্রায়শ্চিত্য করতে হচ্ছে এতোটা নির্মম, নিদারুণভাবে! দেশ ছেড়ে বাইরে যারা আছেন, এ থেকে তাদেরও যেনো  মুক্তি নেই। রাজনৈতিক নোংরামি আর ভন্ডামিময় অস্থিরতা, স্বস্তি-শান্তির অনিশ্চয়তা যেভাবে দিনে দিনে ভয়াবহরকম গ্রাস করছে বাংলাদেশকে তাতে বাঙ্গালী চিত্ত দেশে বা বিদেশে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই  থাকুক না কেনো, নিত্ত অশান্তিতে ভোগে। মিডিয়ার এই স্বর্ণালি যুগে প্রচার মাধ্যমে নিমিষের মধ্যেই প্রচারিত ‘ব্যাড নিউজ’গুলো প্রবাসী দেশপ্রেমি বাঙ্গালীদের রীতিমতো ‘ম্যাড’ করে তোলে। আর আমাদের এতোটাই দুর্ভাগ্য যে, ব্যাড নিউজের পর ব্যাড নিউজ! গুড নিউজ শোনাটা যেনো ভাগ্যের ব্যাপার। এর ওপর দু’চারদিন বাদে বাদে সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসিনতা, দায়িত্বহীনতা, নগ্ন স্বার্থপরতা কিংবা ঘৃণিত দুর্ণীতির বলি হয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনা-দুর্ঘটনা, লাগাতার প্রাণহানির সংবাদ এই প্রবাস জীবনে মনকে চরম ভারাক্রান্ত করে তোলে; পাশাপাশি তা বিদেশীদের কাছে আমাদের দিন দিন আরো ক্ষুদ্রাকায় করে ফেলছে। বড় কষ্ট লাগে এসব নিয়ে ভাবলে!

বলার অপেক্ষা রাখে না, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের একটা শক্ত অবস্থান গড়ে উঠেছে। কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রলিয়ার মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের কদর লক্ষনীয়। এটা আমাদের জন্য যেমন অহঙ্কারের বিষয়; তেমনি দেশীয় বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক উত্তরণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ সোপান হিসেবে তা বিবেচিত। কিন্তু একের পর এক গার্মেন্টস শিল্পে যেসব ন্যাক্কারজনক এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল দ্বারা যেভাবে কচুকাটা হচ্ছে, তাতে এই শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আগামীতে কতোটা টিকে থাকতে পারবে সেটাই এখন প্রশ্ন। বিশেষ করে, সদ্য সাভার ট্র্যাজেডির অবর্ণনীয় মর্মস্পর্শী ঘটনার সংবাদ, ছবি ও ভিডিওচিত্র মিডিয়ার মাধ্যমে বিদেশীদের হৃদয়েও গভীর বেদনার ছাপ ফেলেছে। দরিদ্র, অসহায় শত শত মানুষের এহেন মৃত্যু বিশ্ববিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে আজ কোয়ালিটি বা মূল্যের কারণে নয়, উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশে তৈরীকৃত পোশাক বর্জনের দাবী তুলেছেন অনেকেই মানবিক কারণে। এসব দেশের ক্রেতা-বিক্রেতা এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর অনেককেই সাভার ট্র্যাজেডির পর বলতে শোনা যাচ্ছে, “এমন নিষ্ঠুর পরিবেশে তৈরি কাপড় এনে আমরা আমাদের মানুষজনকে ৫-১০ ডলারে কিনে পরতে বলতে পারিনা। এখন হয় অন্য বাজার খুঁজতে হবে নতুবা এসব পোশাক স্থানীয়ভাবে তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।” এটা যে জাতির জন্য কতোটা ভয়াবহ অশণি সংকেত, সেটা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। বলাবাহুল্য, আধুনিক বিশ্বের অন্যসব উন্নত দেশের মতো আমেরিকা, কানাডার নামী-দামী ব্রান্ডের চেইন ষ্টোরগুলোতে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের ব্যাপকতা বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এমনিতেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লাগাতার হরতালের কারণে গার্মেন্টস শিল্পের হাতে হেরিকেন উঠতে শুরু করেছে। বিদেশী ক্রেতারা মহাবিরক্ত! এরই মধ্যে এমন সব ঘটনা-দুর্ঘটনা! ‘ কয়েক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সংস্থা (বিজিএমইএ) হরতালের বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল এতে তাদের ব্যবসায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হবে।’

এসব কথা আজ কাকেই বলবেন, আর কাকেই বা বোঝাবেন! দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কথাই বলুন আর শিল্প, সমাজপতিদের কথাই বলুন; সকলেই এখন আপন ধান্ধায় আন্ধা হয়ে গান্ধা পথে ছুটছে গতিহীন! এক’শ মিটার ট্র্যাকের স্পিন্টার! লক্ষ্য তাদের একটাই, অর্থ। কার আগে কে অর্থ হাসিল করবে সেটাই বড় বিবেচ্য। সেসব পঁচা কথা লিখতে গেলে খাতাটাও নোংরা হয়ে যায়! অন্তত: এই ক্ষণে নোংরা করতে চাই না আমার খাতাটা।

শেষ করবো শাহিনার কথা দিয়ে, যে নিজের জন্য নয়, বাঁচতে চেয়েছিলো দেড় বছরের বাচ্চাটার জন্য। যে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন মৃত্যুকুপে বদ্ধ হয়ে ছটফট করছিলো নিজের খাবারের জন্য নয়; বাচ্চাটাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য। যার হৃদয়চেরা একটাই আর্তনাদ ছিলো, প্রাণাধিক প্রিয় শিশু সন্তানটির কাছে ফিরে যাওয়া। কিন্তু শাহিনার ভাগ্যে কোনোটাই জোটেনি। বাঁচতে পারেনি সে সন্তানটির জন্য। তুলে দিতে পারেনি সন্তানের মুখে বুকের দুধ, হয়নি তার প্রিয় সন্তানের কাছে ফিরে যাওয়া। সীমাহীন যন্ত্রণাময় দুরবস্থায় নিষ্পেষিত হয়ে, স্বপ্নভঙ্গের দুঃসহ বেদনা নিয়ে বিদায় নিয়েছে শাহিনা। এক শাহিনাকে আমরা খুব কাছে থেকে জেনেছি, কিন্ত এর বাইরে যে আরো কতো মা, বোন, ভাই আরো কতো কষ্ট, যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ধংসস্তুপে ইহধাম ত্যাগ করেছেন তা আমাদের অজানা। এবং অজানাই থেকে যাবে। ঘরে ফিরে অসুস্থ সন্তান বা বাবা-মায়ের জন্য অসুধ কিনবে, ক্ষুধার্থ সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেবে, কিন্তু লোভী মালিক শ্রেনীর ইচ্ছের বলি হয়ে ঘরে ফেরার আগেই তাদের ছাড়তে হয়েছে দুনিয়া! বাতাসে কান পাতলেই আজ তাদের অতৃপ্ত আত্মার কান্না শোনা যায়। শোনা যায় বাঁচার আঁকুতিপূর্ণ ভারি আর্তনাদ!

সাভারের ধংসস্তুপে শাহিনাদের করুণ মৃত্যু বস্তুত আমাদের জন্য এক ধিক্কার। অভিশাপ। শাহিনার সন্তানসহ যে স্ত্রী হারিয়েছে তার স্বামীকে, যে সন্তান পিতাকে, যে পিতা সন্তানকে, ভাই বোনকে ও বোন ভাইকে….তাদের সকলের চোখে আজ আমরা অনেক বড় অপরাধি। এ অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। তাদের অশ্রুভরা শোক-সিক্ত বোবা দৃষ্টিতে একটাই প্রশ্ন, তোমরা কেউই তো পারলে না আমাদের স্বজন ও প্রিয়জনদের জীবনের নিরাপত্তাটুকু দিতে! শিক্ষা, সভ্যতা আর দরিদ্র-দরদের তো বড়ই বড়াই করো……।

mhniru@gmail.com

২ মে, ২০১৩, ক্যালগেরি, কানাডা।

 

 

mhniru@gmail.com'
লেখক, সাংবাদিক, পাক্ষিক ক্রীড়ালোক এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক রোববারের প্রাক্তন নিবার্হী সম্পাদক।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login