নির্বাক বসন্ত [মোট ২৫ পর্ব], পর্ব-১৮

Filed under: উপন্যাস |

পর দিন সকালে ডিউটিতে যেয়ে দেখে জাহাজ প্রায় অর্ধেকের বেশি লোড হয়ে গেছে। নিশাত সব গুলি ট্যাঙ্ক একে একে ঘুরে ঘুরে দেখে এসেছে। পাম্প ম্যানের সাথে ঘুরছে। সে কোন ভাল্ব কি ভাবে কোন দিকে ঘুড়িয়ে খুলছে বন্ধ করছে, গেট ভাল্বের পাশে পাইপ লাইনের সাথে স্পিড মিটারে দেখল ঘণ্টায় ২৪০ টন বেগে তেল আসছে। সব কিছু কৌতূহল নিয়ে দেখছে। অরুণ অফিস রুমে। এর আগে ডিজেল দেখেছে সাধারণ বোতলে ভরা কিন্তু এমন বিশাল ট্যাঙ্কে এত ডিজেল দেখে নিশাত অবাক হচ্ছে। ডিজেলের গন্ধে কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠল বমি বমি ভাব লাগল। এই তেলের এমন গন্ধ! এর আগে তো কখন এমন মনে হয়নি। একটু পরে অরুণ’দা এলে জিজ্ঞেস করল
দাদা, আমাদের দেশে যে ডিজেল দেখেছি সে গন্ধ আর এই গন্ধের মধ্যে এমন তফাত কেন?
গন্ধ একই, পার্থক্য হলো তুমি এই এত বিশাল পরিমাণ তেল কখন এক সাথে দেখনি তাই এমন লাগছে,
আমার কিন্তু বমি এসে গিয়েছিল
তাই না কি?
তা হলে তো সমস্যা। ট্যাংকারে কাজ করলে কত গ্রেডের তেল নিতে হবে, একেক তেলের একেক রকম গন্ধ তোমাকে সহ্য করতে হবে। আচ্ছা শোন তুমি বেশী করে লেবু খাবে, বুঝেছ?
কেন, লেবু খেলে কি হবে?
তেলের যে গ্যাস শ্বাসের সাথে যায় তা কিছুটা ক্ষতি করে। লেবু ওটা একটু কমাতে সাহায্য করে।
ও, আচ্ছা ঠিক আছে খাব।
ওদের ডিউটির মধ্যেও জাহাজের লোড শেষ হয়নি। ওরা চলে গেল আবার মুকিত ভাই তার সঙ্গী সাথী সহ এসে অরুণকে জিজ্ঞেস করল
আর কতক্ষণ লাগবে?
দেরী আছে তোমরা শেষ করতে পারবে মনে হচ্ছে।
বেশ ভালো, তা হলে এই সময়েই শেষ হোক আমি তাই চাইছিলাম।
আচ্ছা ঠিক আছে নাও তুমি যতটা পার কর তার পরে আমরা এসে শেষ করে সেইল করবো, তা হলে থাক আমরা চললাম।
নিশাত এসে গোসল সেরে খেয়েই শুয়ে পরল। ঠিক ৬টায় ডিউটিতে গেল। যেয়ে দেখে এখনো অরুণ বা তার সাথের আর কেউ আসেনি। এখনও শেষ হয়নি?
এইতো কাছা কাছি এসেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ে যাবে!
মুকিত ভাই জিগ্যেস করল
কি নিশাত ঘুম হলো?
হ্যাঁ এই একটু, সময়ের সব কিছু ওলট পালট হয়ে গেছে তো মানিয়ে নিতে একটু সময় নিবে।
কেমন লাগছে এখানে?
খুব ভালো, তবে মা বাবাকে ছাড়া কখন কোথাও এত লম্বা সময়ের জন্য থাকিনি তাই একটু খারাপ লাগে মাঝে মাঝে।
ও কিছু না, দেখবে এক সময় সব অভ্যাস হয়ে যাবে। আমরাও কি থেকেছি, কিন্তু দেখ এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, মানুষের জীবনটাই এরকম।
হ্যাঁ মুকিত ভাই তবুও আমার ভাগ্য ভালো যে আপনাকে পেয়েছি আর অরুণ’দাও বেশ ভালো মানুষ। সবাই ভালো। আমি চিন্তা করছি আমার বন্ধু হাবিবের কি অবস্থা
হাবিব কে?
আমার বন্ধু, আমরা এক কলেজে পড়তাম, আমাদের বাড়িও এক জায়গায়, আবার এখানে এসেছিও এক সাথে, ও ফরিদা জাহাজে গেছে।
ও, ফরিদা?
হ্যাঁ
তা হলে কোন চিন্তা করো না ওখানে অনেক বাংলাদেশি আছে। দেখ আজ সেইল করার পর ওদের ডেকে দেখবে ও যদি ব্রিজে থাকে তা হলে কথা বলতে পারবে।
হ্যাঁ অরুণ’দা সেদিন বলেছে। দেখি আজ চেষ্টা করবো।
এমন সময় অরুণ এলে মুকিত ভাই বিদায় নিয়ে চলে গেল। তার সাথে থাকা অন্যান্য লোক জন সবাই গেল। এখন জাহাজের লোডিং প্রায় শেষ পর্যায়ে। অরুণ এবং সবাই ভীষণ দৌড়া দৌড়ীর মধ্যে, এই ট্যাঙ্ক থেকে ওই ট্যাঙ্কে যাচ্ছে দেখছে আর অরুণ নির্দেশ দিচ্ছে কোন ট্যাঙ্কে লোড শেষ হয়েছে ওটা বন্ধ করতে বলছে। প্রায় সব ট্যাঙ্কে লোড হয়ে গেছে এখন সর্ব শেষ ট্যাঙ্কে চলছে। জেটির লোক জনকে ডেকে জেটির পাশে দাড় করিয়ে রেখেছে আর অরুণ ট্যাঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে কখন বন্ধ করতে হবে। নিশাত পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। নিশাত দেখতে পেল নির্দিষ্ট জায়গায় আসার একটু আগেই জেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে স্টপ বলে দিল আর সাথে সাথে লোকটাও তার হাতের ওয়াকি টকি দিয়ে স্টপ বলল। তেলের গতি কমে এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। জাহাজের পাইপের গেট ভাল্ব বন্ধ করে সব গুলি ট্যাঙ্কের সব মুখ বন্ধ করে আটকিয়ে দিল। একটু পরে যারা পাইপ কানেকশন দিয়েছিল সেই গাড়ি এসে জেটির পাশে দাঁড়াল। এবার অন্য দুই জন লোক ওই আগের লোকদের মত পোশাক পড়নে এসে পাইপ খুলে জেটিতে উঠিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেল। একটু পরে আবার ভিন্ন এক গাড়ি নিয়ে এলো আরও দুই জন। হাতে কত গুলি বোতল আর মাপার ফিতা নিয়ে। নিশাত শুধু দেখে যাচ্ছে। জাহাজের ট্যাঙ্কের তেল মাপার যে সাউন্ডিং পাইপ সেখানে থেকে তেল তুলে বোতলে ভরে জাহাজের নাম, তেলের নাম, তারিখ এই সব লিখে একটা করে লেবেল বোতলের গায়ে লাগিয়ে নিলো। এর পর কি একটা পেস্টের মত ফিতায় বাধা একটা পেন্ডুলামের গায়ে লাগিয়ে ওই মুখ দিয়ে ট্যাঙ্কের ভিতর ছেড়ে ট্যাঙ্কে কত ফুট তেল আছে তা মেপে একটা খাতায় টুকে রাখল আর পেন্ডুলামে যে গোলাপি রঙের পেস্ট লাগিয়েছিল তার রঙ পরিবর্তন হয়েছে কি না তা দেখছে। ট্যাঙ্কে পানি থাকলে না কি এর রঙ বদলে নীল হয়ে যায়। এর পর প্রতিটি ট্যাঙ্কে থার্মো মিটার নামিয়ে তেলের তাপ দেখে ওই খাতায় লিখে নিয়েছে। এগুলি শেষ হলে ওদের নিয়ে অরুণ’দা তার অফিস রুমে চলে গেল হিসেব করতে। হিসেব নিকেশ সেরে ওরা চলে গেল আর সবাই অপেক্ষায় রইল কখন পাইলট এসে জেটির বাইরে নিয়ে যাবে।

প্রায় বিশ পঁচিশ মিনিট পর পাইলট এসে জাহাজে উঠে সরাসরি অরুনের সাথে ব্রিজে গেল। জেটি থেকে জাহাজের সিঁড়ি নামিয়ে নেয়া হলো। ওরা ব্রিজে যাবার পর ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়ার অর্ডার দিয়ে দিল। এক এক করে পিছন থেকে রশি খুলে যে টাগ বোট এসেছিল তারা রশি বেধে টেনে জাহাজ ঘুড়িয়ে নিয়ে জেটি ছেড়ে বের করে দিল। বাইরে এসে সোজা চালিয়ে এক বারে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেল। পাইলটকে নামিয়ে নেয়ার জন্য পিছনে একটা পাইলট লঞ্চ আসছিল, বাইরে এসে জাহাজ থামিয়ে দিলে লঞ্চটা জাহাজের গায়ে এসে ভিড়ল আর পাইলট নেমে গেল। এবার ফুল স্পিডে জাহাজ চালিয়ে দিয়ে নিশাতকে ব্রিজে ডেকে নিয়ে গেল।
ব্রিজে এসে দেখে জাহাজ সামনে এগিয়ে চলছে স্পেনের দিকে। শাহিন স্টিয়ারিং করছে। অরুণ গ্রে বাহরাইনকে ডেকে বাহরাইন ছেড়ে যাবার সংবাদ জানিয়ে দিল। এর একটু পরেই গ্রে বাহরাইনকে ডেকে স্পেনে কখন পৌঁছাবে বলে দিল। প্রায় ঘণ্টা খানিক হয়ে গেছে জাহাজ রাস্তানুরাহ ছেড়ে এসেছে। ফাঁকে ফাঁকে অরুণ রাডারে দেখে নিচ্ছে আশে পাশে কোন জাহাজ আছে কি না। বন্দরের কাছে বলে সব সময় জাহাজ আসা যাওয়া করে এই জন্যে এত সাবধানতা। শ খানিক মাইল দূরে চলে গেলে এত সাবধানতার দরকার হয় না। স্টিয়ারিং হুইলের সামনে একটা লিকুইড ম্যাগনেটিক কম্পাস, উপরে জাইরো কম্পাসের মনিটরে দেখল জাহাজ কত ডিগ্রীতে চলছে।
জগে কফির পানি গরম দিয়ে জিগ্যেস করল
কফি খাবে?
হ্যাঁ।
হাবিবকে একটু দেখবেন পাওয়া যায় কিনা!
দাঁড়াও দেখছি।
ভিএইচএফের রিসিভার হাতে নিয়ে আবার ফরিদাকে ডাকল। সাথে সাথে ফরিদা থেকে হান্নান নামের এক জন জবাব দিল।
কি হান্নান, তোমরা কোথায়?
আমরা কুয়েতে
কবে এসেছ?
গত পরশু
যাবে কবে?
কি জানি হয়তো আগামী পরশু হয়ে যাবে আমাদের এখনও লোডিং শেষ হয়নি
কোথায় যাবে?
টোকিও যাব
তোমরা কোথা থেকে এসেছ?
আমরা ডান্ডি থেকে লন্ডন হয়ে এখানে এসেছি, হান্নান শোন, তোমাদের ওখানে হাবিব নামে বাংলাদেশ থেকে একজন নতুন এসেছে?
হ্যাঁ এসেছে, কেন?
ওর এক বন্ধু নিশাত আমাদের এখানে এসেছে। হাবিব কি ব্রিজে আছে?
হ্যাঁ আছে একটু অপেক্ষা কর ডেকে দিচ্ছি।
হ্যাঁলো আমি হাবিব বলছি!
হাবিব, আমাকে তুমি চিনবে না। আমি প্যাসিফিক ম্যারিনারের চিফ অফিসার অরুণ , তোমাদের চিফ অফিসার হান্নান আমার বন্ধু। তোমার বন্ধু নিশাত এইতো আমার সঙ্গে আছে।
ও আচ্ছা, অরুণ’দা নিশাত ভালো আছে?
হ্যাঁ তা মনে হয় ভালোই আছে। আচ্ছা হাবিব তুমি নিরু নামে কাউকে চেন?
নাতো, কেন কি ব্যাপার?
এদিকে অরুণ যখন হাবিবের সাথে এসব কথা বলছে তখন নিশাত অরুণের মুখ থেকে হঠাৎ নিরুর নাম শুনে চমকে উঠল। কি ব্যাপার দাদা এ নাম জানল কি করে? ওহ! ওই যে জেটিতে লিখার সময় দেখেছে তাই মনে করে রেখেছে।
না, তেমন কিছু না তবে তোমার বন্ধু আজ বাহরাইনের সিতরা জেটিতে এই নামটি লিখে রেখে এসেছেতো তাই ভাবলাম তুমি হয়ত চেন। আচ্ছা ঠিক আছে এমনিই একটু ফান করলাম। নাও নিশাতের সাথে কথা বল।
হ্যালো হাবিব
নিশাত তুই কেমন আছিস কবে জাহাজে উঠেছিস কেমন লাগছে ওখানে কি তোরা সবাই বাঙালি?
এক নিশ্বাসে হাবিব অনেক গুলি প্রশ্ন করে একটু থামল। এবার নিশাতের পালা।
থাম থাম, এক সাথে এত গুলি প্রশ্ন করলে জবাব দেব কি করে? যাক তোর সন্ধান যখন পেয়েছি তখন সামনা সামনি কথা হবে যখন তখন সব বলব।
দেখা হবে না কি?
একই লাইনে চলাচল আমাদের  কাজেই দেখা অবশ্যই হবে।
[চলবে। এতক্ষণ নিশাতের সাথে নিরুর চায়ের নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকুন। ধন্যবাদ]

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন