জুলিয়ান সিদ্দিকী

ধারাবাহিক উপন্যাস: কালসাপ-১০

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

ভোরের দিকে বেতের জঙ্গলে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে এলোপাথারি গুলির ট্যাশ ট্যাশ  শব্দও ভেসে আসে। হোসেন মৃধা বললো, আর বুঝি রক্ষা হইলো না! চলো এহান থাইক্যা সইরা যাই!

বেতের জঙ্গলের লেলিহান আগুন পটপট শব্দে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গুলির শব্দও এগিয়ে আসতে থাকে। কোনো কোনো গুলি তাদের মাথার উপর দিয়ে গাছের ডাল-পাতা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যায়। সে সময় বাতাসে শীস কাটার মত একটি বিচিত্র শব্দ তাদের পলকের জন্য হলেও স্তব্ধ করে দিয়ে যায়। এমন অবস্থায় হোসেন মৃধার ঠিক কানের পাশ দিয়ে একটি গুলি বেরিয়ে গিয়ে মমতার খোঁপা খুলে দিয়ে গেলে আতঙ্কিত হোসেন মৃধা আর মমতা দুজনেই গড়িয়ে পড়ে মাটির উপর। তখনই কি হইলো মমতা? বলে এগিয়ে আসতে নিলে অকস্মাৎ একটি গুলি হরি ঘোষের পিঠ-বুক বিদীর্ন করে দিলে তৎক্ষনাৎ রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

মমতা তার বাবার এ অবস্থা দেখে হামাগুড়ি দিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আকূল হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে।

হাসেন মৃধা খানিকটা রুক্ষ্ম স্বরে বলে ওঠে, অখন কান্দনের সুযুগ নাই! কখন কার উপরে গুল্লি লাগে ঠিক নাই!

তারপরই সে চান্দভানুকে ইশারা করে মমতাকে তুলে নিতে। আর তখনই আরো একঝাঁক গুলি মাথার উপর আমগাছের ডাল-পাতা ছিন্নভিন্ন করে বাতাসে শিস কেটে বেরিয়ে যায়।

আগে আগে হোসেন মৃধা পাশের কচুরিপানা ভর্তি ডোবাটায় নেমে পড়ে বললো, আর পলানের জাগা নাই। বাঁচন মরণ অখন নিজের কাছে। যার মরণের শখ হয় হ্যায় জানি পানিতে লড়াচাড়া করে।

জুলেখা আর চান্দভানু মিলে প্রায় কাঁধে করে মমতাকে পানিতে নামায়। ঘন আর লম্বা কচুরিপানার আড়ালে চারজনের দলটি কোনোরকমে আত্মগোপাপন করে।

হোসেন মৃধা বললো, কোনা আওয়াজ আর লড়াচড়া নাই। মনে করতে হইবো আমরা মইরা গেছি।

এত সাবধানতার পরও মমতা কান্না থামাতে পারলেও হেঁচকি বন্ধ করতে পারে না। হেঁচকির তোড়ে ক্ষণেক্ষণে কেঁপে উঠছিলো তার পুরো শরীর। সেই সঙ্গে কেঁপে উঠছিলো আশপাশের কচুরিপানাগুলোও।

শঙ্কিত আর বিভ্রান্ত জুলেখা হঠাৎ চাপা স্বরে বলে উঠলো, থাম ছেরি! তর কারণে আমাগ সবতেরে মরতে হইবো!

ঠিক তখনই ডোবার পাশের বেত জঙ্গলেরর শেষ অংশটুকু পুড়ে যাওয়ার খানিক পরই বেশ কজন খাইক পোশাক পরা অদ্ভুত দর্শন লোক দেখা যায় ডোবার পাশে। মাথায় সবুজ রঙের টুপি লাগানো। তার উপর লাগানো আছে মোটা সুতার জাল।

হোসেন মৃধা তাকিয়ে থাকলেও সে যেন স্থবির হয়ে পড়েছে। যেন তার দিকেই জ্বলজ্বলে একটি চোখে তাকিয়ে আছে কানা আজম। আজ আর বাঁচার আশা নেই। যাও একটা সম্ভাবনা ছিলো, তাও যেন হারিয়ে গেল কানা বদমাশটার কারণেই। আসন্ন মৃত্যুভয়ে চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে যায় সে।

তখনই মতিউর রহমানের কণ্ঠ শুনতে পাওয়া যায়, মিরধা তর মতন অত বলদ না! হ্যায় কি আর এই গ্যারামে আছে।

হয়তো মতিউর রহমানের কথা শুনেই কানা আজম ডোবার দিকে পেছন ফেরে। খানিকটা জোর দিয়ে সে বললো, হ্যায় গ্যারামে না থাকলে আমাগরে মারতে আইছিলো ক্যামনে?

তখন আছিলো। তুই বাইচ্যা গ্যাছস দেইখ্যা বউ-মাইয়া লইয়া পলাইছে। আর না পলাইয়া কি উপায় আছিলো? জানে তুই ফিরা গিয়া আমারে খবর দিবি!

কথা বলতে বলতে হয়তো দলটি ফিরে যেতে থাকে। কানা আজমকে বলতে শোনা যায়, তাইলে হরি ঘোষের লাশ আইলো কোনখান থাইক্যা?

মতিউর রহমান হয়তো কিছু বলে। কিন্তু কথাগুলো দূরত্বের কারণে বোঝা যায় না। কথাবার্তার শব্দ তরঙ্গ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়।

এর পর বেশ কিছু সময় কেটে গেলেও আর কোনো সাড়া-শব্দ শোনা যায় না। ওরা উৎকর্ণ হয়ে থাকলেও তেমন কোনো ভারী শব্দ শুনতে পায় না। এভাবে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জুলেখা হঠাৎ ফিসফিস স্বরে বলে উঠলো, গেল গিয়া মনে কয়!

হোসেন মৃধা তেমনি স্বরে জানালো, কওন যায় না। দুই একজন পাহারায় থাকলেও থাকতে পারে!

আর এ কথা শুনে জুলেখার পুরো শরীর যেন আরো বেশি আড়ষ্ট হয়ে যায়।

দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তবুও ডোবার পানিতে আত্মগাপন করে থাকা চারজনের দলটি ডাঙায় উঠতে সাহস পায় না। হোসেন মৃধার হাঁটুর নিচ থেকে দু পায়ে কোনো বোধ নেই। সে পা দুটোকে সামান্য নাড়তে চেষ্টা করলে তা ভালোভাবে টের পায়। নিজের এ অবস্থা দেখে সে ভাবে যে, বাকি তিনজনের অবস্থাও হয়তো তারই মত। আরো কিছুক্ষণ পানিতে থাকলে কোমর অবধি বিবশ হয়ে যেতে পারে ভেবে তার আরো বেশি ভয় হয়। ডোবার পাশের ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর পানি থেকে ডাঙায় উঠে পড়াটাই নিরাপদ বলে মনে হয়। কেউ পাহারায় থাকলে ঘন অন্ধকারের কারণে টর্চের আলো না ফেলা পর্যন্ত তাদের দেখতে পাবে না। এখন যতটা সম্ভব শব্দ না করে ডোবার ধারে শুকনো জায়গায় উঠে বসতে হবে। তাই সে চান্দভানুর কানে মুখ লাগিয়ে বললো একজন একজন করে পারে উঠে যেতে। পানিতে যেন কোনোরকম ঝুপঝাপ শব্দ না হয়।

বাবার তো একটা কিছু করতে হইবো! বলতে পারলেও শেষের দিকে ফুঁপিয়ে উঠলো মমতা। আর তখনই অকস্মাৎ ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাটির যেখানে তারা উঠে বসার পরিকল্পনা করেছিলো, ঠিক সেদিক থেকেই একটি টর্চের নিস্তেজ আলো তাদের মাথার উপর দিয়ে ঘুরে যায়।

দলটি ফের স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পানিতে। কিছুটা সময় অতিবাহিত হলে, চান্দভানু হোসেন মৃধার পিঠের সঙ্গে লেগে কানে মুখ লাগিয়ে বললো, কেউ পাহারায় আছে মনে কয়! ওইডারে না সরানি গেলে তো আমগো পানিতেই মরণ হইবো লাগে!

হোসেন মৃধা বললো, মনে কয় মুক্তি! টর্চ একবারের বেশি মারে নাই। রাজাকার হইলো ঘনঘন লাইট মারতো। আলো এমন অল্প হইতো না! তাও সাবধানের মাইর নাই। মনে কয় একজন।

চান্দভানু বললো, লগে বন্দুক থাকতে পারে!

এর পরই কানে কানে দলটির মাঝে খানিকক্ষণ শলা-পরামর্শ চলে। হোক মুক্তি কিংবা রাজাকার। তাদের পানি থেকে উঠতেই হবে। যার ফলে সিদ্ধান্ত হয় যে, তিনজন তিনদিক দিয়ে পাহারায় বসা লোকটির পেছন দিক দিয়ে পৌঁছুতে চেষ্টা করবে। হোসেন মৃধা যাবে সামনে দিয়ে। তার ধারণা গুলি করতে হলেও লোকটিকে টর্চ জ্বালাতে হবে। আর এক হাতে টর্চ আরেক হাতে বন্দুক তুলে গুলি করা খুব একটা সহজ নয়। তবুও যতটা সম্ভব নিজকে নিরাপদ রেখে এগোতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী টর্চ জ্বালানোর মুহূর্তটিতেই যতটা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হামলা করতে হবে।

চান্দভানু দা আর ট্যাটা হাতছাড়া করেনি। মমতা আর জুলেখার হাতে কিছু নেই। তবে, চান্দভানু তাদের বললো, আমি ট্যাটা দিয়া ঘাই মারনের লগে লগেই তরা দুইজনে চাইপ্যা ধরবি!

তিনজন নারী অন্ধকার ঝোঁপের আড়ালে কোনো রকম উচ্চ শব্দ ছাড়াই পাড়ে উঠে যেতে পারলেও হোসেন মৃধা পানি থেকে উঠে জমিনে বুক রাখতেই অন্ধকার থেকে হাসনের কণ্ঠ ভেসে আসে, বাবা!

হাছন! বলেই কেমন নেতিয়ে পড়ে হোসেন মৃধা। তখনই হাসন এগিয়ে এসে হোসেন মৃধার পিঠে হাত রাখে। সারাদিনের উৎকণ্ঠা, ভয় আর ক্লান্তি সব যেন একই সঙ্গে জাপটে ধরেছে তাকে।

চান্দভানু ছুটে এসে হাসনকে ধরে শঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠলো, খবর পাইলি ক্যামতে বাজান?

মতি মামুর দলে আমগো মানুষ আছে। হ্যায় খবর কইছে, তিনটা মাইয়া মানুষ আর একজন পুরুষ মিল্যা রাইতের আন্ধারে কানা আজম আর তার দলেরে ধরছিলো। কিন্তু বাবা, মা আর জুলেখা ছাড়া আরেকটা মাইয়া মানুষ কে?

মমতা। হরি ঘোষের মাইয়া।

হরি কাকু গুল্লি খাইছে হুনছি!

হরি ঘোষের প্রসঙ্গ উঠলে, ঠিক তখনই মমতা হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠে।

হাসন মমতার মাথায় হাত রেখে বললো, অহন কান্দনের সময় না মমতা! বাপের রক্তের শোধ লইতে হইবো না! কানলে গুল্লি চালাইবা ক্যামনে?

আমারে একটা বন্দুক দ্যাও! বলেই মমতা অকস্মাৎ হাসনের একটি হাত আঁকড়ে ধরে অন্ধকারের ভেতর।

(চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to ধারাবাহিক উপন্যাস: কালসাপ-১০

  1. স্বপ্নবাজ হংসরাজ নভেম্বর 4, 2010 at 6:28 অপরাহ্ন

    (*) (*) (*) (*) (*) (*) (*)

  2. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 5, 2010 at 9:46 পূর্বাহ্ন

    এ উপন্যাসে শহিদ হরি ঘোষ দেশের অন্যান্য শহিদদের প্রতিনিধি। আমি চেষ্টা করছি এক একটি ঘটনা দিয়ে তখনকার পুরো দেশটির অবস্থান তুলে ধরতে।

    অকস্মাৎ একটি গুলি হরি ঘোষের পিঠ-বুক বিদীর্ন করে দিলে তৎক্ষনাৎ রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।

    -এখানে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ধন্যবাদ মনসুর আহমেদ।

  3. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 5, 2010 at 9:47 পূর্বাহ্ন

    ধন্যবাদ রনি হায়দার।

  4. snmhoque@yahoo.com'
    আজিজুল নভেম্বর 7, 2010 at 8:02 পূর্বাহ্ন

    :rose: খুবই ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে চোখের সামনের ঘটনা

You must be logged in to post a comment Login