তাহমিদুর রহমান

ছোটগল্প: ভালবাসার জয় হোক

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

ঠিক বারটা দশ মিনিটে হাসানের মাথায় বজ্রপাত হল। বজ্রপাতে তার শরীরের মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার কথা কিন্তু তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সে ঢাকা থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে বাসে করে রওনা হয়েছিল এগারটা বিশ মিনিটে। কুমিল্লা এখনো এগার কিমি মত বাকি। এরই মধ্যে বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এটাই বাসের শেষ টিপ। তারপর অহনাকে সাথে নিয়ে আজ ঘুরতে গিয়ে টিউশানির সব টাকা শেষ করে ফেলেছে সে। পকেটে মাত্র এগার টাকা। অটোরিক্সায় করে যাওয়ারও রাস্তা বন্ধ। ভেবেছিল বাসে করে কুমিল্লা পৌঁছুতে পারলেই মেসে যাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা নেই। তাই হাসানের মাথায় বজ্রপাত ছাড়া আর কি পড়তে পারে?

বাস থেকে নামতেই বৃষ্টির পানির ফোঁটা তার সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। একে তো শীতের রাত তারপর আবার বৃষ্টি। ঠান্ডায় অন্তরআত্না পর্যন্ত কেঁপে কেঁপে উঠছে।

আশে পাশে একটা পেট্রোল পাম্প স্টেশন ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লোকজন দৌঁড় দিয়ে সেখানেই ভীড় জমাচ্ছে। লোকজন বলতে জনা দশেক। শেষ টিপ বলে লোকজনও তেমন নেই। মাথায় বৃষ্টির পানি মুছতে মুছতে বেশিরভাগই বাসওয়ালাকে গালাগাল দিচ্ছে। মনেহয় বৃষ্টিটাই ড্রাইভার আর হেল্পারকে মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল।

হাসান চুপচাপ ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠিক বাস নষ্ট হওয়ার আগে পর্যন্ত দিনটা খুব ভাল ছিল। আজ সে আর অহনা সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। হাসানের শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্ট হওয়া বাকি। আর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী অহনা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে হাসানের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে।

সকালে বেশ রোদ ছিল। রোদ চশমা পড়ে অহনা যখন হাসানের সামনে এসে দাড়াল তখন নটা বেজে কুড়ি মিনিট। ঢাকা শহরে এটাই সকাল। হাসান ইতিমধ্যেই অস্থির হয়ে পড়েছিল। মনে মনে স্থির করছিল, অহনাকে আজ বুঝাবে অপেক্ষা করতে কেমন লাগে? তার কিছু পরে ও যখন অহনাকে আসতে দেখল তখন এসব বেমালুম ভুলে গেল। যাদের ভালবাসার মানুষ আছে তারা খুব সহজেই অনুভব করতে পারবেন হাসানের অনুভূতি।

– সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল। তুমি এত সকালে বাসে উঠবে আমি ভাবিনি। রাগ করো না লক্ষীটি। অ্যাই এ্যাম ভেরি ভেরি সরি।

অহনা এসেই হাসানকে বলে। হাসান উত্তর না দিয়ে গোমড়া মুখে তাকিয়ে থাকে। এবার অহনাও কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

–          সরি বললাম তো।

হাসান এবার উত্তরে মিষ্টি করে হাসি দিয়ে দেয়। অহনাও হাসে। আজ ওরা একসাথে রিক্সায় ঘুরবে।

–          কোথায় যাবে হাসান? কিছু ঠিক করেছ?

–          আমি তো ভাবলাম তুমি ঠিক করবে। হাজার হলেও তোমার ঢাকা।

–          আমার ঢাকা?

–          নাতো কি? তুমি ঢাকার বাসিন্দা। আমি দূরের মানুষ। সেই কুমিল্লার।

–          ছাই কুমিল্লার। কুমিল্লা আর ঢাকা তো একই।

–          জ্বী না ম্যাডাম। যাহা চমচম তাহা রসগোল্লা নয়।

–          তার মানে ঢাকা রসগোল্লা?

–          এই দেখ তুমি রেগে যাচ্ছ। এই জন্যে বললাম তোমার ঢাকা।

–          মোটেও আমি রাগি নাই।

–          হে হে……

–          ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে হাসবে না।

–          হা হা ……আমি হে হে হা হা করে হেসেছি। মানুষ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে, হাসে না।

–          ঐ হলো।

ঠিক এসময় একটা রেষ্টুরেন্টের সামনে দিয়ে রিক্সা যাচ্ছিল। অহনা রিক্সাওয়ালাকে থামতে বলে। হাসান অবাক হয়ে বলে,

–          এখানে কি?

–          নাস্তা করবে চল।

–          আমি নাস্তা করিনি তোমাকে কে বলল?

–          কে আবার বলবে? আমি তোমাকে চিনি না? পাঁচ বছর ধরে আমাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছ।

হাসান এবার দাঁত বের করে হাসে। বলে,

–          এটা বিয়ের পরের ডায়লোগ হয়ে গেল না।

–          আমার দূর্ভাগ্য বিয়ের আগেই বিয়ের পরের অবস্থা। চল তাড়াতাড়ি।

–          যা হুকুম ম্যাডাম।

বৃষ্টির মাদল আরো বেড়েছে। হাসান অনেকটাই ভিজে গিয়েছে। তবু বৃষ্টির দিকে তেমন মনোযোগ নেই। অহনা যে কিভাবে ওকে এত সহজে বুঝতে পারে, ভাবে হাসান। ও কি অহনাকে বুঝতে পারে? মনে হয় পারে না। ও সারাজীবন যে মেয়েগুলোর সাথে মিশেছে অহনা তাদের মত নয়। একটু অন্যরকম। সে সকালে নাস্তা না করে দেখা করতে গেলে অহনা ঠিকই বুঝে ফেলে। সকালের নাস্তার কথা মনে হতে হাসান বুঝতে পারে, তার খিদে লেগেছে। রাত্রে মেসে খাবে বলে রাতের খাবার খাওয়া হয়নি।

লোকজনের মধ্যে একজন পুলিশ দেখে আজকের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। ও আর অহনা নাস্তা করেই পল্টনের দিকে ঘুরতে বের হয়েছিল। ওরা জানত না যে ওখানে আজ এক রাজনৈতিক দলের জনসভা। ওদেরকে দেখে হঠাৎই কোথা থেকে যেন র‍্যাব এসে হাজির। সোজা দুজনকে র‍্যাবের ভ্যানে গিয়ে তুলল। তারপর আধঘন্টা ধরে চলল জিজ্ঞাসাবাদ। হাসান খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অহনা একদম ভয় পাইনি। একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। তারপর আধঘন্টা পর শাহবাগের মোড়ে ছেড়ে দিয়েছে।

শীতের কাঁপুনিতে হাসান বাস্তবে ফিরে আসে। রাত সাড়ে বারটা বাজে। একে একে সবাই চলে গিয়েছে। কিন্তু হাসান কি করবে বুঝতে পারে না। পেট্রোল পাম্প ষ্টেশনের ক্যাশে বসে থাকা লোকটির যেন একটু দয়া হল। তিনি হাসানকে বললেন,

–          ভাই আজকের রাতটা আমার এখানেই কাটিয়ে দিন। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

হাসানের মন তাতে সাঁই দিল না। সে বলল,

–          না ভাই। আমি ঠিক চলে যাব।

এটা বলেই বৃষ্টির মধ্যেই হাসান পায়ে হেঁটে রওনা দিয়ে দিল। মনে মনে বলল, ভালবাসার জয় হোক।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


6 Responses to ছোটগল্প: ভালবাসার জয় হোক

  1. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল নভেম্বর 11, 2010 at 9:03 পূর্বাহ্ন

    স্বাগতম , শৈলীতে ।কাহিনীতে বর্ণনায় হয়তো কিছুটা ভিন্নতা আছে ,সহজ ভঙ্গিমা ভাল লাগল । ছাপায় একটা ভুল আছে ,বারবার শব্দটা “টিপ ” এসেছে , বোধহয় শব্দটা ট্রিপ হবে ।

  2. নীল নক্ষত্র নভেম্বর 11, 2010 at 11:23 পূর্বাহ্ন

    ভালবাসা তো সবসময়ই জয়ি। ভালবাসার কোন বিনাশ নেই।

  3. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 18, 2010 at 8:15 অপরাহ্ন

    শৈলীতে স্বাগতম। শব্দ ব্যবহারে আপনার দুর্বলতা আছে। সম্মতি অর্থে সায়। সাঁই এর অর্থ ভিন্ন। :rose:

You must be logged in to post a comment Login