নীল নক্ষত্র

গোল্ডি সাহেব এবং স্কটিশ সুন্দরীর গল্প

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page


(লেস্টারে আমি যেখানে ছিলাম তার পাশের এবে পার্ক)
আমার ঈদের ছুটি শেষ হবার দু দিন আগেই অফিস থেকে ফোন এলো, ডেভিড ফোন করেছে। কে, তোমার ঈদ শেষ হয়েছে?এখানে একটু বলে রাখি আমার নাম এই ইংরেজদের উচ্চারণ করতে খুব কষ্ট হয় বলে আমিই বলে দিয়েছি তোমরা আমাকে কে বলে ডাক। হ্যা, কেন কি ব্যাপার? এদেশে সাধারনত ছুটি কাটাবার সময় নিতান্ত জরুরী কোন ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত কাজের জায়গা থেকে ফোন করে বিরক্ত করে না। তাই আমি একটু অবাক হলাম। কে একটু সমস্যায় পরেই তোমাকে ফোন করছি। আমি বললাম কি হয়েছে খুলে বল। বলছি, সাউথ ওয়েলসের ব্রীজেন্ড এর সনি কোম্পানি তো তুমি চেন তোমাকে কাল ওখানে যেতে হবে, বস একথা বলার সময় তোমার ছুটি শেষ হয়নি বলে খুব ইতস্তত করছিলো কিন্তু তুমি ছাড়া হচ্ছেও না কারন এর আগের বার তুমিই ওখানে গিয়েছিলে ওদের ক্যামেরায় কি যেন হয়েছে। আচ্ছা ঠিক আছে ডেভিড, তুমি বসকে বল আমি কালই ট্রেনে করে চলে যাব।

তারপর ব্রীজেন্ড এসে মেশিনের মত একটানা এক মাস কেটে গেল, সবচেয়ে অসুবিধা হয়েছে খাবারে। বিলাতে এতদিন থাকলেও বিলাতি খাবারে অভ্যস্ত হতে পারিনি তবুও নিরুপায় হয়ে পিজা, স্যান্ডউইচ, ডোনার কাবাবের সাথে নান রুটি, চিপস এই সব খেয়েই দিন গুলি পার করেছি আর কবে কাজ শেষ করতে পারব সেই দিন গুনেছি। সময়ের অভাবে লেখালেখির কোন কাজ করতে পারছি না এমনকি মেইল টাও দেখতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত কাজ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তার আগের দিন অফিসে বস ক্রিসের কাছে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আগামী কাল দুপুরের মধ্যে এখানকার কাজ শেষ হবে এখন কি করবো বল। ক্রিস বললো ঠিক আছে কে তুমি অপেক্ষা কর আমি দেখছি কি করব। পরদিন সকালে ক্রিস বললো এন্ডি আগামী কাল বিকেলে ব্রাউনকে সোয়ান সী নামিয়ে দিয়ে তোমাকে নিয়ে লেস্টার আসবে এখানে পিটার আছে তুমি আর পিটার এখানেই থাকবে ওই তোমার থাকার ব্যবস্থা করবে তুমি এন্ডির সাথে যোগাযোগ রেখ ও কখন পৌছাতে পারে জেনে নিও। আচ্ছা ঠিক আছে ক্রিস। ধন্যবাদ জানিয়ে রেখে দিলাম। দুপুরে এন্ডিকে ফোন করে জানলাম সে বিকেল ৫টার মধ্যে আসতে পারে।
সব কিছু গুছিয়ে ৪টার মধ্যেই রেডি হয়ে বসে রইলাম। কাটায় কাটায় ৫টায় আমার মোবাইল ফোনের সিগন্যাল রিসিভিং সিস্টেম এক্টিভেট হয়ে মধুর সুর তুলে বেজে উঠলো, চিনতে পারলাম এন্ডির কল। হ্যালো এন্ডি বল। আরে কি বলবো আমি যে তোমাদের ওডিওন সিনেমার কাছে এসে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে গেলাম একটু দেরি হবে। আচ্ছা ঠিক আছে তুমি ধীরে ধীরে আস আমি রেডি হয়ে আছি। এন্ডি বললো কে তুমি কি করছ? তোমার অপেক্ষা করছি। ও আচ্ছা তাহলে জানালার পর্দাটা সরিয়ে একটু রাস্তার দিকে তাকাতে পারবে? হ্যা পারব কিন্তু কি হয়েছে? আহা একটু দেখ না। পর্দা সরিয়ে দেখি এন্ডি তার সবুজ রঙ এর ফোর্ড গাড়ি পার্ক করে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে উপরে আমার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। ও, বুঝেছি ইয়ার্কি করছ? জানালার পাল্লা খুলে বললাম। আগেই যখন এসে পরেছ তাহলে একটু উপরে আস একটা কফি খেয়ে নিই। দেরি হয়ে যাবে না? দেরি না হয় হোল একটু ট্রেন তো আর মিস করতে হবে না, আস, সেদিন কার্ডিফ থেকে কফি বিনস এনে গুড়া করে কফি বানিয়ে রেখেছিলাম এখনো তোমার জন্য যথেষ্ট রয়েছে। কি বললে ফ্রেশ গ্রাউন্ড কফি! হ্যা তাইতো বললাম। তাহলে আসছি। আমি সাথে সাথে ইলেকট্রিক জগে পানি ভরে সুইচ অন করে নীচে নেমে দরজা খুলে দিলাম। এন্ডি তার ফোকলা দাতে ফিক করে হেসে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। বছর দুয়েক আগে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে কার সাথে মারামারি করতে গিয়ে ঘুষি খেয়ে দাত ভেঙ্গে গেছে। উপরে এসে দেখি পানি গরম হয়ে গেছে। দুইটা কাপে নিজের হাতে গুড়া করা কফি বানিয়ে একটা এন্ডির হাতে দিয়ে বসলাম। আধা ঘন্টার মধ্যেই কফি শেষ করে জিনিষ পত্র নামিয়ে লেস্টারের পথে চললাম।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে লেস্টার এসে পিটারের সাথে দেখা হোল অনেক দিন পর, তা প্রায় এক বত্সরের বেশি হবে। পিটার গেট খুলে দাঁড়িয়ে ছিল, আমাকে নামিয়ে দিয়েই এন্ডি পিটারকে হ্যালো বলেই চলে গেল। এন্ডি চলে যাবার পর পিটার আমাকে নিয়ে বসার ঘড়ে এসে বলল অনেক দিন পর তোমার সাথে দেখা হোল, চল আগে খেয়ে নিই তার পর কাজের বিষয় নিয়ে বসব, তোমার জন্য দেখ কি এনে রেখেছি বলেই ফ্রিজ খুলে দেখাল সাদা ওয়াইন সার্ডনির বোতল। আমি বললাম এ দিয়ে আমার কি হবে, আমি এসব খাই না তা কি ভুলে গেছ? ও হ্যা তাইতো তাহলে আমি একা খাব? তুমি কি খাবে বল। বললাম আমার জন্য একটু ফ্রেস জুস হলেই হবে। আচ্ছা ঠিক আছে পিজার অর্ডার দেই ওরা এখানে এনে দিয়ে যাবে ওদেরকে বলে দিলেই পাশের সিন্স বুরি থেকে জুস নিয়ে আসবে। না না পিজা না। তাহলে কি? ইটালিয়ান নাকি চাইনিজ? না না ওসব কিছু না, জান আমি বাঙ্গালি হয়েও ব্রীজেন্ডে থাকার সময় গত এক মাসে ভাত খাইনি, ভাত মাছ না খেয়ে বাঙ্গালি বাঁচে কি ভাবে? তাহলে কি ইন্ডিয়ান? হ্যা, এখানে পাশের বেলগ্রেভ রোডে অনেক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে ওখানে চল, খেয়ে আসি ইন্ডিয়ান খাবার ডেলিভারি এনে খেলে স্বাদ পাওয়া যায় না। বেশ চল।

ঘর বন্ধ করে গেটে তালা দিয়ে মিনিট ১০/১২ হেটে বেলগ্রেভ রোডের এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে এলাম। এখানে যদিও মাছ পাওয়া যায় না তবে ভাত আর মাংশ তো পাব। আমি ভেড়ার মাংশ আর ভাতের অর্ডার দিলাম, পিটার দিল চিকেন, নান রুটি, চিপস আর তার সাথে এক পাইন্ট বিয়ার আর আমার জন্য এক গ্লাস আপেল জুস। খেতে খেতে আলাপ হচ্ছে। পিটার বললো তোমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আমি চলে যাব কাল সকালে আটটায় আসবো, তবে ভেবো ন তোমাকে একজন ভাল সঙ্গী দিয়ে যাব। আমি মনে মনে ভাবছি এই সঙ্গী আবার কে? এতক্ষণ জানতাম আমি একাই থাকবো। জিজ্ঞেস করলাম সঙ্গী আবার কে? আছে গোল্ডি আছে, গোল্ডি থাকবে তোমার সাথে, আশা করি গোল্ডির সাথে তোমার সময় ভালোই কাটবে। আমি একটু অবাক হয়ে বললাম গোল্ডি! কই দেখলাম না তো? এই নামে কেউ আছে আমাদের কোম্পানিতে তাও তো শুনিনি। আছে ওর ঘরেই আছে। আচ্ছা ঠিক আছে দেখা যাক, গেলেই দেখা হবে। খেয়ে দেয়ে চলে এলাম। কন্ট্রোল রুমে এসে সব কিছু দেখিয়ে দিয়ে বলল এইতো দেখলে আর যা আছে তা গোল্ডি দেখিয়ে দিবে। ওহ চল তোমার থাকার ঘর দেখিয়ে দিচ্ছি। থাকার ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললো চল এবার গোল্ডির সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

কন্ট্রোল রুমের পাশে একটা ছোট ঘর খুলে ও ঢুকল আমি ওর পিছনে। ঢুকেই দেখি গলায় শিকল বাধা বিশাল এক এলসেসিয়ান পিছনের দুই পায়ের উপর বসে আছে সামনের পা দুটি সামনে বিছানো, ওজন সত্তর কেজির কম হবে না। আস্ত এক নেকড়ে বাঘের মত মনে হোল। আমাকে দেখেই ঝট করে উঠে দাত মুখ খিচিয়ে ঘেউ করে উঠলো। এই প্রাণীর প্রতি এমনিতে ছোট বেলা থেকেই আমার ভয়, যখন ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠেছি তখন এক জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছিলাম তাতে ভালোই হয়েছিলো বলে পরবর্তিতে ভাইভার জন্য যেদিন যেতে বলেছে সেই দিন ভোর বেলা উঠে বাসার পিছনে সব্জী বাগানে দাঁড়িয়ে কি যেন করছিলাম আর এমন সময় হঠাত্ কোথা থেকে এক পাগলা কুকুর পিছনে থেকে এসেই বাম হাতের কব্জিতে কামড় দিয়ে বসল। ভয়ে আর ব্যাথায় চিত্কার করতেই মা এসে দেখে হতভম্ব, তারা তারি হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে বাগানে পানি দেবার পাইপের এক মাথা ধরে পটা পট কয়েক ঘা দিতেই হাত ছেড়ে যে পথে এসেছিলো সেই পথে দৌড়। এদিকে যা হবার তা হয়ে গেছে, হাত বেয়ে সমানে রক্ত বেয়ে পরছে। মা আমাকে টেনে ঘরে এনেই মগে ডেটল গুলিয়ে হাতে ঢেলে দিলেন একটু পরিষ্কার হলে দেখা গেল তিনটা দাত বিঁধেছে তার মধ্যে হাতের বুড়ো আঙ্গুলের উপরে একটা রগ মনে হয় কেটে গেছে বলে এখানকার রক্ত থামছে না। হাতের কাছে যা ছিল তাই দিয়ে কোন রকম ব্যান্ডেজ করে দিলেন। চেঁচামেচি শুনে বাবা এগিয়ে এসেছেন পাড়া প্রতিবেশী ও দুই একজন এসেছে। তাদের পরামর্শে বাবা রেডি হয়ে নিলেন কে একজন স্কুটার ডেকে এনেছে তাতে করে হাসপাতালে নিয়ে এলেন। তখনো বুড়ো আঙ্গুলের উপরের অংশের রক্ত বের হচ্ছে। ইমার্জেন্সি ডাক্তার দেখে বললেন এই রগ কেটে গেছে সেলাই দিতে হবে। সেলাই করে ব্যান্ডেজ করে হাতে আর পেটে ইঞ্জেকশন দিয়ে বলে দিল ১৪ দিনে ১৪ টা ইঞ্জেকশন দিতে হবে আজ নিয়ে যান আর কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু আমার সেই ভাইভা আর দেয়া হোল না। হলে হয়ত বা আমার জীবন এখন যে রকম চলছে সে রকম না হয়ে ভিন্ন রকম হতে পারতো। এই হচ্ছে ঘটনা, এর পর থেকেই এই প্রাণীর প্রতি আমার অসম্ভব রকমের ভয়।

সে যাই হোক এই কুত্তা না সরি কুত্তা না একটু ভদ্র ভাষায় বলতে হয় কুকুর, না না কুকুরও না, তাহলে? এ হচ্ছে ডগ, এতো আর আমাদের নেড়ি কুত্তা না রীতিমত টাকা খরচ করে ট্রেনিং দিয়ে একে ডগ সাহেব বানানো হয়েছে। ও যখন আমাকে দেখে ঘেউ ঘেউ করেই চলেছে তখনই পিটার ধমক দিয়ে বললো ওহ গোল্ডি স্টপ, হি ইস আউয়ার কলিগ, ডোন্ট বি সিলি। আমি একটু পিছিয়ে এসেছি, বুঝলাম তাহলে এই হচ্ছে গোল্ডি। পিটার আমাকে বললো তোমার পকেট থেকে পিয়াইডি চাবিটা বের করে ওকে দেখাও। সবুজ রঙ এর একটা ম্যাগনেটিক চাবি আমাদের সবার কাছেই একটা করে থাকে, পকেট থেকে সেটা বের করলাম ওটা দেখেই গোল্ডি তরাক করে লাফ দিয়ে আমার ডান হাতের কাছে চলে এলো আর তা দেখেই আমার সেই দিনের কথা মনে হয়ে শরীরের রক্ত মনে হোল ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে, আমি নড়তে পারছি না আমার সব থেমে গেছে শ্বাস বইছে কিনা বুঝতে পারছি না। গোল্ডি কাছে এসেই হাতে ধরা চাবিটা শুঁকছে আমার মনে হচ্ছিল হাতটা বুঝি এবার গিলেই ফেলবে। না, সে তা আর করেনি তবে আমাকে ভাল ভাবে আন্তরিকতার সাথে গ্রহন করতে পারেনি রাগে গড়গড় করতে করতে যেখানে বসে ছিল সেখানে ফিরে গেল। এবার পিটার ওর কাছে গিয়ে বুঝিয়ে বললো দেখ গোল্ডি এ হচ্ছে কে আমাদের সহকর্মী এর সাথে এরকম খারাপ ব্যবহার করবে না, এর সাথে তোমাকে কাজ করতে হবে, সাবধান আমি যেন কোন অভিযোগ শুনি না। পিটারতো বললো কিন্তু গোল্ডি কি বুঝল কে জানে তবে গড় গড়া বন্ধ হয়েছে আর তার সাথে একটু একটু করে লেজ নাড়ছে।

আবার কন্ট্রোল রুমে ফিরে এলাম, কে তোমার ল্যাপটপ এনেছ? আরে না এইতো কদিন আগে ওটা ভেঙ্গে গেছে। মানে? খুলে বললাম সে কাহিনি। ও, তাহলে কি এখন আর একটা কিনবে? না পিটার এখন আর কেনা সম্ভব নয়, দেখি কিছু দিন পর ক্রিস্ট মাসের সেল এর সময় কিনতে হবে। তাহলে এই ডেস্কটপ দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও। আচ্ছা তাহলে সব দেখলে তো, বাকী যা আছে গোল্ডি দেখিয়ে দিবে, এখন তাহলে আমি বাই বলি? হ্যা ঠিক আছে, তুমি বিশ্রাম নাও গিয়ে কাল আবার দেখা হচ্ছে। পিটার বাই বাই বলে চলে গেল।

এই জায়গাটা হচ্ছে ১৯২৬ সালে তৈরী এখানকার প্রথম বাস ডিপো। প্রায় ১০ একর জায়গার উপর। প্রথম দিকে এই শহরে যখন ট্রাম চলতো তখনও এটাই ছিল ট্রাম ডিপো। সাবেক আমলের ধরন গড়নে তৈরি বলে এখন এই আধুনিক যুগে আর চলছিলো না তাই এটা বিক্রি করে দিয়ে কাছেই অন্য জায়গায় আধুনিক যুগের উপযোগী নতুন ডিপো বানিয়ে এরা ওখানে চলে গেছে আর এখানে হবে আবাসিক পল্লী। এতো দিন যাবত এখানে গাড়ি ইঞ্জিন ইত্যাদি চলাচল করেছে মাটিতে ডিজেল মবিল পরে মাটি দুষিত হয়ে গেছে যা মানুষের আবাসিক এলাকার জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে প্রায় ৩০ ফুট গর্ত করে মাটি সরিয়ে নতুন মাটি দিয়ে ভরাট করে এখানে ৭২০ টি আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মান হবে। এই পুরনো আমলের এলো মেলো ভাবে নির্মিত ছোট বড় নানান সাইজের বিল্ডিংয়ের ভিতরে যাতে মাদক সাবিরা এসে আখড়া না বানাতে পারে যার জন্য প্রায় ৩৬টা সিসি ক্যামেরা এবং ৪টা মনিটর দিয়ে ২৪ ঘন্টা পাহারাদারি করার চুক্তি হয়েছে আমাদের কোম্পানির সাথে।

পিটার চলে যাবার পর আমি বের হলাম গোল্ডি কে নিয়ে ক্যামেরা গুলি কোথায় কোথায় আছে তা দেখার জন্য। গোল্ডি নাকি জানে সেই সব দেখিয়ে দিতে পারবে। গোল্ডির ঘরে এসে দেখি শুয়ে আছে আমাকে দেখে দাঁড়ালো। ওর গলার চেইন খুলে বাংলায় বললাম চল এলাকাটা ঘুরে আসি। ঘড় ঘড়। কি বাংলা বুঝ না? এবার বসে পরলো, আবার ইংরেজিতে বললাম। আবার ঘড় ঘড়। সমস্যা, কি করি এখন ভেবে পাচ্ছি না। একটু ইতস্তত করে গোল্ডির চেইন ধরে বাইরে নিয়ে এলাম। হ্যা এবার কাজ হবে বলে মনে হোল। হ্যা গোল্ডি সাহেব দাঁড়ালেন, ঘর থেকে বের হয়ে আগে আগে যাচ্ছে আমি তার পিছনে হাতে চেইন ধরে রেখেছি। একটা একটা করে যেখানে উপরে ক্যামেরা লাগানো আছে তার নিচে এসে উপরে মুখ তুলে দাঁড়ায় আর আমি টর্চ দিয়ে দেখি হ্যা ক্যামেরা আছে। এই ভাবে প্রায় ঘন্টা খানেকের মধ্যে পুরো এলাকাটা জরিপ করে যখন ফিরে আসছি তখন গোল্ডি সাহেব হঠাত্ করেই এক লাফ দিতে চাইল কিন্তু ওর গলার চেইন আমার হাতে শক্ত করে ধরা থাকায় আর পেরে উঠেনি, রাগে গড় গড় করছে। কি করি এখন আবার ভয় শুরু হোল। এবার আর বাংলা না শুধু ইংরেজিতেই বলছি কিন্তু উনি কিছু বুঝতে চাইছে না, হয়ত আমার উচ্চারণ সে বুঝে উঠতে পারছে না। যাই হোক কোন ভাবে মানিয়ে মানিয়ে ঘরে এনে বেধে রেখে ঘর তালা দিয়ে এসে বসলাম।

মনিটর গুলিতে চোখ ঘুড়িয়ে নিলাম ঠিকই আছে আশে পাশে কাওকে দেখা যাচ্ছে না। ভাবছি গোল্ডি সাহেবের সাথে এভাবে এখানে থাকা সম্ভব নয় কালই পিটার এলে ওকে খুলে বলতে হবে যেন ক্রিসকে বুঝিয়ে বলে আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়। রাতটা কেটে গেল, সকালে পিটার এলে ওকে খুলে বললাম, হাতের পুরনো ক্ষতটা দেখালাম। আচ্ছা ঠিক আছে আমি আজই ক্রিসকে খুলে বলবো তুমি এখন ঘুমাও গিয়ে। পিটারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘরে এসে কাপড় পালটে বিছানায় শুয়ে পরলাম। বিগত এক মাসের ক্লান্তি, আর রাত জেগে কাজের পর শোবার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পরলাম।

একবারে চারটায় ঘুম ভাংলো, এখানকার শীতের চারটা মানে রাতের অন্ধকার হয়ে গেছে, রাস্তার আলো জেলেছে অনেকক্ষণ, ওপাশের এবে পার্কের গেটের বাইরে কোন গাড়ি নেই। হাত মুখ ধুয়ে খেতে যাবার সময় পিটারের কাছে গেটের চাবি আনতে গেছি আর অমনি পিটার প্রায় চিত কার করে বলে উঠলো ওহ কে, তোমার গুড নিউজ আছে। কি?একে বার হেড অফিসে যাচ্ছ তুমি। মানে? মানে আর কি, তুমি ক্রিসকে বলতে বলেছিলে না?হ্যা। ক্রিসকে বলাতেই সে বললো ও, তাহলে কে কে এখানে আসতে বলে দাও। তাই নাকি?বলে একটু বসলাম। কবে কখন যেতে বলেছে? কাল সকালেই চলে যাও আজ রাতের ডিউট করতে হবে না। এরিক আসছে আজ এখানে ওই করবে তুমি রেস্ট কর। বল কি! একটু অবাকই হলাম, কত দিন নিউক্যাসেলের বাইরে, কিছু দিন আগে যাও হুকুম হোল তা আবার ব্রীজেন্ড যেতে হোল। তাহলে শোন পিটার আমি এখনই বের হই আগে টিকেট নিয়ে ওখান থেকেই খেয়ে আসি না হলে কাউন্টার বন্ধ হয়ে যাবে। কেন আবার টিকেট করতে এতো দুরে যাবে কেন এখান থেকেই অনলাইনে করে প্রিন্ট করে নাও। ও হ্যা আমি ভুলেই গেছিলাম। আচ্ছা ঠিক আছে অন্তত খেয়ে আসি, তুমি যাবে আমার সাথে? না না তুমি যাও খেয়ে আস।

পরদিন দুপুরে পিটারের আছ থেকে বিদায় নিয়ে সেন্ট মার্গারেট কোচ স্টেশনে এসে আড়াইটার কোচে উঠে পরলাম। মাঝে লীডসে প্রায় এক ঘন্টার ব্রেক। বাস থেকে নেমে টার্মিনালের ভিতরে দোকান থেকে একটা টুনা বাগেট(লম্বা গোল মত পাউরুটি ফালি করে কেটে দুই ভাগ করে ভিতরে টুনা মাছ আর স্যালাদ দেয়া) আর এক ক্যান ডায়েট কোক নিয়ে ওয়েটিং লাউঞ্জে বসে খেয়ে নিলাম, আবার গিয়ে কাগজের গ্লাসে এক গ্লাস চা এনে আরামে বসে বসে চা খাচ্ছি আর ভাবছি কারো সাথে যোগাযোগ করলাম না ওখানে গিয়ে কোথায় কি ভাবে থাকবো কিছুই জানলাম না এতো রাতে গিয়ে কোন ঝামেলায় পরি এমনিই শীতের রাত। ডেভিড কে ফোন করলাম। কি খবর ডেভিড, কেমন আছ?হ্যা কে ভাল আছি, তুমি কখন আসছ?রাত হবে আমি এখন লীডসে। তা আমার কি ব্যবস্থা করেছে?সব ব্যবস্থা ঠিক করা আছে তোমার ঘরের চাবি আমার কাছে আছে। তোমার কাছে থাকলে হবে নাকি তা আমাকে পেতে হবে?হ্যা হ্যা পাবে, তুমি এলেই পাবে। আচ্ছা ভাল কথা, পেলেই হবে।

রাত প্রায় আটটার দিকে মটর ওয়ের পাশে কোন সার্ভিস স্টেশনে যেন থামলো। হাতের গ্লভস পরে কোচ থেকে নেমে গেলাম সার্ভিস স্টেশনের ভিতর। এক গ্লাশ চা নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে তামাক বের করে মাত্রই জ্বালিয়েছি অমনি ফোন বেজে উঠলো। এখন আর কেউ ফোন করবে না ভেবে একেবারে ভিতরে শার্টের পকেটে রেখেছিলাম।
এক হাতে পকেট খুঁজে ফোন বের করে দেখি অচেনা নম্বর, যাই হোক হ্যালো,
ওপাশ থেকে সুললিত মার্জিত কণ্ঠে স্পস্ট উচ্চারণে ভেসে এলো ইজ ইট কে দেয়ার?
ইয়েস স্পিকিং।
ও বেশ, আমি ডার্লিংটন থেকে এলিজাবেথ ক্যাম্পবেল।
তা বলো এলিজাবেথ আমি তোমাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি।
তুমি কখন এসে পৌঁছবে?
মানে কি, তুমি আমাকে চেন, কোথায় পৌঁছানোর কথা বলছ?এক সাথে তিনটা প্রশ্ন করলাম।
হ্যা চিনি এবং খুব ভালো করেই চিনি এবং তোমার প্রোফাইল আমার মুখস্ত।
আশ্চর্য!
(নিউক্যেসেল শহরের পিলগ্রিম স্ট্রীট, এখান থেকে আমি বাস বদল করতাম)
আশ্চর্য হবার কিছু নেই আমি তোমার সহকর্মী যদিও আমাদের দেখা বা পরিচয় হয় নি এখনো তবে আশা করছি আজই হবে।
আর একটু খুলে বলতে পার?
তুমি যখন নরউইচে ছিলে, মনে আছে
হ্যা তা আছে।
ওই তখন আমি জয়েন করেছি, আমি ক্রিসের সেক্রেটারি।
আচ্ছা এলিজাবেথ, বেশ ভালো কথা, শুনে খুশি হলাম, তা বল আমি তোমার জন্য কি করতে পারি।
ওই যে বললাম তুমি কখন নিউক্যাসেল পৌঁছাবে সেটা জানিয়ে আপাতত ধন্য কর বাকিটা পরে দেখবো।
সে কি করে সম্ভব বল?
কেন?

কেন আবার কি কোচ তো আর আমি চালাচ্ছি না, কোচ চালাচ্ছে ড্রাইভার সেই ভালো বলতে পারে কখন পৌঁছাবে।
দেখ তুমি নীল নয়না স্বর্ণ কেশি খাটি স্কটিশ এক সুন্দরীর সাথে কথা বলছ সুন্দরীদের সাথে কেউ এভাবে দুষ্টামি করে? দুষ্টামি রেখে বল কখন আসছ, তোমাকে রিসিভ করে তোমার ল্যেঙ্কেস্টার স্ট্রিটের বাসার চাবি সহ তোমাকে পৌছে দেয়ার জন্য বসের নির্দেশে আমি বসে আছি, তুমি তোমার পকেটে হাত দিয়ে টিকেট বের করে দেখ ওখানে লেখা আছে। তুমি কখন আসছ তাই বুঝে আমাকে আবার ডঙ্কেস্টার যেতে হবে, মোটকু ডেভিড আমার হাতে চাবি না দিয়েই ওখানে চলে গেছে।
তা তুমি সুন্দরী না জল হস্তী তা আমি কি করে বুঝি বল তবে তুমি যে স্কটিশ তা তোমার কথা এবং নাম শুনেই বুঝেছি, ক্যাম্পবেলেরা স্কটিশ এটা আমি জানি। যাই হোক, তোমাকে তো তাহলে বেশ ঝামেলায় ফেলেছে, আমার দুঃখ হচ্ছে যে আমার জন্যই তোমাকে কষ্ট করতে হচ্ছে। আচ্ছা একটু লাইনে থাক আমি টিকেট দেখে বলছি,
এক হাতে চায়ের গ্লাস আর এক হাতে ফোন পকেট দেখি কি করে? একটু এগিয়ে এসে কোচের হেড লাইটের উপরের শেডে চায়ের গ্লাস নামিয়ে রেখে সব পকেট হাতালাম কিন্তু নেই। শীতের দিনে এমনিতেই পকেট বেশি থাকে, কোথায় রেখেছি মনে করতে পারছি না। আবার দেখলাম না নেই কোথাও নেই।
শুনছ এলিজাবেথ টিকেট পাচ্ছি না।

পাচ্ছি না মানে আবার কি, তাহলে কোচে উঠলে কেমন করে?
তখন ছিল ড্রাইভারকে দেখিয়েছি কিন্তু এখন পাচ্ছি না।
আচ্ছা শোন তুমি যে সিটে বসেছ তার আশে পাশে দেখ হয়ত পকেট থেকে পরে গেছে।
হ্যা তা হতে পারে বলে গাড়িতে উঠে সিটের কাছে এসে দেখি এইতো নিচেই পরে আছে।
হ্যা এলিজাবেথ তুমি ঠিকই বলেছ, এইতো পেয়েছি, আচ্ছা আমি রাত দশটা দশ মিনিটে ইন করবো।
আচ্ছা এখন বাজে ৯টা তাহলে আমি এখনই ডঙ্কেস্টার যাচ্ছি, আমার আসতে যদি একটু দেরিও হয় তুমি অপেক্ষা করবে, তাহলে একটু পরেই দেখা হচ্ছে। বলেই রেখে দিল। আমি ভাবলাম মেয়েটাকে বড্ড ঝামেলায় ফেলেছে, এই সময় তার বয় ফ্রেন্ডের সাথে পাবে বিয়ারের গ্লাস নিয়ে বসে থাকার কথা নয়তো বাড়িতে বসে রাতের খাবার আগে ওয়াইনের গ্লাশ হাতে টিভি দেখার কথা তা না করে এই শীতের মধ্যে চল্লিশ দ্বিগুনে আশি মাইল গাড়ি চালিয়ে ডার্লিংটন থেকে ডঙ্কেস্টার যাবে আসবে আবার সেখান থেকে নিউক্যাসেল তারপর সহকর্মীকে তার বাসায় নামিয়ে দেয়া। পিছনে ঘুরেই দেখি যাত্রীরা আর ড্রাইভার এগিয়ে আসছে। আমিও ঠান্ডা চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বিনে ফেলে দিয়ে কোচে এসে বসলাম। কোচ ছেড়ে দিল।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি, অন্ধকারের ও একটা সৌন্দর্য আছে আর তার সাথে যদি মটর ওয়ের সোডিয়াম আলোর মাখামাখি হয় তাহলে সে সৌন্দর্য ভিন্ন একটা মাত্রা যুক্ত হয়। এ পাশের ওপাশের ৮টা লেন দিয়ে অসংখ গাড়ি আসছে যাচ্ছে। কেউ যাচ্ছে দিনের কাজের শেষে বাড়িতে আবার কেউ যাচ্ছে বাড়ি থেকে কাজে একই সময়ে কত জনের কত বিচিত্র প্রয়োজন। রাস্তার দু পাশে কখনো ঘন ঝোপ আবার কখনো খোলা মাঠ আবার তা ছাড়িয়ে কিছু দূরে ছায়া ছায়া বনের মত মনে হচ্ছে। ফাকে ফাকে লাইট পোস্ট গুলি ফুরত করে একটা একটা করে পিছনে চলে যাচ্ছে। গত এক মাসের ফিরিস্তি মনে আসছে কি কি করেছি কোথায় কি ভাবে থেকেছি নানা কিছু। বাড়ির কথা মেয়েদের কথা মনে হোল। খুকু কে ফোন করা দরকার ও জানে আমি লেস্টারে আছি, আমি যে নিউক্যাসেল যাচ্ছি তা ওকে জানান হয়নি। পকেট খুঁজে ফোন পাচ্ছি না এই হচ্ছে ইদানিং এক নতুন সমস্যা কোথায় কি রাখি তা মনে রাখতে পারি না। ভাগ্য ভালো দুই জনের সিটে একাই বসেছিলাম গাড়িতে যাত্রি বেশি নেই, লীডস থেকে চার/ পাচ জন উঠেছে আর লেস্টার থেকে মনে হোল দশ বার জন উঠেছিলাম তার আবার তিন জন লীডসে নেমে গেছে।

গাড়িতে উঠেই জ্যাকেটটা খুলে সিটের পাশে হুকে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম গাড়িতে হিটার চলছে বেশ গরম। শীতের দিনে অনেক গুলি পকেট থাকে কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না হঠাত্ মনে হোল ও হ্যা জ্যাকেটের পকেটে। জ্যাকেটের পকেট খুঁজে পেলাম। খুকুর নাম্বারে কল করলাম, যাচ্ছে না। দেখি নেট ওয়ার্ক নেই। ফোনটা হাতে নিয়ে বসে খুকুর কথা ভাবছি মেয়েটাকে কতদিন দেখতে যেতে পারছি না গত ঈদের দিনে বাবা চাচারা সবাই এক সাথে ঈদ করলো অথচ মেয়েটা এই কাছে থেকেও আসতে পারলো না। কতটুকুই বা আর দূরে লন্ডন থেকে গ্লস্টার, মাত্র ১৭০ মাইলের মত তবুও আসতে পারেনি। ঠিক ঈদের দিনেই পরীক্ষা ছিল। এই হচ্ছে বিলাতের জীবন। শুনতে কি মধুর শোনায় ইংল্যান্ডে থাকে। অথচ এই ইংল্যান্ডের যে কি যান্ত্রিক জীবন সে ভুক্ত ভোগী ছাড়া আর কতজনে জানে। এরা সবাই মানুষ না হয়ে যদি রোবট বা অন্য কোন মেশিন হতো তাহলে মানাত। বাবা মা সন্তান কেও কারো নয়। কি ভয়ঙ্কর জীবনে এরা অভ্যস্ত। আমরা এমন ভাবতেও পারি না অথচ তাও মেনে নিতে হচ্ছে। প্রয়োজন এমন এক দায় যার টানেই সব ছিড়ে কেটে টুকরা টুকরা হয়ে ভেঙ্গে চুরে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। মায়া মমতা স্নেহ দাবী আবদার, কিছুরই মূল্য নেই। ভাবতে ভাবতে কখন যে মিডল বোরো এসে পরেছি দেখিনি, এখানে একজন যাত্রি নামার জন্য কোচ থামলে দেখলাম। এইতো এর পর ডার্লিংটন, ডারহাম তারপরেই নিউক্যাসেল।
আবার খুকুকে কল দিলাম ওপাশ থেকে খুকুর কণ্ঠ শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো, এতো দূরে চলে এসেছি শুনেই তো ও আঁতকে উঠবে, আব্বু কেমন আছ? হ্যা আব্বু আমি নিউক্যাসেলের পথে আছি। যা ভেবেছি তাই।

শুনেই খুকু চিত কার করে উঠলো নিউক্যাসেল! এতো দূরে?তাও আবার এই শীতের মধ্যে?নিষেধ করতে পারলে না?না আব্বু নিষেধ করি কি করে বলে সব খুলে বললাম। সাথে আরও বললাম তোমার ছুটি হলে ন্যাশনাল এক্সপ্রেসে বা মেগা বাসের ফান ফেয়ারে কম দামে যে প্রমোশনাল টিকেট পাওয়া যায় তাই করে তুমি এসো একা ভালো না লাগলে ঝুমুর বা বর্ণাকে নিয়েই এসো। আরো কিছু কথা বলে রেখে দিলাম। এইতো টাইন নদী পার হচ্ছে  আর পাচ সাত মিনিট লাগবে। হুক থেকে জ্যাকেট নামিয়ে গায়ে দিলাম গ্লভস পরে মাথায় টুপি পরে নামার জন্য রেডি হলাম।

(এই সেই টাইন নদী যার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে নিউক্যেসেল শহর এই নদীর জন্যই এই শহরের নাম “নিউক্যেসেল আপ অন টাইন”)

হঠাত্ মনে হোল এলিজাবেথ আমার জন্য এতো কষ্ট করছে ওর জন্য কি করা যায়?ভাবতে ভাবতেই নিউক্যাসেলের ছোট্ট কোচ স্টেশনে এসে কোচ দাঁড়ালো। সমাধান পাবার সময় পেলাম না। গাড়ি থেকে নেমে মালামাল বের করে এদিক ওদিক দেখলাম না কোন সুন্দরী বা জল হস্তীর দেখা নেই। এতো রাত বলে স্টেশনের ভেতরটা বন্ধ, বাইরেই দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি বানিয়ে জ্বালালাম। শেষ হলে ফেলে দিলাম। এমন সময় দেখি সিলভার রঙের ছোট্ট একটা ফিয়াত গাড়ি এসে দাঁড়ালো। ড্রাইভিং সীট থেকে সত্যিই ২২ বা ২৩ বছর বয়সী এক অপরূপা সুন্দরী মেয়ে নেমে আমার দিকে তাকিয়ে,
হাই কে সরি আমার একটু দেরি হয়ে গেল।
বুঝলাম এই হলো এলিজাবেথ।
না না, তাতে এমন কি আসলো গেল? ও এসেই হাত বাড়িয়ে দিল। পরে আমার একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে গাড়ির কাছে যেয়ে পেছনটা খুলে ব্যাগ রেখে দিল আমি ওর পিছনে যেয়ে আর একটা স্যুটকেস রাখলাম।
এবার চল।

কোথায় যাবে?
তোমার বাসায়।
না শোন আমার ভীষন ক্ষুধা লেগেছে বাসায় খাবার ব্যবস্থা নেই এতো রাতে একমাত্র সুপার স্টোর ছাড়া আর কোথাও কিছু পাবো না আর তোমারও খাওয়া হয়নি চল এক সাথে খেয়ে নিই তারপর বাসায় যাই।
হ্যা তা করা যায়।
কি খাবে বল, ইটালিয়ান নাকি তোমার ইংলিশ নাকি মেক্সিকান?
তুমি কি খাবে?
আমি উপ মহাদেশীয় হলেই বেচে যাই।
তাহলে চল তোমার ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে যাই।
সরি এলিজাবেথ, আমার পূর্ব পুরুষ ইন্ডিয়ান ছিল কিন্তু আমি সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছি তোমাদের পুর্ব পুরুষদের কারনেই।
ও হ্যা তুমি বাংলাদেশি তবে ও কথা মিন করে বলিনি, আমি তোমার উপ মহাদেশীয় হিসেবে বলেছি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের কথা।
আসলে কি জান এলিজাবেথ, এই যে তোমরা যাকে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট বল এর শতকরা নব্বই ভাগই কিন্তু বাংলাদেশি।
তাই নাকি?
হ্যা।

আচ্ছা ঠিক আছে, এখন বল কোথায় যাবে।
আমি তো সেই কবে ছিলাম এখানে, কিছু মনে নেই তার চেয়ে তুমি যেখানে চেন সে রকম কোথাও চল।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ঘুড়িয়ে কিছু ক্ষণের মধ্যেই সেন্ট্রাল স্টেশনের পাশে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়ালো। দেখলাম এটা পাঞ্জাবী রেস্টুরেন্ট। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল।
জান কে, আমি তোমাদের বাংলাদেশে গেছি।

তাই না কি? হ্যা, তবে ছোট বেলায়, আমার মার সাথে। ড্যাড তোমাদের ওখানে অনেক বড় একটা নদীর উপর কি একটা বড় ব্রীজ হয়েছে না সেখানকার ইঞ্জিনিয়ার ছিল।
বাঃ বেশ খুশি হলাম তোমার কথা শুনে, ওটা যমুনা ব্রীজ। তা কেমন লেগেছে ওখানে?
খুব গরম আর খুব বৃষ্টি হয় এই টুকু মনে আছে।
তোমার যাওয়া হয়েছিলো অসময়ে সম্ভবত জুন বা জুলাই মাসে তাই না?
হ্যা হবে হয়ত, বললাম না ছোট বেলায় গেছি তো বিশেষ কিছু মনে নেই
যাক সময় হলে আবার যেয়ো। এবার গেলে ডিসেম্বর মাসে যাবে এক ভিন্ন রূপ দেখবে।
কি রকম? ডিসেম্বর মাসে ওখানে শীত থাকে তবে সে শীত যদিও তোমাদের এখানকার মত না সহনীয়, তোমরা কোন রকম একটা সোয়েটার গায়েই চালাতে পারবে।
দেখি যদি কখনো সুযোগ হয় বাবার তৈরী ব্রীজটা দেখতে যাব।
তুমি স্কটল্যান্ড গেছ?

গেছি মানে, বলে কি এই মেয়ে?
গ্লাসগো থেকে আবারডিন পর্যন্ত কোন শহরের কথা জিজ্ঞেস করবে করে দেখ।
তাই নাকি?
হ্যা আসলে ওখানে যাবার আমার একটা বিশেষ ইচ্ছে ছিল কারন আমার এক প্রিয় শিক্ষকের বাড়ি কোন এলাকায় তা দেখতে চেয়েছিলাম। সেও তোমার মত ক্যাম্পবেল, তার নাম ছিল অলস্টার ক্যাম্পবেল। সে স্কটিশ এটুকুই জানতাম কিন্তু কোন শহরের তা জানতাম না তবে আমার ধারনা মতে ডান্ডি হতে পারে। তবুও হ্যামিলটন, গ্লাসগো, পার্থ, স্টার্লিং, ডান্ডি, স্টোন হ্যাভেন, ওবান সব জাগায় অর্থাৎ আমি যেখানে যেখানে গেছি সেখানেই যে বয়স্ক ক্যাম্পবেল পেয়েছি তাকেই জিজ্ঞেস করেছি।
পেয়েছ?

না এত বড় স্কটল্যান্ডে কি আর এই ভাবে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়?পাইনি, তবে নিজের মনকে প্রবোধ দিতে পেরেছি যে আমি খুঁজেছি।
তোমার একজন শিক্ষকের প্রতি এই শ্রদ্ধা দেখে আমি অবাক হলাম।
তোমার বাড়ি কোথায় বললে না?
আমার বাড়ি পার্থে।
আমি দেখেছি, খুব সুন্দর জায়গা আমার কাছে ছবির মত মনে হতো।
ওখানেই আমি বড় হয়েছি তবে এখন নিউক্যাসেলে থাকি।
ওখানে কে থাকে?
কেউ না।
কেন?
কে থাকবে, বাবা মা কেউ নেই।
ওহ, সরি।

খেয়ে দেয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম। এলিজাবেথ ড্রাইভ করছে। হঠাত্ আজদা সুপারমার্কেটের সামনে এসে থামলো। এদেশে সাধারনত বেশি রাতে কোন দোকান পাট খোলা থাকে না সন্ধ্যার পরে সবাই যার যার ঘরে ফিরে যায় দোকান খোলা থাকবে কার জন্য, তবে বিশেষ কিছু সুপার মার্কেট ২৪ ঘন্টা চালু থাকে।
জিজ্ঞেস করলাম কি হোল এখানে থামলে কেন?

আজ তো হোল, কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করবে কি দিয়ে? তাই এখান থেকে কিছু নিয়ে যাও।
সত্যিই এলিজাবেথ তুমি শুধু দেখতেই সুন্দর নও তুমি খুব ভালো মেয়ে।
গাড়ি থেকে নামলাম। এলিজাবেথ নামল। দুধ, চা, ব্রেড মার্জারিন, চা পাতা এই রকম কিছু ওই তুলে দিল ঝুড়িতে। দাম টাম দিয়ে এসে আবার গাড়িতে। সাত আট মিনিটের মধ্যে ল্যেঙ্কেস্টার স্ট্রিটের একটা বাসার সামনে এসে থেমে বললো
নাও এই হচ্ছে তোমার বাসা আর হাতের ব্যাগটা খুলে ডেভিডের কাছ থেকে আনা চাবিটা বের করে হাতে দিয়ে বললো এই হোল চাবি। চল মাল নামিয়ে গৃহে প্রবেশ কর এখন।
গাড়ির পেছনটা খুলে দিয়ে একটা ব্যাগ নিয়ে আমার সাথে এসে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে বললো তাহলে এখন আমি আসি? কাল দেখা হবে।
ওকে এলিজাবেথ, অনেক কষ্ট করেছ আমার জন্য, অনেক অনেক ধন্যবাদ, শুভ রাত্রি।

( ওয়েস্ট এন্ড রোডের পাশে ল্যাঙ্কেস্টার স্ট্রীটে অর্থাৎ ছবির ডান পাশের এই গির্জার পাশেই আমি প্রায় এক বছর থেকেছি। এই গির্জাটা প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো)

এলিজাবেথ গাড়ি নিয়ে চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত ওর গাড়ির পিছনের লাল বাতির দিকে তাকিয়ে আমার খুকুর কথা মনে এলো। লাল বাতি বাম দিকে ঘুরে আড়াল হলে পর তালা খুলে ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে দেখে নিলাম নিচে বড় একটা কিচেন, বড় বাথরুম। উপরে যাবার সিড়ি বেয়ে উঠে দেখলাম এখানে শুধুই একটা শোবার ঘর। অনেক দিনের পুরনো বাড়ি ভিক্টোরিয়া আমলেরও হতে পারে। স্টূডিও টাইপের বাড়ি। সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেমের বয়লার কিচেনেই, ওটা অন করে দিলাম সারা বাড়ি ঠান্ডা বরফ হয়ে রয়েছে। অন্তত এক ঘন্টার আগে গড়ম হবে না। জিনিষ পত্র উঠিয়ে কোন রকম রেখে আর কোন হিটার আছে কিনা দেখছিলাম। হ্যা ওইতো ওয়ারড্ররবের পাশেই, এটাও অন করে দিলাম, ঘড়টা গড়ম হোক পরে শোবার আগে অফ করলেই হবে। ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত মুখ ধোয়া যাবে না তাই পানি গড়ম হওয়া পর্যন্ত কাপর চোপর বদলে জিনিশ পত্র একটু গুছিয়ে রাখলাম। এতক্ষনে মনে হয় পানি গড়ম হয়েছে, বাথরুমে গিয়ে দেখি হ্যা গড়ম পানি আসছে। হাতমুখ ধুয়ে এসেই শুয়ে পরলাম আর গোল্ডি সাহেবের হাত থেকে নিস্কৃতি পাবার আনন্দে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি বুঝতেই পারিনি।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


2 Responses to গোল্ডি সাহেব এবং স্কটিশ সুন্দরীর গল্প

  1. নীল নক্ষত্র ডিসেম্বর 23, 2010 at 4:14 অপরাহ্ন

    আসলে বাঙ্গালি ভাত ছারা বাঙ্গালি থাকে কি করে?
    ভাল লাগা জানাবার জন্য ধন্যবাদ।

  2. নীল নক্ষত্র ডিসেম্বর 23, 2010 at 4:17 অপরাহ্ন

    ব্যাপারটা বুঝলেন না? এ সব ছবি তো আমি তুলেছি কিন্তু আমার ছবি তুলবে কে?আর তা ছারা আর একটা সমস্যা হোল আমার চেহারা উপরের শ্রিধার দাদার আইকনের চেয়ে খুব বেশি ভাল না তাই ভয় আছে একটু, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
    যাক, অনেক অনেক ধন্যবাদ। সামনে কখনো সুযোগ পেলে দেখতে পারেন হয়তবা।

You must be logged in to post a comment Login