তাহমিদুর রহমান

সম্ভোগ

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

“জীবন যেখানে দ্বীপশিখা
শেষান্তে তাতো নিভবেই।”

গুলশানের এক আলিশান বিল্ডিং থেকে বের হয়েই অজিতের কান্না পায়, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার কিন্তু অজস্র কান্নার অশ্রুও তাকে এ মুহূর্তে শান্তি এনে দিতে পারে না। তার পা সামনে একধাপও এগুতে চায় না যেন পঞ্চাশ কেজি ওজনের কিছু বেঁধে দেওয়া হয়েছে তার পায়ের সাথে। তবু দ্রুত পায়ে সেই বিল্ডিংয়ের ছায়া থেকে দূরে সরে যেতে চায়। ততক্ষনে অনেকগুলো পিঁপড়ে তার হৃপিণ্ড খুবলে খেতে শুরু করেছে। খুবলে খাওয়া হৃপিন্ড মেরামতের জন্যেই হয়ত দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। তবে এ হাঁটা উদ্দেশহীন সময়ক্ষেপন হাঁটা। মানুষের জীবনে হতাশা এলেই এইরূপ হাঁটায় তাদেরকে অংশগ্রহন করতে দেখা যায়। এ হাঁটায় মানুষেরা ধূলোর সাথে মিশে যায় তবু স্বপ্ন দেখতে ছাড়ে না।

অজিত শুধুমাত্র কবি হওয়ার আশায় ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের এক গ্রাম থেকে দুরন্ত স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল ঢাকার বুকে। কবিতা তার মনে খেয়েছিল, খেয়েছিল তার সত্ত্বাকে তাইতো অনার্স পাশ আর করা হয়ে উঠেনি তার। সেটাও প্রায় সাত-আট বছরের আগেকার কথা কিন্তু তার মনে হয় এইতো সেদিন। তখনো বাবা বেঁচে ছিল, মা বেঁচে ছিল হাজার রকমের অসুখের সাথে। সেই বাবা-মা প্রত্যেকটা সেকেন্ড তাকে দেখে দেখে রাখত এমনকি বড় হওয়ার পরেও তাই মাঝে মাঝে খুব অভিমান হত তার। সেজন্যেই হয়তো এত সহজে বাবা-মাকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়েছে সে। এখন অবশ্য আর অভিমান হয় না কারণ ওর বাবা-মা কেউই আর বেঁচে নেই। একমাত্র ছেলের কষ্টকে সাথী করেই হয়ত কবরকেই বেশি স্বস্তিদায়ক স্থান মনে হয়েছে তাদের। মৃত্যুর পরে বাবা-মাকে মাটি দেওয়ার জন্যেও অজিতের সময় হয়ে উঠেনি। তবে একবার সে গ্রামে গিয়েছিল বাবা-মার কবর দেখতে তখন দেখেছে আত্নীয়-স্বজনদের মুখ ঘৃণায় কুঁকড়ে আছে। এরপর রেবেকার শত অনুরোধ সত্ত্বেও তার আর যাওয়া হয়নি সেখানে। রেবেকা হচ্ছে তার স্ত্রী, তার অনেক দুঃখ-সুখের সাক্ষী। হ্যাঁ সাক্ষী বলায় ভাল কারণ অজিতের ধারণা সাথী বললে রেবেকাকে অপমান করা হবে। রেবেকা তার সাথী নয়, তার আত্নার অংশ। এই রেবেকার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল অদ্ভূতভাবে। সে সময়ে তার কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুল ছিল। তার এই ঝাঁকড়া চুল তাকে কবি কবি ভাব এনে দিয়েছিল এবং এই বাহ্যিক রুপই তাকে পরিচয় করিয়ে দিত মানুষের সাথে। তখন দুটো টাকার আশায় কত কিছু করেছে সে এমনকি হকারের কাজ পর্যন্ত। এই হকারগিরি করতে গিয়েই রেবেকার সাথে তার পরিচয়। পরিচয়ের দিনে রেবেকার পরণে ছিল নীল জিন্সের সাথে খয়েরি রংয়ের ফতুয়া আর ওর পরণে ছিল ফুটপাত থেকে কেনা সেকেন্ডহ্যান্ড চেক চেক শার্ট এবং কালো প্যান্ট যা হকারের বেশভূষার সাথে বেশ মানিয়ে যায়। সে বিক্রি করত দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে লিটিল ম্যাগাজিন পর্যন্ত। এসব বিক্রি করে তার যা আয় হত তা দিয়ে তার কোনমতে চলে যেত এবং উপরন্তু লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা পরিচিত হয়ে যাওয়ায় তাদের দয়ায় দু’একটা কবিতাও ছাপা হত। এই নিয়েই বেশ কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো তার সেসময়। কিন্তু রেবেকা তার প্রাত্যহিক স্বাভাবিক জীবনে বাঁধ সাধে। যেখানে বসে সে হকারগিরি করত সেদিনও সে সেখানেই বসেছিল। রেবেকা তার কাছে ‘গৌহাটি’ নামে একটা লিটিল ম্যাগাজিনের খোঁজে এসেছিল যেখানে তার একটা কবিতাও প্রকাশিত হয়েছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে কবিতা পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিল সেই কবির। অজিত লজ্জায় নিজের নামটি বলতে পারেনি। কিন্তু রেবেকা ঠিকই তাকে খুঁজে বের করেছিল। সেদিন ছিল গ্রীষ্মের খরতাপের বিরতি দেওয়া এক মেঘলা আকাশ কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না। সেই দিনটির কথা এখনো তার স্পষ্ট মনে আছে। সে কি কোনদিন পারবে সেই দিনটি ভুলে যেতে? তার আটত্রিশ বয়সের প্রত্যেকটা দিন এমনকি জন্মদিনের কথাও মনে থাকে না তবু সে দিনটির কথা কখনো ভুলে না। তারপরের ঘটনা আর পাঁচ-দশটা প্রেম কাহিনীর মতই। ঢাকা শহরে এরকম প্রেম কাহিনী অহরহই ঘটে থাকে।

রেবেকা পড়ত ইডেন কলেজে। সেই সূত্রে অজিত নীলক্ষেত পার হয়ে আজিমপুরের দিকে যেতে রাস্তায় কতদিন হেঁটে হেঁটে সারাদিন পার করে দিয়েছে। তখন প্রতিদিন তার পকেটে ভালবাসার কবিতা থাকত শুধু রেবেকার জন্যে। রেবেকা বাইরে বের হত খুব কম। বের হলেও সে যেতে চাইত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ কিংবা শাহবাগ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী চত্ত্বর। এইজন্যে তার প্রায়ই রেবেকার উপর অভিমান হত। মাঝে মাঝে তার মনে হত রেবেকা হয়ত তাকে ভালবাসে না। হয়ত এইসব শুহুরে মেয়ের কাছে ভালবাসা মানেই লোক দেখানো পাগলামি।

রেবেকার সাথে তার যে মাসে পরিণয় হল সে মাসেই ভাগ্যের জোরে একটা টিউশনি জোগাড় করে ফেলল মাসিক তিনহাজার টাকায়। এটা তার কাছে বড়লোকদের আজব কারবার মনে হত নাহলে কেউ কেজিতে পড়ে এরকম একটা ছেলেকে পড়ানোর জন্যে তিনহাজার টাকা দেয়? এই টিউশনি জোগাড় করতে তাকে একটিই মিথ্যে বলতে হয়েছিল। ভাগ্যিস ছেলেটার বাবা-মা তার সার্টিফিকেট দেখতে চায়নি নাহলে ওরা জেনে যেত সে অনার্স পাশ করেনি। জানতে পারলে কি ওরা তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিত? অজিত এ নিয়ে অনেকবারই ভেবেছিল এবং শেষে এই ভাবনা মাথাতে রাখতেই চায়নি। এর কারণও আছে বটে। ঢাকায় আসার পর এই প্রথম তার থাকার জন্যে কোন নির্দিষ্ট ঠাঁই জুটেছিল। অবশ্য গরমের দিনে সিংগেল খাট শেয়ার করা খুব কষ্টের হত। তাই মাঝে মাঝে ছোট ঘরটাতে দুঘাট রাখার পর যে সরু রাস্তা ছিল চলাচলের জন্যে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ত। রাত্রিবেলা কেউ বাথরুমে যাওয়ার জন্যে উঠলেই অন্ধকারে লাথি খাওয়া তার পাওনা ছিল। তবে সিমেন্ট মাখানো কালো কুচকুচে ঘরের মেঝে বেশ ঠান্ডা থাকত যার জন্যে তার মোটামুটি ভালই ঘুম হত। এই ঘরেই এক দুপুরে রেবেকা তাকে দেখতে এসেছিল। সেদিন প্রচন্ড জ্বরে অসহ্য যন্ত্রণায় একা বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছিল সে। রেবেকা বিছানায় বসে তার মাথার দিকে ঝুঁকে হাত দিয়ে জ্বর পরীক্ষা করার সময় সে তার বুকের সরু রেখা দেখতে পায়। জ্বরে উন্মাদ অজিত তাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে এসে তপ্ত ঠোঁটে ছুঁইয়ে দেয় তার ঠোঁট। রেবেকা ছটফট করে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। সে চলে যেতে ধরলে অজিত করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এর পরের কয়েকদিন রেবেকা অজিতকে আর দেখতে আসে না। তার জ্বরের আরো অবনতি ঘটে। তার একটা রুমমেটের দয়ায় এক ডাক্তার এসে দেখেও যায় তাকে তবু তার ভাল হওয়ার লক্ষণ নেই। পরেরদিন দুপুরে রেবেকা আবারো আসে। তখনো অজিতের মেসে কেউ ছিল না। রেবেকা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কালো রংয়ের একটা প্যাকেট বের করে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় অজিতের মুখ। অজিত এবার সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠে। যেদিন সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠে সেদিনই রেবেকা এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় কাজী অফিসে। তারপর থেকে এক ছাদের নিচে না থেকে ওরা দুজন স্বামী-স্ত্রী।

অজিত ঘড়ির দিকে তাকায়। এরই মধ্যে আধ ঘন্টা পার হয়ে গিয়েছে। আহমদ সাহেব তাকে আধ ঘন্টা পরে ফিরে যেতে বলেছেন। এর মাঝেই তিনি কাজ সেরে ফেলবেন বলেছেন। তাই সে ফিরতি পথ ধরার কথা ভাবে। আহমদ সাহেবের ফ্লাট থেকে রেবেকাকে নিয়ে তাকে তার হোস্টলে রেখে আসবে। রাস্তার পাশে দোকান দেখতে পেয়ে সিগারেট কিনে ও। সিগারেট কিনতে গিয়ে দোকানের ভিতর থরে থরে সাজানো সাবান গুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। এই সাবানগুলো কি শরীরের সব ময়লা ধুয়ে নিতে পারে? রেবেকাকে দেবে বলে সে একটা স্যান্ডেলিনা স্যান্ডাল সোপ কিনে নেয়। এই সাবানটা তার পছন্দ হয়। টিভিতে সে এই সাবানের এ্যাডভারটাইজ দেখেছে। এক সুন্দরীর স্নানের দৃশ্যে সে রেবেকাকে কল্পনা করে। কল্পনা করে সাবানের হাজার হাজার ফেনা তার শরীরটাকে আবারো পবিত্র করে পরীর মত করে তুলবে। সে সাবান কিনে তার হৃপিন্ডের উপর ঠেসে ধরে। হৃপিন্ডে ঠেকিয়ে সে কি সাবানটিকেও হৃপিন্ড বানাতে চায়? তার হৃপিন্ড নিশ্চয় রেবেকার শরীরের ময়লা দাগগুলো ধুয়ে দিবে। হ্যাঁ নিশ্চয় দিবে। বুকটা এবার হালকা করার চেষ্টা করে সে। সিগারেট ধরিয়ে জোরে একটা টান দেয়। এক টানেই সিগারেটের অনেকখানি পুড়িয়ে ফেলতে সক্ষম হয় সে। অজিত এভাবেই মনে মনে কাউকে পুড়িয়ে ফেলার মনস্থ করে চলে।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


8 Responses to সম্ভোগ

  1. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ এপ্রিল 16, 2011 at 8:32 অপরাহ্ন

    এসবই বাস্তব যেনো আজকাল

  2. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি এপ্রিল 17, 2011 at 6:09 পূর্বাহ্ন

    বেশ । আপনার লেখা আগের চেয়ে আরো পরিণত লাগে ।শেষ লাইনের শেষ করাটা দারুন । শুভকামনা ।

  3. রাজন্য রুহানি এপ্রিল 17, 2011 at 9:22 পূর্বাহ্ন

    অনেক ভালো। তবে রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন— গল্পে তত্ত্বকথা, মন্তব্য বা বর্ণনার ঘনঘটা থাকবে না। আজকাল অনেকেই এ নিয়ম মানছে না।
    হা হা হা, নিয়ম ভাঙার গানই হলো কালের দাবি!

  4. sokal.roy@gmail.com'
    সকাল রয় এপ্রিল 18, 2011 at 3:04 অপরাহ্ন

    লেখা দিন দিন ভালো হয়ে উঠছে

    এ যেন বাস্তবতা

You must be logged in to post a comment Login