এ.বি.ছিদ্দিক

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস- টুকরো অভিশাপ (পর্ব-১)

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

সকালবেলা পুইশাক আর ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে প্রায় এক গামলা গরম ভাত খেয়েছে আজগর, অথচ দুপুর হতে না হতেই আবার ক্ষুধা লেগেছে ওর। অবশ্য এখনও দুপুর হয়েছে কিনা সে ব্যাপারটায় মোটেও নিশ্চিত নয় ও। অন্যদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে অথবা নিজের ছায়া দেখেই সে বলে দিতে পারে দুপুর হয়েছে কিনা, অথবা আছরের আযান পড়তে আর কত বাঁকি, কিন্তু আজ সেটা বলা যাচ্ছেনা। প্রচণ্ড মেঘ করেছে আকাশে। সতীশ হাতে সবসময় ঘড়ি পড়ে, এই সময়টায় ও বাড়িতেই থাকে। ওর কাছে গিয়ে জিঞ্জাসা করলেই ও সময় বলে দেবে, সতীশের মা ওকে ছেলের মতই দেখে, গেলে নিশ্চয় খালি মুখে ফেরাবে না। কিন্তু সতীশের কাছে যাওয়া যাবে না, আজগর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও আর সতীশের সঙ্গে কথা বলবে না। গতকাল সতীশের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছিল সবাই, অথচ মেয়ে দেখতে নেয় নি ওকে, মেয়ে দেখে পছন্দ হয়েছে সে খবর একবার বাড়ি বেয়ে বলতেও আসেনি? এই কি তাহলে ছোটবেলার বন্ধু? জানের দোস্ত?

সতীশের মা ছাড়া এই মূহুর্তে ওকে ভাত দেবার মত একজনই আছে, ছালমা। কিন্তু ইদানীং ছালমাকে দেখলে কেন জানি লজ্জা করে ওর, বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করে, আবার ওর কথা মনে হলে ভালও লাগে। সতীশ বলে ছালমাকে বিয়ে করলে নাকি সব ঠিক হয়ে যাবে, সতীশের কথায় গা জ্বালা করে আজগরের আবার শুনতে মন্দও লাগেনা, সতীশ আরও বলে বিশেষ এই অনুভূতির নাম নাকি ভালবাসা, যত্র সব ছেলেমানুষি ওর। অবশ্য হলেও হতে পারে, সতীশ এ গায়ের একমাত্র বি.এ পাশ। ওর তো আবার ঘর ভর্তি  বিদ্যা। আচ্ছা বারবার সতীশের কথা কেন মাথায় আসছে? ওর কথা ভাবতে চায়না আজগর, ওকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য ছালমাকে নিয়ে ভাবতে থাকে। ওকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে  ওদের বাড়ির সামনে চলে আসে ও, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা। ছালমা বাড়ির বাইরের উঠানে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল, আজগরকে দেখে ছালমা ই প্রথম বলে উঠে

: আজগর ভাই নি? যাও কই?

ছালমার কথা শুনে আজগরের বুকের ভেতরটা আবার ধকধক করে ওঠে। আজগরের লজ্জা বোধ হয়। ও একবার নিজের দিকে ভাল করে তাকায়। আজ পায়ে স্যান্ডেল পড়েনি , পরনের লুঙ্গিটাও কেমন যেন নোংরা নোংরা। আহা, সতীশের কাছে গিয়ে বললেই একটা ভাল স্যান্ডেল আর লুঙ্গি দিত। কিন্তু সতীশের কাছে যাওয়া যাবেনা, কিছুতেই যাওয়া যাবেনা। ছালমা খালি পা আর নোংরা লুঙ্গি দেখে কিছু ভাববে না তো? ভাবলে ভাবুক। অবশ্য এককাজ করা যেতে পারে, ছালমার চোখে চোখ রেখে কথা বলা যেতে পারে, তাহলেই তো ও আর পায়ের দিকে কিংবা লুঙ্গির দিকে তাকাবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আজগর ছালমার চোখে চোখ রাখতে পারেনা, কেন জানি মনে হয় ও কি ভাবছে ছালমা সব বুঝে ফেলছে। আবার ছালমার মুখে আজগর নাম শুনতেই সে চমকে উঠল।

: আজগর ভাই, হুইনা যাইয়ো।

আজগর চমকানোর মত করে বলল

: অ্যাঁ, কি?

ছালমা আজগরের অপ্রস্তুত ভাব দেখে কোদাল পাশে রেখে হাসতে শুরু করল। তাতে আজগরের বুকের মধ্যকার ডিপডিপানি আরও বেড়ে গেল। আজগর নিজের খালি পা, আর লুঙ্গি লুকাবার ভঙ্গি করে ওর দিকে যেভাবে এগিয়ে গেল তাতে ওকে দেখে যে কারো মনে হবে ও খুড়িয়ে হাঁটছে। ছালমা আজগরের পায়ের দিকে খানিক তাকিয়ে বলল

: পায়ে কি অইছে আজগর ভাই?

মনে মনে আজগর বলল “ গেল আজ সব গেল, আজ ভাগ্যে লজ্জা পাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সব দোষ সতীশের, ওর জন্যই এতকিছু, সব দোষ ওর”

: কি অইছে পায়ে কইলা না তো?

: কই না? কিছুই অয় নাই।

: তাইলে খুড়াও ক্যা। কাঁটা ফুটছে নি?

: না কিছু অয় নাই, কিছুই অয় নাই।

ছালমা আবারও হাসতে থাকে। ছালমাকে হাসতে দেখলে ভাল লাগে আজগরের আবার কেমন একটু লজ্জা লাগে। আচ্ছা লুঙ্গির কোথাও ছেড়া নেই তো, সেসব দেখে আবার হাসছেনা তো ছালমা?

: হাসো ক্যা?

: এমনেই হাসতাছি? হাসমু নাতো কি করমু? কানমু? কও তো কাঁনদি।

ছালমা কাঁদার মত ভাব করে তারপর আবার হাঁসতে থাকে।

: কি জন্য ডাকলা হেইডা কও।

: এমনেই ডাকি, তোমার লগে গপ করমু।

: আমার লগে আবার কিইয়ের গপ?

: বহ তো এই হানডায়।

আজগর ছালমার কথা মত চুপ করে বসে পড়ে মাটির উপরেই।

: ম্যাঘের অবস্থা দেখছো নি আজগর ভাই, ঠিক বৃষ্টি নামবো।

: বৃষ্টি নামবো তো এর মইধ্যে বাইরে কি কর?

: কইডা লাউগাছ আর কইল্যা লাগামু, জানলা দিমু।

আজগর একবার কোদাল আর একবার খোরা মাটির দিকে তাকায়। মাটি এখনও এক দশমাংশও কাঁটা হয়নি। সে পড়ে থাকা কোদালটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ায়। ছালমা তাকে বাধা দিয়ে বলে

: এইডা কি কর আজগর ভাই?

: দেহ না কি করি?

: না, কোদাল দাও, আমি একাই পারুম, তুমি বহ, অনেকদিন গপ করি না তোমার লগে।

: মাটি কাটতে কাটতেও গপ করন যাইবো, তুমি কও আমি হুনি আর মাটি কাটি।

আজগর লুঙ্গিটাকে ছোট করে নিয়ে পড়ে শক্ত হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে থাকে। ছালমা আবার বলতে শুরু করে

: আমি ই তো কাটবার পারতাম, তুমি আবার কষ্ট করবার গেলা ক্যান?

: কষ্টের কিছু নাই, গপ করবা কইলা, গপ কর? কি কইবা কও।

: সতীশ দার নাকি বিয়া? মাইয়া দেখবার গেছিল, কিছু হুনছো নাকি?

আজগর মাটি খোরা ফেলে কপালের ঘামটা মুছে একবার ছালমার দিকে তাকায়, তারপর আবার মাটির বুকে কোদাল চালাতে চালাতে বলল

: হ্যাঁর কুনো খবর আমি রাহি না।

: ক্যান? হেইতে না তোমার বন্ধু লাগে?

: হ্যাঁই কিছুই লাগেনা আমার, সতীশ আমার কেই না, তুমি আমার সামনে তার কথা কইবা না কইলাম?

: অ বুঝছি, সতীশদার লগে তোমার আবার কেওয়া (ঝগড়া) লাগছে।

: কারো লগেই আমার কেওয়া লাগে নাই, তুমি কইলাম হ্যাঁর কথা কইবানা, তাওতাছ।

: আইচ্ছা কমুনা, কিন্তু কি কমু হেইডাই তো বুঝবার পারতাছি না।

: তোমার বাপের খবর কিছু পাইলা?

বাবার কথা বলতেই ছালমার ভেতরে অজানা এক হতাশা উঁকি দেয়, সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে

: হ্যাঁর আর খবর, আবার কবে আইবো না আইবো তার কি কুনো আগা মাথা আছে?

: তোমার মায়ে কি কয়?

: মায়ে আর কি কইব? আবার কবে বাপে আইব ক্যাডা জানে।

: চিঠি পত্তর কিছু দেই নাই?

: খালাসি গো হাত  দিয়ে আইজ বিশ দিন একটা চিঠি আর টাহা পয়সা কিছু পাঠাইছে।

: একদিক দিয়া কইলাম ভালাই অইছে, টাহা পয়সার অভাব তো আর তোমগো নাই।

ছালমা আজগরের কথায় প্রতিবাদ করে বলে

: টাহা পয়সার না হয় অভাব নাই, কিন্তু বাড়ি তো একটা পুরুষ মাইনসেরও দরকার অয়, কহন কি অয়, তা কি আর কয়ন যায়?

: তা ঠিকই কইছ ছালমা।

: দ্যাশের অবস্থা কিছু জান?

: দ্যাশের খোঁজ, নিজের খোঁজই রাহে ক্যাডা।

: দ্যাশের অবস্থা নাহি ভালা না, মজিব সাবগো নাকি রাজা বানাইতে দিবনা হ্যাঁরা।

: হ্যাঁরা আবার কারা?

: চিনলা না হ্যাঁগো? জিন্নাহ সাহেবের নাম হুনো নাই?

: জিন্না, টিন্না কাওগো চিইন্না আমার কি লাভ আছে? হ্যাঁরা তো আর আমারে খাইতে দিব না, আমি খালি চিনি মজিব রে আর ইয়াহিয়ারে। জিন্না কাগো লোক হেইডা কও, পুব দ্যাশের না পচ্চিমের (পশ্চিমের)?

: হ্যাঁরা তো হগলে পচ্চিমেরই, মজিব সাবরে নাকি হ্যারা রাজা বানাইবো না।

আজগর কোদাল রেখে জ্বলন্ত ভাবে ছালমার দিকে তাকায়। তারপর বলে

: দিব না মানে? হালাগো সাহস কত? হ্যালাগো মুখে আমি ছ্যাপ দেই, পিসাব করি।

এ কথা বলার পর আজগর নিজেই যেন এটু লজ্জা পায়, তবে ও লক্ষ করেছে পশ্চিমা ভাষাভাষির মানুষদের কুৎসিতভাবে বকলে মনের মধ্যে চাপা আনন্দ হয়।

: তুমি, আমি কইলে তো অইবো না, হুনলাম দেশে নাকি এবার বড় মারামারি লাগবার পারে, তুমি কিছু হুনছো?

আজগর উদাসীন ভাবে বলে

: কি জানি? সতীশ তো দেহি লোকরে গুছাইয়া কি সব কয়, মজিব সাব, ইয়াহিয়া খাঁ, আর জানি কি কি—–

আজগর আরও কিছু বলতে চাই, কিন্তু তার আগেই পশ্চিম থেকে সা সা করে বৃষ্টি আসার শব্দ শোনা যায়। তাই দেখে কোদাল হাতে নিয়ে ছালমার সঙ্গে বৃষ্টি থেকে বাচার জন্য ঘরের মধ্যে আশ্রয় নেয়। আজগর কি জানত, পশ্চিমের বৃষ্টির মত একদিন পশ্চিম পাকিস্তানের নরপিশাচরাও  অদের উপর হানা দেবে। পশ্চিমের বৃষ্টি থেকে বাঁচলেও পশ্চিমা সেনাদের কাছ থেকে ওরা বাঁচতে পারবে তো?

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


4 Responses to মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা উপন্যাস- টুকরো অভিশাপ (পর্ব-১)

  1. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি জুলাই 24, 2011 at 10:13 পূর্বাহ্ন

    কাকতালীয় ব্যাপার আমি নিজেও একটা উপন্যাসে হাত দিয়েছি।মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক।যদিও গল্পের বিষয় যুদ্ধ না সাধারণ মানুষ তবে ইনফরমেশান আমারো দরকার।আপনার উপন্যাসটা নিয়মিত পড়ব।শুভ কামনা,এগিয়ে যান ভালো হচ্ছে।

    • abubakkar.siddiq004@gmail.com'
      এ.বি.ছিদ্দিক জুলাই 25, 2011 at 12:31 পূর্বাহ্ন

      যুদ্ধ নিয়ে লিখতে গিয়ে মাঝে মাঝে ব্রেক চাপতে হচ্ছে। প্রচুর তথ্য দরকার কিন্তু সময় হয়ে উঠছে না তথ্য সংগ্রহের।

  2. sokal.roy@gmail.com'
    সকাল রয় জুলাই 24, 2011 at 1:33 অপরাহ্ন

    ভালো হচ্ছে
    আপনি যে পরিমান লেখা শুরু করেছেন তাতে খুব ভালো লাগছে

You must be logged in to post a comment Login