শাহেন শাহ

অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য): শায়ের খান

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য)

শায়ের খান

প্যাথলজি ল্যাবরেটরি লাটে ওঠায় লাট বাহাদুর ফুয়াদ ভাইও লাটে উঠি উঠি করছেন। ফুয়াদ ভাইয়ের কথা বলছি। আমার কাজিন। ঐ যে ইন্দিরা রোডে থাকে। থাকে একাই। একটা বাসা ভাড়া করে থাকে আর ব্যবসা করে। প্যাথলজি ল্যাবরেটরি ছিল তার। কিন্তু ক্রমাগত যখন তার ভুল ডায়াগনোসিসে রোগীরা পর্যুদস্ত, তখন ঘটনা ঘটল অন্যরকম। চতুর্থবার যখন ফুয়াদ ভাই ডায়রিয়ার রোগীকে জন্ডিসের রোগী বলে রায় দিলেন আর তৃতীয়বারের মত লিভার সেরোসিসের রক্তে টাইফয়েডের জার্ম খুঁজে পেলেন, ক্ষেপে গেল পুলিশ। ষষ্ঠবার পর্যন্ত সহ্য করেছিল তারা, কিন্তু সপ্তমবারে সপ্তমে চড়ে গেল ওদের মেজাজ। এসে লটকে দিয়ে গেল তারা ইয়া বড় এক তালা ল্যাবরেটরির দরজায়। ফুয়াদ ভাইয়ের ইনকাম বন্ধ হয়ে গেল পুরোপুরি। আর ইনকাম বন্ধ হওয়ায় তার কাম ইন শুরু হল আমাদের বাসায়। ইনকাম থাকলে বড় একটা আসেন না উনি এদিকটায়। ফুয়াদ ভাইয়ের ইনকাম বন্ধ হলেই এবাসায় তার কাম ইন এর শুরু। ওনার ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে শুরু করে আমাদের কাছে। একদিন লাঞ্চের সময় ঘটাঙ করে কাকা সেই নিদারুণ প্রশ্নবাণটি হেনে বসেন ফুয়াদ ভাইয়ের প্রতি।

‘কিরে, ব্যবসা লাটে উঠল কেন হঠাৎ?’

বডি শেক করে থেমে স্বাভাবিক হয়ে যান ফুয়াদ ভাই।

‘না মানে ভুল রিপোর্টে পুলিশ কেস খেয়ে গেছি।’

‘কেন? যন্ত্রপাতি নষ্ট নাকি তোর প্যাথলজির? ভুল রিপোর্ট আসবে কেন?

‘কিসের যন্ত্রপাতি? কাকীমা খেঁকিয়ে ওঠেন এবার। ‘যন্ত্রপাতি কি কিনেছে নাকি ও কখনো? শো পিস হিসেবে কলেজের বায়োলজি ল্যাবরেটরির রিজেক্টেড মাইক্রোস্কোপটা নামে মাত্র কিনে এনে বসিয়ে রেখেছে। আসলে অন্য বড় ডায়াগনোসিস সেন্টারের দালালী করে ও।’

‘হোয়াট?’ চমকে ওঠেন কাকা একথায়।

কাকীমা চালিয়ে যান, ‘কতবার বলেছি যে এ হচ্ছে গিয়ে মানুষের জান নিয়ে ব্যবসা। হেলাফেলা করিস না কিন্তু। এখন হল তো? বুঝলে তো ঠেলা শেষমেশ?

‘আমি বুঝি না,’ বলেন কাকা। হাউ ডু ইউ ডেয়ার টু প্লে সাচ গেমস উইথ পিপল। ইউ পিপল শুড বি পানিশড ওয়েল।’

কিছু বলেন না ফুয়াদ ভাই। শুধু মাথা নিচু করে একমনে ভাত মেখে খেতে থাকেন। তৃতীয়বার পরীক্ষায় ফেল মারার পর মানুষের এহেন অনুভূতিহীন আচরণের উদ্ভব ঘটে।

লাঞ্চের পর আমার ঘরে আধশোয়া অবস্থায় একমনে সিগ্রেটের ধোঁয়ার রিঙ বানাতে থাকেন উনি একের পর এক। তার মনের জরুরী অবস্থা বুঝে নিতে আমার কষ্ট হয় না। যখন দেখি মৃদু শব্দে উনি তার উৎপাদিত রিঙ-এর সংখ্যা গণনা করে চলেছেন। হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হলেই উনি এহেন ধোঁয়াটে গণনা শুরু করেন। এ তত্ত্ব জানা আমার।

চৌত্রিশতম রিঙ-এ গিয়ে আচমকা ফুয়াদ ভাইয়ের মুখের কোণে এক অদ্ভুত সুখকর কুটিল হাসি ফুটে ওঠে।

তার হাসিতে নড়েচড়ে বসি। কুটিল হোক আর জটিল হোক-হাসিতো। জরুরী অবস্থায় এই মুহূর্তে তার হাসিটাই জরুরী।

‘কিছু সমাধান পেলে কি?’ শবাসন থেকে পদ্মাসনে বসি। কিছু বলেন না ফুয়াদ ভাই। শুধু মিটি মিটি হেসে সিডি প্লেয়ারের রিমোটটাতে চাপ দেন। পল ইয়ং-এর ‘লাভ অব দ্য কমন পিপল’ গানটি বাজতে থাকে।

ধীরে ধীরে শুরু করেন ফুয়াদ ভাই. ‘বুঝলি। আইডিয়া এসেছে একটা মাথায়।’

‘কেমন তরো?’

‘প্যাথলজি আর করব না ভাবছি।’

‘প্যাথলজি করবেনাতো, করবেটা কি?’

ঈঅজ করব।’

ঈ-অ-জ?’ বুঝতে পারি না ওনার ঈঅজ -সাজিটা।

‘বুঝলি না? ওই যে, পুরনো ভাঙা গাড়ি কমদামে কিনে এনে, ধোলাইখাল থেকে পার্টস বদলে ডেন্ট-পেইন্ট করে,’ বলেই থেমে যান উনি। বুঝতে কষ্ট হয় না আমার।

‘সে না হয় বুঝলাম,’ বলি আমি। ‘এ ব্যবসা তো তুমি একসময় করতে। গাড়ির ব্যবসা। কিন্তু এক্ষেত্রে তো টাকা লাগবে মেলা।’

‘ওখানেই তো খেল,’ বলে চোখে মুখে খেল খেলান উনি।

‘শোন পাগলা, প্রথমে করব কি, পেপারে বিজ্ঞাপন দেব-ফিন্যান্সার চাই। ফিফটি ফিফটি লাভের অফার দেব প্রথমে। পার্টির ফিন্যান্স, আমার টেকনিক। ব্যস। আর তার পর পরই একসময় সুযোগ বুঝে-’ বলেই বাঁ চোখটাকে একটু ছোট করেন আর ডান হাতটা কচু কাটা করার ভঙ্গিমা করে বলেন-‘কাট?’

‘মানে?’ লাফ দিয়ে উঠি আমি। ‘কাট কেন? কাটানোর প্রশ্ন আসছে কেন এখানে? পার্টনারশিপে ব্যবসা করবে, সে তো ভাল কথা। এখানে আবার-।’

‘আরে রাখ তোর নীতিকথা,’ বলে পাঞ্জা ছড়িয়ে দেন উনি আমার দিকে। ‘এদেশে যারা বড়লোক হয়েছে, তারা একজন আরেকজনকে কেটে কেটেই বড়লোক হয়েছে। তা আমার ক্ষেত্রে কেন তার অন্যথা হবে? আমি কেন কাটতে যাব না?’ বলেই উঠে পড়েন উনি। আর অতঃপর কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়েন। বুঝতে পারি, বিজ্ঞাপনের ড্রাফটটা তৈরি করছেন।

রাগ হয়ে যায় ওনার ওপর বেশ। প্রত্যেকটা কাজে তার এহেন বদচিন্তা। ব্যবসা মানেই উনি বোঝেন লোক ঠকানো। আরে বাবা কত করে বোঝালাম যে ব্যবসা সৎভাবে করেও লাভ করা যায়, তাতে কিসের কি? লাভ হল না কোন-ই তাতে। লাভের লোভে উনি সবসময়ই লোভী।

‘শোন,’ বিজ্ঞাপন লিখতে লিখতে বলেন উনি, ‘আদম ধরার ব্যাপারে তোর আমাকে হেল্প করতে হবে কিন্তু।’

‘আদম?’

‘হ্যাঁ। ফিন্যান্সার। ওদের আমি আদম নামেই ডাকি।’

‘তা শুধু আদম কেন?’ দম নিয়ে বলি আমি। ‘হাওয়াও তো হতে পারে। মেয়ে ফিন্যান্সারও তো আসতে পারে।’

‘সবাই-ই আদম। আরে বোকা, আদম বলতে কি আমি ম্যাসকুলিন জেন্ডার বুঝিয়েছি? আদম বলতে বুঝিয়েছি-বোকা ফিন্যান্সার। যারা বোকা, তারাই আদম। দেখিসনা যারা আদম ব্যবসায়রী খপ্পরে পড়ে, তারা সবাই ই বোকা?’

ছিহ্ ছিহ্। মাথা হেঁট হয়ে আসে আমার। একজন লোক, যার কিনা টাকা আছে, অথচ ব্যবসায়িক জ্ঞান নেই, সে একজন জ্ঞানসম্পন্ন লোকের কাছে এলো শেয়ারে টাকা খাটাতে- সে কিনা বোকা হয়ে গেল?

‘কি ভাবছিস?’ গম্ভীর আদেশমূলক গলা ফুয়াদ ভাইয়ের।

‘হেলপ করতে রাজী আছিস আমায়?’

‘হু আছি।,’ বলে রাগটাকে সংবরণ করি।

আমার এই কাজিনগুলোর অনেক অন্যায় কাজে সায় দিতে যদিও আমার নীতিতে বাধে, তারপরও কেন জানি তাদের এই অত্যন্ত আকর্ষণীয় কু-প্রবৃত্তির মায়াজালে জড়িয়ে যাই আমি। এদের এই আকর্ষণ ক্রমশঃ কর্ষণ করে গুঁড়ো করে ফেলে আমার সুপ্রবৃত্তিকে, আর অতঃপর তার উপর বিছিয়ে দেয় কু-প্রবৃত্তির মায়াজাল। সে জাল ছেঁড়ে সাধ্য কার?

২.

শুক্রবারের দৈনিকগুলোতে যখন নিচের বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ হল, তখন আমার আনন্দ আর ধরে না।

ফিন্যান্সার চাই

অন্তত: পাঁচ লক্ষ টাকা খাটাতে সক্ষম ফিন্যান্সার চাই। ব্যবসায়িক শর্তাবলী আলোচনা সাপেক্ষ।

যোগাযোগ: ০১৯১৩৮৪২৩২।

ই-মেইল: নযধষড়থভঁধফ@ুধযড়ড়.পড়স

সকাল থেকে আমি আর ফুয়াদ ভাই বসে থাকি ফোন নিয়ে ফুয়াদ ভাইয়ের ফ্ল্যাটে।

‘শোন,’ তর্জনী তোলেন উনি। ‘কথাবার্তায় যদি চালাক চতুর মনে হয়, তবে নিষেধ করে দিবি আদমকে। বলবি আমাদের ফিন্যান্সার পেয়ে গেছি আমরা। আর যদি বুঝিস যে লাট্টু মার্কা গোবর গণেশ, তবে সম্মান দেখাবি ভীষণ। এক্ষুণি যোগাযোগ করতে বলবি আমাদের সাথে। ফোন রাখার সময় সালাম দিবি। খবরদার কার্টিসির যেন একটুও এদিক-ওদিক না হয়।’ বলে বেরিয়ে যান শপিংমলের উদ্দেশ্যে। আর আমি বসে থাকি ফোনের আশায় একটা রিডার ডাইজেস্ট নিয়ে। ঠিক দশ মিনিট পর প্রথম রিংটা বেজে ওঠে। চমকে উঠে রিসিভ করি।

‘হ্যালো,’ বলি আমি।

‘হ্যাল লো-,’ খঙড আবেদনময়ী এক সুললিত মেয়ে কণ্ঠ ওদিকে। ‘এটা কি ০১৯১৩৮৪২৩২?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ,’ খুশিতে ডগমগ আমি।

‘ফুয়াদ আছে?’

‘না, উনি একটু বাইরে গেছেন।’

‘আমি হচ্ছি গিয়ে-,’

‘বলা লাগবে না, বুঝেছি বুঝেছি। আজ সকালের ব্যাপারটাইতো?’

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই,’ একটু লজ্জা পায় যেন মেয়েটি।

‘আপনি কে বলছেন প্লিজ-।’

‘ইয়ে আমি ওনার কাজিন। আপনি আমার সাথে আলাপ করতে পারেন। আমাকে সবকিছু বলে গেছেন উনি। আসলে এককথায় ফুয়াদ ভাইয়ের ব্যাপারটা হচ্ছে, পুরো টাকা-টা আপনাকে দিতে হবে-।’

‘মানে?’ চমকে ওঠে যেন সুইট ভয়েসটি।

‘হ্যাঁ ঠিক তাই। পুরোটা আপনাকে ফিন্যান্স করতে হবে। এক পয়সাও দিতে পারবেন না উনি। শেয়ার করার ক্ষমতা হারিয়েছেন। আপনি যদি পুরোটা দিতে পারেন তবে ব্যবসা হতে পারে, নয়তো নয়।’

‘ব্যবসা?’ আঁতকে ওঠে মিষ্টি মেয়ে।

‘হ্যাঁ ব্যবসা-ই তো। লাভের ব্যবসা। লাভের ফিফটি ফিফটি পার্টনার। ব্যবসা ছাড়া কি লাভ হয়, অথবা লাভ ছাড়া ব্যবসা?’

‘কি?’ কাঁদো কাঁদো ঠেকে যেন মেয়ের গলাটা।

সুইট থেকে সুইট এ্যান্ড সাওয়ারে টার্ন করে ভয়েস।

খঙঠঊ-কে ও ব্যবসার চোখে দেখে?’

‘বাহ, লাভ ছাড়া কি ব্যবসা হয় নাকি? খঙঠঊ আপনি ঠিকই পাবেন, তবে খর্চা পুরোটা আপনারই দিতে হবে।’

‘একথা বলেছে ও?’ ভেজা গলায় শুধোয় মেয়ে। সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ভয়েস গ্রেভি হয়ে ওঠে যেন। বলে, ‘আর কি কেউ ফোন করেছে আজ?’

‘করেনি এখনো, তবে করবে অনেকেই। আজ তো ফোন আসারই দিন। নিদেনপক্ষে বিশ পঁচিশটা ফোন তো আসবেই। যদিও সবার সাথে লাভ নিয়েই কথা হবে, তবে সবার সাথে ওনার একই শর্ত। খর্চাটা ওই পক্ষের। খঙঠঊ ফিফটি-ফিফটি।’

‘ঠিক আছে,’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে মেয়ে। ‘ওই ঈঐঊঅঞ -টা এলে বলে দেবেন আমাকে যাতে আর ফোন না করে। বলবেন মোনালিসা ফোন করেছিল। বলে দেবেন-‘হ্যাপি বার্থ ডে টু হিম,’ বলেই কাঁদতে কাঁদতে কুটুশ করে ফোন রেখে দেয়।

হ্যাপি বার্থ ডে টু হিম? হতভম্বের মত বসে থাকি আমি। জন্মদিন কি আজ ফুয়াদ ভাইয়ের? সব্বোনাশ! শপিং সেরে ফিরে এসে সব শোনেন ফুয়াদ ভাই। আর তার পরপরই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় চেচিয়ে ওঠেন, ‘করেছিস কি হারামজাদা। সর্বনাশ করে দিয়েছিস আমার। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আজ আমার বার্থ ডে। ওকে নিয়ে আজ আমার ঞঙচকঅচও রেস্টেুরেন্টে ইঠঋঋঊঞ খাওয়ার কথা ছিল। তারপর হাইওয়ে রাইড। তা তুই কি বলেছিস?’

‘ইয়ে, আমি বলেছি যে, খর্চা-টা ওর দিতে হবে পুরোপুরি। তোমার পকেট ফাঁকা। একটা পয়সাও খর্চা করতে পারবে না তুমি। তবে লাভ-এর ব্যাপারে ঠকাবে না-এটাও বলেছি।’

‘আর আর কি বলেছিস?’ কেঁদেই ফেলেন উনি।

‘আর বলেছি যে, বিশ পঁচিশটা ফোন আসবে আজ। সবাই লাভ-এর ব্যাপারেই কথা বলবে। তবে যে পুরো খর্চা টা দিতে পারবে, তার সাথেই লাভ-এর ব্যবসা করবে তুমি।’

‘ওহ নো।’ উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন উনি। আর অতঃপর স্বগতোক্তির মত বলেন, ‘আবার এটা বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠাণ্ডা করতে দুইদিন চওততঅ ঐটঞ, একদিন এিউ আর তিনদিন কঋঈ অেউ-িএর মামলা।’

উঠে দাঁড়াই আমি এবার। ধীরে ধীরে গিয়ে হাত রাখি বিধ্বস্ত ফুয়াদ ভাইয়ের পিঠে। বলি, ‘কই, আজ যে তোমার বার্থ ডে ছিল সে কথা তো বলনি? ম্যানি ম্যানি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্য ডে-!’

‘ম্যানি ম্যানি রিটার্নস-?’ চমকে ওঠেন ফুয়াদ ভাই। থমকে থেমে চোখের পাতা ফেলি কয়েকটি। কি বলা যেতে পারে এর উত্তরে-ভাবতে থাকি অনবরত।

৩.

পরদিন দুপুরে হাজির হই ফুয়াদ ভাইয়ের ফ্ল্যাটে। ঢুকেই চমকানোর পালা আমার। দেখি বিছানায় পদ্মাসনে বসে আছে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। আর তার সামনে চেয়ার পেতে বসে বসে হাত কচলাচ্ছেন ফুয়াদ ভাই। লোকটির আয়েশি উদ্ধত ভঙিমা গুরুজনদের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভাবখানা এমন- এ বিছানা এ ঘর, এসবই আমার। ফুয়াদ তো কেবল উসিলা মাত্র। তৈলাজ চুলের ব্যাক ব্রাশ আর সস্তা প্রসাধনীর লাবন্য ফিসফিসিয়ে বলে দেয়- গ্রাম থেকে এসেছেন উনি। মুখমন্ডলের প্রশ্নবোধক সুইচটা অন করি। বুঝতে পারেন ফুয়াদ ভাই। বলেন, ‘পরিচয় করিয়ে দেই, ইনি হচ্ছেন আমার গেস্ট আর ও হচ্ছে আমার কাজিন।’

‘কি নাম?’ মসৃণ কৃষ্ণকায় গালে হাত ঘষে বালিশে হেলান দেন অতিথি।

‘জ্বী ইয়ে, কল্লোল।’ বিনয়ে আইসক্রীমের মত গলে পড়ি আমি।

‘ও একজন লেখক,’ যোগ করেন ফুয়াদ ভাই। ‘বেশ জনপ্রিয়।’

‘জ-ন-প্রি-য়? নাম তো শুনিনি কোনদিন।’ মুখ বেঁকান ভদ্রলোক।

‘ইয়ে মানে, নাম শোনা যায় না খুব একটা, তবে জনপ্রিয় বটে। মানে, জনে জনে ওর প্রিয়তা। অর্থাৎ কিনা জনগণের কাছে ও প্রিয় নয় হয়ত, তবে জনগণ ওর কাছে বেশ প্রিয়। জনগণকে ভালবাসে ও। সেজন্যই ওদের জন্য কষ্ট করে লেখে। জনগণের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে ওদের জন্যই কষ্ট করে লিখে চলেছে ও। ওয়ান সাইডেড লাভ। হৃদয়ে রয়েছে ওর জনের জন্য প্রচণ্ড ‘জন’প্রিয়তা। লেখকের ‘নাম’সহ প্রশংসার নামতা পড়েন ফুয়াদ ভাই। আর অতঃপর চোখের ইশারায় বাইরে ডেকে নিয়ে আসেন আমায়। ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘আদম! খবরদার। খুব সাবধান। সৌজন্যের একটুও এদিক-ওদিক হয় না যেন। আর ভাবটা দেখাবি যেন আমরা অভাবী না। মানে ভাব থাকবে ওর সাথে পুরোপুরি-ই, তবে সেটা কেবলই সদ্ভাব। অভাবীর সাথে কে আর ব্যবসায়িক ভাব করতে চায় বল? তার ওপর ও এসেছে গ্রাম থেকে। সাহস যোগাতে হবে না ওকে? একবার গ্যাঁড়াকলে ঢুকে নিক না বাপধন। তখন আমাদের অভাব নয়, ভাব-ই ওকে ভাবিয়ে তুলবে বেশ,’ কথা শেষ হলে আবার রুমে ঢুকি দুজনে।

‘ইয়ে,’ কোমরে নাইনটি ডিগ্রী কোণ এঁকে বোকাটার সামনে ঝোঁকেন ফুয়াদ ভাই, বলছিলাম যে চা-টা খেয়ে চলুন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। ঢাকা শহরটা পুরোপুরি দেখা হয়নি বোধহয় আপনার।’

‘তা হয়নি হয়ত,’ একটু লজ্জা পান যেন শ্রদ্ধেয় হাদারাম। ঢাকার কথায় লজ্জাটা একটু ঢাকা দিতে চেষ্টা করেন যেন। বলেন, ‘ ঢাকা এসেছিলাম লাস্ট এইটি নাইনে।’ খুশি হয়ে ওঠেন ফুয়াদ ভাই একথায়। ভাবখানা এমন যে এ লোকটিকেই খুঁজছিলেন উনি এতদিন।

বিকেলে চা খেয়ে বেরুই আমরা। হেঁটে হেঁটে ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ের সাথে পরিচিত করাতে থাকেন ফুয়াদ ভাই তার নতুন ব্যবসায়িক পার্টনারকে। আর মুখ হা করে সবকিছু গিলতে থাকেন ভদ্রলোক। আর একসময় হঠাৎ যেন বেশ বিষণœ হয়ে পড়েন। তার এই বিষণœতার কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারি না আমরা। এতে অস্থির হয়ে উঠি আমরা দুজনেই। ওনাকে বিষণœ হতে দেখলেই একধরনের অস্থিরতা পেয়ে বসে আমাদের।

‘ইনভেস্টমেন্টের আগে কোনভাবেই বিষণœ হতে দেয়া যাবে না ওকে।’ ফিসফিসিয়ে বলেন ফুয়াদ ভাই। ‘উৎফুল্ল রাখতে হবে। ইনভেস্টমেন্টের পর ও জাহান্নামে যাক, তাতে কিছু আসবে- যাবে না আমাদের। বরঞ্চ ওখানে গেলেই সুবিধা হবে আমাদের এখন,’ বলেই ঘোরেন উনি কেলাসটার দিকে। ‘কোন অসুবিধা হচ্ছে কি আপনার? পায়ে ব্যথা করছে? ক্যাচ নেব?’

‘তৃষ্ণা পেয়েছে কি?’ যোগ করি আমি, ‘একটা কোলা খান?’

‘কিংবা মিলক শেক?’ ঝঘঅকণ ভাবে বলেন ফুয়াদ ভাই।

‘না না’ গম্ভীর বিষণœ কণ্ঠ ওনার। ‘আমি সে ধরনের কিছু ভাবছি না। আমি ভাবছি আমাদের ব্যবসার শর্ত নিয়ে। মানে বলছিলাম যে, কোন মাজারে গিয়ে যদি প্রতিজ্ঞা করে আসতাম আমরা, আমাদের ফিফটি ফিফটি পার্টনারশিপের ব্যাপারটা।’

‘আরে মাজার কেন আবার এর মধ্যে? শুকনো হাসি হাসেন ফুয়াদ ভাই। মাজারের কথায় মুখ শুকিয়ে আসে যেন ওনার। ‘এ ব্যাপারে তো দলিল-ই থাকবে আমাদের।’

‘তবুও’ যুক্তি দাঁড় করাতে চান ভদ্রলোক। ‘ব্যবসা হচ্ছে সততার ব্যাপার। এখানে একটা প্রতিজ্ঞা টতিজ্ঞা জাতীয় কিছা থাকা উচিত। বিশেষ করে কোন মাজারকে সাক্ষী রেখে।’

ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন ফুয়াদ ভাই এ কথায়।

আধ্যাত্মিক রি-অ্যাকশনে আবার ওনার ভয় বেশ।

নিচুমুখে চিন্তা করেন কিছুক্ষণ। আর অতঃপর বলেন, ‘ঠিক আছে, তাই-ই সই। আমরা তিন নেতার মাজারে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করে আসি চলুন।’ পীরের মাজার এড়িয়ে যান ফুয়াদ ভাই। আধ্যাত্মিক মাজার এড়িয়ে ব্যাপারটিকে রাজনৈতিক মাজারের দিকে ঠেলে দেন। এতে রিস্ক কম হবে বোধহয় ওনার। তার মানে দুরভিসন্ধিটা রয়েই গেছে ওনার মধ্যে।

তিনজনে এগোই তিন নেতার মাজারের দিকে। মাজারে গিয়ে প্রতিজ্ঞা সারেন দু’পার্টনার। তিন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দু’জনে উচ্চে:স্বরে একথা ঘোষণা দেন যে-তারা তাদের লাভের আধাআধি শেয়ার করবে সবসময়। আমি জীবিত সাক্ষী হয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিরবে শ্রবণ করি ওনাদের প্রমিজিং চিৎকার। আর অতঃপর বেরিয়ে আসি তিনজন মাজার থেকে। তারপর তিনজনে মিলে অভিসার হলের ম্যাটিনি শোটা ধরি। অতঃপর রাতের খাবারটা সারি ঈৃৃুঋৗও-এর বুফে দিয়ে। ভদ্রলোক ফুয়াদ ভাইয়ের রুমেই উঠেছেন। তাই রাতে বিদায় নিয়ে চলে আসি আমি বাসায়।

৪.

পরদিন ভোর সাতটায় ফুয়াদ ভাইয়ের টেলিফোনে ঘুম ভাঙে আমার। টেলিফোনে উদভ্রান্তের মত চিৎকার করছেন উনি। ‘শিগগির আয় কল্লোল, শিগগির চলে আয়। সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার রে। সব নিয়ে গেছে বদমাশটা, সব নিয়ে চলে গেছে।’

‘অ্যাঁ?’ আঁতকে উঠি আমি। ‘বলো কি? সব চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেছে? ঐ কেলাসটা?’

‘সব নেয়নি। জিনিসপত্র কিছুই নেয়নি, কাঁদতে কাঁদতে বলেন উনি। ‘গতকাল আমি আমার ব্যাঙ্ক ঝেড়ে ঝুড়ে চল্লিশ হাজার টাকা তুলেছিলাম। এ টাকাটা তুলেছিলাম এ জন্যই যে, ও দেখুক- আমি অভাবী পার্টনার না। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা আমার পকেটেই থাকে সবসময়। রাতে কেবিনেটে টাকাগুলো রেখে ঘুমিয়েছি। সকালে উঠে দেখি বদমাশটা নেই। ভাবলাম বাথরুমে গেছে হয়ত। কিন্তু বাথরুমের দরজা হা করা। কেমন যেন সন্দেহ হল। উঠে কেবিনেটে উঁকি দিয়ে দেখি একটি টাকাও নেই। বাইরের দরজাটাও হা করা। আমার এখন কি হবে রে-; বলে হাঁক ছেড়ে কান্না জুড়ে দেন উনি।

‘সব্বোনাশ!’ বলি আমি। ‘ওয়েট, আসছি আমি।’

‘আয়, কিন্তু মামা-মামীকে জানানোর দরকার নেই এখন। মোনালিসাও যাতে না জানে দেখিস। তটস্থ শোনায় ওনার কণ্ঠস্বরটা।

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ সান্ত¡না দেই ওনাকে। আর অতঃপর কোনভাবে হাতমুখ ধুয়ে রওনা দেই কপর্দকহীন ফুয়াদ ভাইয়ের বাসাভিমুখে।

৫.

সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় মাসখানেক। হঠাৎ কুরিয়ার সার্ভিসের লোক একটা ছোট্ট প্যাকেট নিয়ে আসে ফুয়াদ ভাইয়ের নামে।

প্যাকেটের ভেতর পঁচিশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড আর ছোট্ট একটি চিঠি। আশ্চর্য হয়ে চিঠিটি পড়তে থাকি আমি। চিঠিটা এরকম।

ফুয়াদ ভাই,

সালাম নিবেন। মাজারের ফিফটি ফিফটি শর্তটা পূরণ করতেই পঁচিশ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড পাঠালাম। কেননা, আমার লাভ হয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকা। আপনি আমাকে মাজারে নিয়ে গিয়ে বিপদেই ফেলেছেন। কেননা আপনি এমন এক মাজারে নিয়ে গেছেন আমাকে যেখানে আমার এক প্রিয় নেতাও শায়িত শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ওনাকে শ্রদ্ধা করেই শর্তটা পূরণ করলাম। ওনার জন্যই আমাকে ফেরত দিতে হল টাকাটা। উনি আমার প্রিয় নেতা এ জন্যই যে উনি যৌবনে ঘুসি মেরে নারিকেল ছিলতে পারতেন- আর নারিকেল হচ্ছে আমার প্রিয় ফ্রুট। দোয়া করবেন।

গুড বাই।

ইতি

আপনার একান্ত বিশ্বস্ত

কাজী দাউদ ইব্রাহীম

পালিকা বাজার, কোলকাতা।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to অর্ধভাগীর ভাগাভাগি (রম্য): শায়ের খান

  1. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ সেপ্টেম্বর 11, 2011 at 6:24 অপরাহ্ন

    চমৎকার লিখেছেন বস।

  2. touhidullah82@gmail.com'
    তৌহিদ উল্লাহ শাকিল সেপ্টেম্বর 14, 2011 at 3:16 পূর্বাহ্ন

    বেশ বেশ । দারুন লিখেছেন ভাইয়া ।

  3. রাজন্য রুহানি সেপ্টেম্বর 15, 2011 at 7:45 পূর্বাহ্ন

    আলামপনা দেখি রম্যও জানেন! বহুত খুব!

You must be logged in to post a comment Login