রিপন ঘোষ

ভার্চুয়াল জীবন (১ম পর্ব)

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর বালিশে হেলান দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে ব্ল্যাক কফির মগে চুমুক দিতে দিতে নেট ইউজ করাটা রক্তিমের একটা বিশেষ শখ। অফিস চলাকালীন সময়ে ইন্টারনেট ইউজ করা হলেও ফেসবুকে সময় দেয়া যায়না। তাই রাতের এই সময়টায় সে মূলত ফেসবুকেই সময় দেয় বেশী। ফেসবুকের পাতা ব্রাউজিং করতে করতে রাহাতের স্ট্যাটাসে তার চোখ আটকে যায়। রাহাত এবং তার কিছু বন্ধুরা মিলে ওই স্ট্যাটাসে জমজমাট আড্ডা দিচ্ছে। মাত্র ৩০ মিনিটে কমেন্টের সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়ে গেছে। রক্তিম সবগুলো কমেন্ট মন দিয়ে পড়লো। যুথি নামের একটি মেয়ে আড্ডা বেশ জমিয়ে তুলেছে। কমেন্টগুলো দেখে রক্তিমের বেশ মজা লাগছিলো। সেও একটা কমেন্ট ছুড়ে দিলো, কি রে তোরা কি করছিস?

রাহাত রাগের ইমো দিয়ে বলে, গরুর ঘাস কাটছি! আজকাল চোখেও কম দেখছিস নাকি? রাহাতের কমেন্টের উত্তর দেয়ার আগেই যুথি নামের মেয়েটা রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে লিখে, রাহাত ভাই তোমার বন্ধুর চোখের লেন্স চেঞ্জ করতে হবে। তারপর চললো কমেন্টের মাধ্যমে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া। যুথি নামের মেয়েটার কথার তোড়ে রক্তিম প্রায়ই কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলো। একসময় যুথি বলে, বন্ধুরা যাচ্ছি। অনেক ঘুম পেয়েছে। রক্তিম চাচ্ছিলো যুথি আরো কিছুক্ষণ থাকুক। ওর সাথে কথা বলতে বেশ মজা লাগছে। কিন্তু উত্তর দেয়ার সুযোগ না দিয়েই যুথি অফলাইন হলো।

রক্তিম তারপরও বেশ খানিকক্ষণ কমেন্টগুলোয় চোখ বুলালো। যুথির কমেন্টগুলো বেশ ঝরঝরে, প্রানোচ্ছ্বল। সে অবচেতন মনেই যুথির নামে ক্লিক করলো। প্রোফাইলে অনেক সুন্দর একটি প্রজাপতির ছবি দেয়া। ইনফোতে বিশেষ কিছু লেখা নেই। ছবিটি দেখেই যে কারো রিকুয়েস্ট পাঠাতে ইচ্ছে হবে। রিকুয়েস্ট পাঠাবে কি পাঠাবে না, ভাবতে ভাবতে সে শেষ পর্যন্ত ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েই দিলো।

আড্ডা দিতে গিয়ে অনেক সময় চলে গেছে সে টেরও পায়নি। ঘড়ির দিকে তাঁকাতে দেখলো রাত ১.৩০ বাজে। অন্যদিন ১২.৩০ এর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে, নাহলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরী হয়ে যায়। আর দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা মানে অফিসে যেতে দেরী হওয়া।

রক্তিম ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে তাকাতে দেখলো নীলা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় নীলাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। ছাব্বিশ বছরের নীলার বয়স যেন বছর পাঁচেক কমে গেছে। ঘুমের ঘোরে গোলাপী রঙের শাড়িটা হাটু পর্যন্ত উঠে গেছে। নীলচে আলোর স্নিগ্ধ প্রতিপ্রভা বিচ্ছুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ওর সমস্ত মুখাবয়বে। আলো-ছায়ার খেলা নীলার দুধে-আলতা মাখানো ফর্সা মুখমন্ডলে সৌন্দর্য্যের প্রলেপ আরেকটু এঁকে দিচ্ছে। ঠোটের পাতা একটু ফাঁক হয়ে রয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে সে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস না ছেড়ে ঠোটের ফাঁকা স্থান দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। নীলার এমন মায়াবী রূপ দেখে রক্তিমের ভীষন ভালো লাগে, ইচ্ছে করে নীলার কোমল ওষ্টে আলতো করে একটা চুমু এঁকে দেয়। কিন্তু এই মাঝরাতে ওর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে ভীষণ রাগ করবে। সে চায়না তার সোনা বৌ তার ওপর রাগ করুক। সে নিজেকে সংযত করে পাশ ফিরে শোয়।

পরদিন বেশ দেরীতে নীলার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে রক্তিমের। তাড়াহুড়ো করে নাস্তা সেরে অফিসে রওয়ানা দেয়। যাওয়ার আগে দরজার কপাট আড়াল করে নীলার স্নিগ্ধ ঠোটে একটা চুমু এঁকে দেয়। রক্তিম চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত নীলা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।

অফিসের প্রবেশ পথে করিডোরে এম.ডি সাহেবের সাথে দেখা। করমর্দনের জন্য রক্তিমের দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে সহাস্যে বললেন, কি ব্যাপার রক্তিম সাহেব, আজ এতো দেরী যে?

রক্তিম লজ্জ্বাবনত মুখে বলে, না স্যার, ঘুম থেকে সময়মতো উঠতে পারিনি তাই একটু লেট হয়ে গেছে।

এম.ডি ফারুক সাহেব মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, ইটস ওকে, প্রতিদিনই সময়মতো আসেন, একদিন দেরী হলে বিব্রতবোধ করার কোন কারণ নেই। আপনার টেবিলে গিয়ে মুবিন ব্রাদার্সের ফাইলটা আমার রুমে পাঠিয়ে দিবেন তো। বলেই করিডোরের দক্ষিণ কোণে নিজের রুমে প্রবেশ করলেন এমডি।

রক্তিম কিছুটা চাপমুক্ত হয়ে নিজের রুমে প্রবেশ করে। মুবিন ব্রাদার্সের  ফাইলটা আরেকবার চেক করে বেয়ারাকে দিয়ে এম.ডির রুমে পাঠিয়ে দিলো। আর বেয়ারাকে বলে দিলো, আসার সময় যেন এক কাপ লীকার চা নিয়ে আসে। অফিসে আজ আর বিশেষ কোন কাজ নেই। ল্যাপটপ খুলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলো। ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় চোখ বুলাতেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অধিকাংশ শেয়ারের সূচক উঠতির দিকে। তার কেনা বেশ কিছু শেয়ারের দাম অনেকদিন থেকেই পড়তির দিকে ছিলো। আজ সে শেয়ারগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। দুপুরের মধ্যেই শেয়ারগুলোর দাম একটা ভালো পর্যায়ে পৌছবে আশা করা যায়।

সে খুশী মনে আরেকটা ট্যাবে ফেসবুক ওপেন করে। পেইজ ওপেন হতেই দেখলো ৭টা নোটিফিকেশন। এর মধ্যে একটা নোটিফিকেশন যুথি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে। পেজের বামদিকে নিচে তাকাতেই দেখলো ১৩ জন বন্ধু অনলাইনে। সে মনে মনে ভাবে, এইগুলার কি কোন কাজ নেই! সারাদিন ফেসবুকে বসে থাকে!

হঠাৎ যুথির প্রোফাইলের প্রজাপতির ছবি তার চোখে পড়লো, মানে যুথিও অনলাইনে। সে যুথির নামের উপর ক্লিক করতেই চ্যাটের ছোট পেইজটা খু্লে গেল। সে লিখলো, হাই যুথি!!!

অনেকক্ষণ চলে যাওয়ার পরেও যুথি কোন রিপ্লাই দিলোনা। রক্তিম আবার লিখলো, কি অবস্থা, বেশী বিজি নাকি?

এবার প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লে আসলো, না ভাইয়া, আসলে আমি গুগলে ইলেক্ট্রো ডায়নামিকসের একটা থিওরি সার্চ করছিলাম, তাই এদিকে খেয়াল করিনি।

রক্তিম রিপ্লাই দেয়,

– হুম তাই বলো, তারপর কেমন আছো তুমি?

– আমি ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?

-হ্যাঁ আমিও ভালো আছি। আচ্ছা আমি তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করায় রাগ করোনি তো?

-না ভাইয়া রাগ করার কি আছে :)

-যাক নিশ্চিন্ত হলাম। তারপর তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?

-আপনাদের দোয়ায় ভালোই চলছে।

-ভালো হলেই ভালো :) তা তুমি কিসে পড়াশোনা করছো?

-আমি কম্পিউটার সায়েন্স ১ম বর্ষে পড়ছি।

-ওয়াও গ্রেট! আমিও সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম। গণিতে অনার্স কমপ্লিট করার পর এমবিএ করে এখন কর্পোরেট চাকরে পরিণত হয়েছি।

-ভাইয়া আপনার এডুকেশনাল এন্ড জব ব্যাকগ্রাঊন্ড তো দারুন!

-হুম, তা তুমি কোন ভার্সিটিতে পড়ছো?

-আমি সাস্টে পড়ছি।

– গ্রেট! একে তো সাস্ট, তার ওপর জাফর ইকবাল স্যারের ডিপার্টমেন্টে পড়ছো! দারুন!

-ঠিক বলেছেন জাফর স্যারের ডিপার্টমেন্টে পড়ে আমি নিজেও গর্বিত :)

-জাফর ইকবাল স্যারের একবার দেখা পেলেই ধন্য হয়ে যাই। আর তুমি সরাসরি উনার ছাত্রী! স্যার কি নিয়মিত ক্লাস নেন?

-হ্যা উনি উনার প্রায় প্রতিটা ক্লাসেই আসেন। বৃষ্টির দিনে কারেন্ট চলে গেলেও স্যার মোমবাতি দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা নেন।

-হুম জাফর ইকবাল স্যার সত্যিই এক অন্যরকম ব্যক্তিত্ত্ব। উনাকে দেখলেই অনুপ্রাণিত বোধ করি।

-হুম, ভাইয়া আপনি কি স্যারকে কখনো সরাসরি দেখেছেন?

-কত্তোবার দেখেছি। প্রথমবার দেখেছিলাম একুশে বইমেলায়। সাদা-কালো ধুসর চুলের এই মানুষটাকে দেখলেই আমার মাথা শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যায়।

তারপর অনেকক্ষণ ধরে চললো তাদের চ্যাট। হঠাৎ করেই যুথি ডিসকানেক্ট হয়ে গেলো। রক্তিমও ফেসবুক থেকে লগআউট করলো

দুপুর ২টার দিকে ডিএসই’র ওয়েবসাইটে ঢুকেই রক্তিমের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। তার কেনা শেয়ারগুলোর দর স্মরণকালের মধ্যে সর্বোচ্চসীমায় উঠেছে। এখনি বিক্রি করে দিতে পারলে পুরো ৪৫০০০ টাকা প্রফিট। সে ব্রোকার হাউজ এ ফোন লাগালো, কিন্তু ফোন এনগেজ মারছে। রক্তিম বেশ বিরক্ত হলো। কয়েকবার চেষ্টার পর লাইন পেয়ে গেলো। ব্রোকার হাউজে বলে দিলো তার লটগুলো যেন চলতি দরে বিক্রি করে দেয়া হয়।

রক্তিমের বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেলো। এই শেয়ারগুলো নিয়ে সে অনেকদিন থেকেই চিন্তিত ছিলো। অনেকদিন থেকেই লসে ছিলো, কিছুতেই দাম বাড়ছিলনা। আজ যখন বাড়লো, এক লাফে এতো লাভ! সে তার ভাগ্যকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলোনা।

********************************

বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ফ্রেস হয়ে সোফাতে গা এলিয়ে দিয়ে বসতেই নীলা চা আর চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে পাশে এসে বসলো। রক্তিম দুপুরে অফিসের কেন্টিনে খেয়ে নেয় তাই বাসায় ফিরে ভাত খায়না। স্যান্ডউইচ খেতে খেতে রক্তিম আড়চোখে নীলাকে দেখে। সাধারণ সাজে নীলাকে অসাধারণ দেখাচ্ছে। সে নীলার একটা হাত ধরে বলে, আজ তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। নীলা লাজুক হাসি দিয়ে হাত সরিয়ে নিতে চায়। রক্তিম নীলাকে আরো ঘনিষ্ট করে কাছে টেনে আনে। নীলা মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে রক্তিমের বাহুর বাঁধন আলগা করতে চায় কিন্তু পারেনা।

রক্তিম নীলাকে বলে, আজ আমার অনেক খুশির দিন। অনেকদিনের চাপানো পাথর আজ বুক থেকে নেমে গেছে।

নীলা আদুরে সুরে বলে, কেন, এতো খুশি কেনো?

রক্তিম নীলাকে বাধন থেকে কিছুটা আলগা করে দিয়ে বলে, আমার আটকে থাকা শেয়ারগুলো আজ ভালো দামে বিক্রি করে দিয়েছি। মোটা অংকের প্রফিট এসেছে। আগামীকালকেই ব্যাংকে টাকা জমা পড়বে।

নীলা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, যাক তাহলে একটা সুরাহা হলো শেয়ারগুলোর। আমিও ভীষন চিন্তিত ছিলাম ওগুলো নিয়ে।

রক্তিম চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলে, এই আনন্দে আমি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই। কি চাও বলো?

নীলা বলে, টাকাগুলো নষ্ট করার কোন দরকার নেই। আমার শ্রেষ্ট উপহার তুমি। তুমি সবসময় সাথে থাকলেই আমার আর কিছু চাইনা। বলেই নীলার দুচোখ জলে ভিজে ওঠে।

নীলার ভালোবাসার এমন বহিঃপ্রকাশে রক্তিম আশ্চর্য্য হয়ে যায়। এমন লক্ষী স্ত্রী কয়জনের ভাগ্যে জুটে। তারা ভালোবাসার আবেশে এই সন্ধ্যারাতে একে-অপরের সাথে মিশে যায় মধুর আলিঙ্গনে। আর মেঘমুক্ত আকাশে বৈশাখী পূর্ণিমার বাঁধভাঙ্গা আলো জানালার ফাঁক গলে আচড়ে পড়ে পুরো অন্ধকার ড্রয়িংরুমে।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


10 Responses to ভার্চুয়াল জীবন (১ম পর্ব)

  1. মাহবুব আলী সেপ্টেম্বর 25, 2011 at 12:22 অপরাহ্ন

    ‘সে মনে মনে ভাবে, এইগুলার কি কোন কাজ নেই! সারাদিন ফেসবুকে বসে থাকে!’
    এই প্রশ্ন আমারও। গল্পটা চলূক। অন্য ব্লগেও দেখলাম মনে হচ্ছে।

  2. nely_paul@yahoo.com'
    নেলী পাল সেপ্টেম্বর 25, 2011 at 4:54 অপরাহ্ন

    আমরা এই ভার্চুয়াল জীবনেই প্রতিনিয়ত অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। ভাল লাগল খুব

  3. tareq_2011@yahoo.com'
    তারেক আহমেদ সেপ্টেম্বর 25, 2011 at 5:16 অপরাহ্ন

    :-bd

  4. bonhishikha2r@yahoo.com'
    বহ্নিশিখা সেপ্টেম্বর 26, 2011 at 7:53 পূর্বাহ্ন

    চলুক…

  5. রাজন্য রুহানি সেপ্টেম্বর 27, 2011 at 4:24 অপরাহ্ন

    বেশ লাগলো।
    :rose:

You must be logged in to post a comment Login