জুলিয়ান সিদ্দিকী

উপন্যাস: ছায়াম্লান দিন

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

কমলাপুর স্টেশনটি বলতে গেলে এখন প্রায় ফাঁকা। স্টেশনে যখন ট্রেন এসে থামে তখনই মুহূর্তের ভেতর কোত্থেকে যেন বিভিন্ন বয়সের যাত্রী নারী-পুরুষ ফেরিঅলা হকার আর ভিখেরী এসে ভীড় করে। যতক্ষণ ট্রেনটি থাকে ততক্ষণই যাবতীয় ব্যস্ততা। ট্রেন চলে গেলে ফের নিরব হয়ে পড়ে স্টেশনটি। তেমনি একটি সময়ে রাহুল এসে বসেছিলো স্টেশনের একটি ফাঁকা বেঞ্চে। অনেক্ষণ ধরেই চুপচাপ বসে থাকার কারণে অনেকেই হয়তো তাকে লক্ষ্য করে থাকবে। বিশেষ করে চানাচুর বাদাম আর চা-সিগ্রেটঅলারা কিছুক্ষণ পরপরই তার পাশ দিয়ে ঘুরে যাবার সময় একবার করে হাঁক দিয়ে যাচ্ছে। রাহুল বসেছিলো বেঞ্চে হেলান দিয়ে। পিঠের ওপর কেমন যেন ব্যথা ব্যথা করছিলো। দীর্ঘক্ষণ একঠায় বসে থাকলে অনেক রকম অসুবিধাই দেখা দেয়।

সে উঠে দাঁড়াতেই একজন মাঝ বয়সী লোক, কাঁচা-পাকা দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে এসে জিজ্ঞেস করে, কই যাইবেন?

কোথায় যাবে জানে না রাহুল। সে লোকটির দিকে তাকায়। হাঁটুর কাছাকাছি লুঙ্গিটা তুলে পরেছে লোকটা। গায়ে কোন আমলের একটি টি-শার্ট রঙ পরিবর্তন হতে হতে আসল রঙ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই। কিংবা প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে ভালো করে না ধোওয়ার কারণেও এমনটি হয়ে থাকতে পারে।

নির্বিকার ভাবে রাহুল তাকিয়ে থাকে লোকটির দিকে।

লোকটি তেমনি আবার মিনমিন করে জানতে চায়, কই যাইবেন?

রাহুলের ইচ্ছে হয় বলে, কোথাও না। কিংবা গন্তব্য জানা নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই তার সে ইচ্ছেটা চলে যায়। কোথাও যেতে হলে কোনো না কোনো বাহনের প্রয়োজন হবে। আর বাহন বাবদ তাকে কিছু টাকা দিতে হবে। কিন্তু কত টাকা দিতে হবে সেও জানে না। পকেটে সাকুল্যে আছে নয় টাকা। একটি পাঁচ টাকার নোট। একটি দোয়েল মার্কা দুটাকার নোট। এক টাকার দুটো কয়েন। সকালের দিকে আরো বেশি ছিলো। কিন্তু নাস্তা করার পর এ ক’টি টাকাই অবশিষ্ট আছে এখন।

বেলা বলতে গেলে এখন মাথার উপর গনগন করছে। এ অবস্থায় স্টেশনের বাইরে গেলেও ঘামে ভিজে চুপচুপ হয়ে যেতে হবে। আর যাবেই বা কোথায়। আজ এমন কোনো জায়গা তার অবশিষ্ট নেই যে সেখানে গিয়ে দুদণ্ড বসতে পারে। যাও একটি জায়গা ছিলো খিলগাঁয়ের কাছে তাও বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। গতকাল সন্ধ্যার দিকে কারা যেন মাসুমকে এলোপাথারি গুলি করে ফেলে দিয়েছে ক্রসিঙের ওপর। খবর পেয়ে সেও গিয়েছিলো। লোকজন মৃত মাসুমকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। নানা জনে নানা রকম মন্তব্য করছে। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা যে, মাসুম সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ গ্রুপের কোনো সদস্য ছিলো। এ না হলে এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু কেন হবে তার? কেনই বা সে খুন হয়ে খোলা আকাশের নিচে এমন একটি জায়গায় পড়ে থাকবে?

রাহুল তাকিয়ে ছিলো মাসুমের মুখের দিকে। চোখ দু’টো খোলা। যেন গুলি খাওয়ার আগ মুহূর্তে ভীষন অবাক হয়েছিলো। হয়তো বা খুনীদের সে চিনতে পেরেছিলো। আর চিনতে পেরেই যারপর নাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো। হয়তো তখনই তাকে গুলি করা হয়। একটি গুলি তার বাঁ চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকেছে হয়তো। বাঁ চোখের জায়গায় একটি রক্তাক্ত গর্ত দেখা যাচ্ছিলো। আরো কিছু গুলি হয়তো তার বুকে লেগেছে। যে কারণে বুকের দিকে হলুদ টি-শার্টটাতেও রক্তাক্ত ক্ষত দেখা যাচ্ছিলো।

সপ্তাহ খানেক কোথায় কোথায় ঘুরে যখন মেসে ফিরে এসেছিলো মাসুম তখনই কেমন চিন্তাক্লিষ্ট দেখা গিয়েছিলো তাকে। কথায় কথায় বলেছিলো আফগানিস্তানের কোথাও নাকি তার একটি চাকরির কথা চলছে। টাকা পয়সা তেমন লাগবে না। ভাগ্য ভালো হলে বিনা পয়সাতেই সে চলে যেতে পারবে। কিন্তু রাহুলের মন থেকে এ প্রশ্ন কিছুতেই দূর হচ্ছে না যে, এমন একটি ব্যস্ত জায়গায় মাসুম খুন হলো অথচ তার খুনীদের কেউ দেখেনি এটা কেমন করে সম্ভব? গল্প সিনেমাতে দেখা যায় বড়সড় বন্দুক দিয়ে অনেক দূরের কোনো উঁচু জায়গা থেকে নির্দিষ্ট কাউকে গুলি করে মারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে খুনীরা কি ভাবে কাজটা করলো? নাকি মধ্যরাতে যখন ফাঁকা হয়ে যায় তখনই তাকে খবর দিয়ে কিংবা সঙ্গে নিয়ে এসে কাজটা করেছে খুনীরা? তবুও তো দু’চারটি রিকশা, সিএনজি, পথচলতি দু’একজন মানুষ থাকেই। এখানকার রাস্তা কখনোই সুনসান নিরব হতে দেখা যায় না কখনো।

নাহ। এ নিয়ে আর ভাবতে চায় না রাহুল। তার সামনে যে অনিশ্চিত আর অন্ধকার জীবনের বিভিষীকা দেখতে পাচ্ছে তা থেকে যে করে হোক তাকে উত্তোরণের পথ খুঁজে বের করতেই হবে। কিন্তু কী করে? মাত্র ন’টাকা যার সম্বল! এত বড় আর ঘিঞ্জি ঢাকা শহরে কিছু একটা করে বাঁচতে হলে তাকে আগে মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই বের করতে হবে। স্টেশনের বেঞ্চে বসে বা ঘুমিয়ে কিংবা ফুটপাতে রাত কাটিয়ে আর যাই করা সম্ভব হোক না কেন, ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। আর ভালো কিছু না করতে পারলে নিজকে ভালোমত প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব। যারা বাবা-মায়ের অঢেল সম্পদের মাঝে বড় হয় তারা হয়তো তেমন কোনো স্বপ্ন না দেখলেও চললে চলতে পারে। কিন্তু ঘন্টা খানেক সময় পেরোলেই যাকে ক্ষুধার কাছে নতজানু হতে হবে তার তো স্বপ্ন না হোক আশা না থাকা অপরাধ। আশা ছাড়া চেষ্টাই বা কেমন করে সম্ভব? আর কিছুই সম্ভব না হলে তাকে ফিরে যেতে হবে গ্রামে। গ্রামে আর কিছু না হোক বাবা মায়ের কাছে তার একটি আশ্রয় জুটবে। আশ্রয় জুটলে দু’একবেলা কিছুটা খাবারও জুটবে।

তাকে কিছু একটা নিয়ে ভাবতে দেখে লোকটি বললো, খারাপ মনে না করলে, আপনের সমস্যাডা কি জানতে পারি?

রাহুল চমকে উঠে ফের লোকটির মুখের দিকে তাকায়। বলে, নাহ, সমস্যা নয়! এমনিই ভাবছিলাম।

লোকটি কেমন করে যেন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো রাহুলের মুখের দিকে। রাহুল অন্য দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলে লোকটি হয়তো নিজের কাজেই ফিরে যায়।

সপ্তাহ খানেক আগে সে বাসাবোর কাছে একটি গার্মন্টস ফ্যাক্টরিতে ইন্টারভিউ দিয়েছিলো। কিন্তু ইন্টারভিউর নামে তাকে রাজ্যের হাবিজাবি জিজ্ঞেস করা হলে সে ধরেই নিয়েছিলো যে, চাকরিটা তার হবে না। যদিও তাকে আজ লাঞ্চের পর দেখা করতে বলা হয়েছিলো। সেখানে সে যাবে কি যাবে না তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলো। তারওপর মাসুমের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা জানলে বা ঢাকা শহরে তার তেমন কোনো আত্মীয় আছে কিনা জানতে পারলে সে খবরটা দিতে পারতো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাসুমের ব্যক্তিগত বিষয়ে বলতে গেলে তেমন কিছুই জানে না সে। তবে একবার কথায় কথায় সে জানতে পেরেছিলো হেমায়েতপুরের কাতলাপুর গ্রামে তার এক বোন থাকে। জয়নাল হাজীর মুরগির খামারে কাজ করে। এটুকু সংবাদ কি একজন মানুষের ঠিকানা বের করতে যথেষ্ট? এখান থেকে সে যদি হেমায়েতপুর যেতে চায় তাহলে তার পুরো টাকাটাই চলে যাবে গাবতলী যেতে যেতেই। বাকি পথ যাওয়া এবং ফিরে আসা, তার ওপর রাতের খাওয়া সবই অনিশ্চিত। ক্ষুধা পেটে দু’একদিন হয়তো থাকা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘ পথ হাঁটা হয়তো সম্ভব নয়। অন্তত রাহুল পারবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই আসন্ন অনিশ্চয়তার কারণে তার হাত পা বলতে গেলে অবসন্ন হয়ে আসতে চাচ্ছে।

পকেটে যতক্ষন ন’টি টাকা রয়েছে ততক্ষণের জন্য সে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত। কাজেই টাকাগুলো ফুরিয়ে যাবার আগেই সে বাসাবোর ময়ূরী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে পৌঁছে যেতে চায়। তখনই একটি অনির্ধারিত লোকাল ট্রেন এসে স্টেশনে থামে। লোকজন তেমন একটা ওঠা নামা করে না। ফেরিঅলা হকারদেরও তেমন ব্যস্ততা দেখা যায় না।

মিনিট দশেকের মত ট্রেনটি স্থির থাকে। তারপরই হুশহাস শব্দে আবার চলতে আরম্ভ করলে রাহুল রেল লাইন পেরিয়ে ফ্লাইওভারে গিয়ে ওঠে। এখানেও পথের দু’পাশে অনেকে অনেক ধরনের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। বেলোয়ারি জিনিসের সঙ্গে সঙ্গে কিছু শাক-শব্জি লেবু-টমেটো এমন কি গোলআলু থেকে আরম্ভ করে কাপড়-চোপড় ও সস্তার জুতো-স্যান্ডেলও দেখতে পেলো। এদিকে বার কয়েক এলেও সে ওভার ব্রিজে কখনো ওঠেনি। প্রয়োজন পড়েনি। তাই তার জানা হয়নি যে, ঢাকা শহরের প্রতিটি ইঞ্চিই ব্যবসায়ীদের জন্য উপযুক্ত জায়গা।

ওভারব্রীজ থেকে নেমে সে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ময়ূরী গার্মেন্টস এর সামনে এসে দাঁড়ালে কয়েকজন গার্মেন্টস কর্মীর সঙ্গে দেখা হয়। তাদের কাছেই সে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে এখানকার জিএম শরিফ সাহেব খুবই ভালো মানুষ। যদিও কিছুটা রাগী, কিন্তু কাজের মানুষদের সত্যিই সম্মান করতে জানেন। লাঞ্চ আওয়ার শেষ হতে কিছুটা সময় বাকী ছিলো বলে কেউ কেউ বাইরেই সময়টা কাটিয়ে দেবার মনস্থ করেছে হয়তো। এদের মধ্য থেকে লম্বা গড়নের একজন হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, আমি ফরহাদ। তিন নাম্বার ফ্লোরের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। আপনি কী কাজে এখানে আসছেন?

আমি রাহুল। একটি ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম।

ফরহাদ বললো, আপনার নামের সঙ্গে আর কিছু নেই? কি করে বুঝবো আপনার ধর্ম কি?

রাহুল হেসে উঠে বললো, কারো ধর্মটা কি খুব বেশি জরুরি?

কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। যেমন ঈদের সময় ভিন্ন ধর্মের হলে সে মুসলিমদের মত ছুটির সুবিধা পাবে না। কখনো ঈদ বোনাসও পাবে না। এমনি আরো ছোটখাট নানা ব্যাপার আছে।

সেটা সময় হলেই দেখা যাবে। কিন্তু আমার নামের আগে-পিছে আর কিছুই নেই।

যদিও নামটা শুনে মনে হইতেছে আপনি মুসলমান না।

রাহুল হেসে বললো, আমার বাবা-মা কিন্তু মুসলমান। ছোটবেলা যেহেতু আমার খৎনা হয়েছে, নামাজ-কালাম শিখেছি, সে অর্থে আমি একজন মুসলমানই হওয়ার কথা। কিন্তু সত্যি কথা যদি জানতে চান তাহলে বলবো, ধর্ম নিয়ে আমার কোনো ভাবনা চিন্তা নেই। প্রথমত একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে হবে। তারপর আরো অনেক ধরনের সামাজিকতা মানার পর আসবে ধর্মের ব্যাপার। জীবনে ধর্মটা প্রধান হয়ে উঠলে সেটা আর জীবন থাকে বলে মনে করি না।

ফরহাদ চোখ সরু করে তাকিয়ে বললো, আপনে নাস্তিক নাকি?

তাও না।

ফরহাদ হেসে বললো, আমিও রোজা-নামাজ করি না। তাই অন্যের ব্যাপারেও জোর দিয়ে বলাটা আমার সাজে না। চলেন, জি এমের সঙ্গে দেখা করবেন। মনে হয় চাকরিটা আপনার হয়ে যাবে। যদি আপনাকে আমার ফ্লোরে দেয় তাহলে আপনার কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। আপনেরে আমার পছন্দ হইছে।

জি এমের রুমে ঢুকতেই রাহুলকে অবাক করে দিয়ে শরিফ সাহেব বলে উঠলেন, রাহুল দেব বর্মন?

জি না।

তারপর সে হেসে বললো, আমি রাহুল।

বসেন।

জিওগ্রাফি নিয়ে পড়াশুনা করে এখানে কেন অ্যাপ্লাই করলেন? দেশে স্কুল-কলেজ তো অনেক আছে!

একটা মাস্টারি জুটাতে পারলেন না!

রাহুল শরিফ সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে চেয়ারে বসে বললো, জিওগ্রাফি নিয়ে পড়েছি সত্যি, কিন্তু তা কাজে লাগানোর মত ক্ষেত্র এদেশে তেমন নেই। আর বিদেশের কথা যদি বলেন, তাহলে বলতে হবে আমার সে সামর্থ নেই।

স্কুল কলেজে মাস্টারি করতে পারতেন। আচ্ছা যাক, লেখাপড়া কিভাবে করলেন তাহলে?

কষ্টে-সৃষ্টে করেছি। বাবা মা চাইলেন উচ্চ শিক্ষিত হই। তাই।

তার মানে আপনার তেমন একটা ইচ্ছে ছিলো না বলতে চান?

ঠিক তাই। কোনো বিষয়ে ডিপ্লোমা করতে পারলে আরো অনেক আগেই চাকরি পেয়ে যেতাম।

এতদিন কি করেছেন?

কিছুই না। দু একটা টিউশানি করেছি। বন্ধুর সঙ্গে মেসে থাকতাম।

এখন কোথায় আছেন? মানে আমাদের এখান থেকে আপনার থাকার জায়গা কত দূর?

গতকাল থেকে আমার থাকার কোনো জায়গা নেই।

এই না বললেন, বন্ধুর সঙ্গে থাকতেন?

কাল রাতে কারা যেন তাকে মেরে ফেলেছে।

ভ্যারি স্যাড! তাহলে রাত কাটালেন কোথায়?

কমলাপুর স্টেশনে।

তাহলে চাকরি করবেন কিভাবে? থাকার জায়গা না থাকলে ঘুম-খাওয়া-বিশ্রাম সবই গোলমেলে হয়ে যাবে। দেখে তো মনে হচ্ছে দুপুরে কিছু খাননি।

ইচ্ছে করেই খাইনি।

কেন?

সঙ্গে খুব সামান্য টাকা আছে। ভেবেছি এখান থেকে আমাকে হেমায়েতপুর যেতে হবে। বন্ধুর বোনকে সংবাদটা দিতে হবে।

শরিফ সাহেব কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন রাহুলের মুখের দিকে।

তারপর তেমনি অবাক কন্ঠে বললেন, মৃত বন্ধুর বোনকে খবর জানিয়ে আপনার কি হবে? খাবার আর থাকার জায়গা জুটবে?

এ মুহূর্তে শরিফ সাহেবকে বড় স্বার্থপর বলে মনে হয় রাহুলের। বলে, এতদিন তার সঙ্গে এক বেডে থেকেছি। তার খারাপ কিছু হলে আমার তো কম বেশি খারাপ লাগার কথা। তা ছাড়া কৃতজ্ঞতা বোধ কিংবা সহমর্মীতা বোধ থেকেই খবরটা জানানো আমার দায়িত্ব বলে মনে করি।

আপনি কি নিজকে দায়িত্বশীল বলে মনে করেন?

জি।

শরিফ সাহেবের মুখটা কেমন হাসি হাসি হয়ে উঠলো। তিনি কিছুক্ষণ চেয়ারে বসে দুলতে দুলতে কিছু নিয়ে ভাবলেন হয়তো।

তারপর তার সিভিটা টেবিলের উপর থেকে তুলে নিয়ে বললেন, আপনার আসার কথা ছিলো লাঞ্চের পর। লাঞ্চ টাইম এখনো শেষ হয়নি। তা ছাড়া কেউ নিজের কোনো ব্যাপার সম্পর্কে বলতে জোর দিয়ে বলে। আপনি তা করেননি। যেমন অন্য কেউ হলে নিজকে দায়িত্বশীল বোঝাতে বলতো অবশ্যই। কিন্তু আপনি মাত্র জি বলেছেন। এ ক্ষেত্রে আপনার কি বলার আছে?

আমার বলার বেশি কিছু নেই। লাঞ্চের সময় শেষ হয়নি সত্যি। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা আগাম প্রস্তুতি থাকা ভালো। আর নিজকে দায়িত্বশীল মনে করি না। এমনিতেই আমি দায়িত্বশীল। কাজেই ব্যাপারটা জোর দিয়ে বললেও কোনো হেরফের হতো না।

হুম!

আমরা যে বেতন দেবো তাতে হয়তো আপনার একার চলবে।

অ্যপ্রেন্টিস হিসেবে তাই হয়তো যথেষ্ট। কাজ শিখে গেলে আপনাদের চোখে কি ব্যাপারটা পড়বে না? তখন হয়তো বেতনের অঙ্কটা নিয়েও আপনারা ভাববেন।

ভালো বলেছেন। আত্মবিশ্বাস খুব ভালো জিনিস। আমাদের এ ফ্যাক্টরিতে একজন প্রোডাকশন ম্যানেজার আছে। খায়রুদ্দিন। প্রথমে সে হেলপার হয়ে ঢুকেছে। আস্তে আস্তে সে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হয়ে গিয়েছিলো। সে হেলপার থাকা অবস্থায় কি একটা নিয়ে আরেক প্রোডাকশন ম্যানেজার জাহিদ তাকে মেরেছিলো। খায়রুদ্দিন পাল্টা মারামারি না করে বলেছিলো, একদিন সেও প্রোডাকশন ম্যানেজার হবে। তখন সে দেখিয়ে দেবে অধস্তন কর্মীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়। এখন সে সত্যিই একজন প্রোডাকশন ম্যানেজার। আপনি কি জি এম হতে পারবেন?

রাহুল হেসে বললো, কিছু মনে না করলে উত্তরটা দিতে পারি।

শরিফ সাহেবও হেসে উঠে বললেন, আচ্ছা বলেন, কিছু মনে করবো না।

আপনি যতদিন জি এম হিসেবে আছেন ততদিন কোনো সম্ভাবনা নেই। কাজেই সে ভাবনাটা আমার মাথায় নেইও।

আপনাকে দিয়েই হবে। শরিফ সাহেব খুশি হয়ে উঠলেন। তো কাজ করতে চান কবে থেকে?

আগামী দিন থেকে।

আজ থেকে নয় কেন?

শুরুর দিকে বলেছি হেমায়েতপুর যেতে হবে। খবরটা দিয়েই চলে আসতে পারবো না। মাসুমের বোনটিকে হয়তো সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হবে। তারপর থানা-পুলিশ-হাসপাতালের ঝামেলা মিটিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব ডেডবডি তার গ্রামের বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।

শরিফ সাহেব কিছুটা চিন্তিতভাবে বললেন, আজকের ভেতরই বা রাতে রাতে কিছুই করতে পারবেন না হয়তো। তার চেয়ে ভালো আপনি শনিবার থেকে কাজ আরম্ভ করবেন। এর আগে আপনার যত ঝামেলা আছে শেষ করে আসেন। পারলে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে সংবাদটা জানিয়ে আসেন।

আমার কাছে মাত্র ন’টি টাকা আছে। এতে এত কিছু সম্ভব হবে না।

আমি আপনাকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিচ্ছি। পরে আস্তে ধীরে শোধ করে দেবেন। আর এ ক’দিনে আশা করি আশে-পাশে কোথাও থাকার জায়গার ব্যবস্থাও করে নিতে পারবেন।

তারপর তিনি ড্রয়ার খুলে টাকা বের করে রাহুলের হাতে দিয়ে বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে কোনো হোটেলে ঢুকে খেয়ে নেবেন। তারপর যেখানে যেতে চান যান।

রাহুল টাকাটা হাতে নিয়ে শরিফ সাহেবকে একবার ধন্যবাদ জানালেও মনে মনে যারপর নাই কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলো। এমন একটি অভাবনীয় ব্যাপারের জন্য সে তৈরী ছিলো না মোটেও।

ময়ূরী গার্মেন্টস থেকে বেরিয়ে রাহুল একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে ভাত খায়। আগুনে ক্ষুধার ভেতর ভরপেট খাওয়া ঠিক হবে না। তাই সে এক প্লেট ভাতই খায়। যদিও তার ইচ্ছে হচ্ছিলো আরো খেতে তবুও সে আধাপেট খেয়েই উঠে পড়ে। এখন তার কেবলই অনিশ্চিত ছোটাছুটি। একটি রিকশা নিয়ে সে খিলগাঁও থানায় আসে। এর আগে তাকে কখনো কোনো থানায় যেতে হয়নি। তাই কোনখান থেকে শুরু করতে হবে ভেবে পাচ্ছিলো না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এর ওর মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে সে ঠিক করে এখানকার কোনো পুলিশ কর্মচারিকে জিজ্ঞেস করলেই হয়তো ব্যাপারটা জানা যাবে। তাই সে অফিসের ভেতর ঢুকে সামনে পুলিশের পোশাক পরা যে লোকটিকে পেলো তাকেই বললো, গতকাল সন্ধ্যার দিকে খিলগাঁ রেল-ক্রসিঙের কাছে যে ছেলেটি মারা গেছে তাকে আমি চিনি। কিছু দিন একই মেসে এক সঙ্গে থেকেছি।

পুলিশ লোকটি খেকিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই। আপনেই কাজটা করান নাই তো? টাকা খাওয়াইয়া আজকাল ভাই ভাইয়েরে খুন করায়। শ্বশুর জামাইরে ভাড়া করা মানুষ দিয়া ব্রাশ ফায়ার কইরা মারে। আর এ তো কয়দিনের বন্ধু। কাইল কোই আছিলি? অ্যামনে করস কি?

মুহূর্তেই যেন লোকটি স্বর্গ থেকে নরকে নেমে এলো। যে করণে তার ভাষা আর আচরণও বদলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। বুকের ওপর নেম প্লেটে লেখা আছে আব্দুল জব্বর।

রাহুল বললো, এমনিতে বেকার। মাসখানেক হয় মাসুমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো। সেও বেকার ছিলো। মেসে থেকে চাকরির চেষ্টা করছিলো।

আর কি জানস তার ব্যাপারে? সে যে গাঞ্জা-চরস বেচতো জানস?

রাহুল যারপর নাই অবাক হয়ে বললো, গাঁজা-চরস?

শুইনা আসমান থাইকা পড়লি মনে হয়? তুই যে এর লগে নাই কেমনে বুঝি? বিচি ধইরা চিপি মারলে ঠিকই কথা বাইর হইবো।

আমি সত্যিই এত কিছু জানি না। রাতের বেলা তার সঙ্গে ঘুমোতাম কেবল।

অহন ভিজা বিলাই সাজছস? কাইল সারাদিন কোই কোই আছিলি ফিরিস্তি দে!

লোকটির এমন ছোটলোকের মত আচরণের হেতু বুঝতে পারছিলো না রাহুল। নাকি পুলিশদের আচরণই এমন অভব্য? তাহলে শিক্ষিত লোকদের কেন পুলিশে চাকরি দেয়া হয়?

কিছুক্ষণ পরই তাকে একটি আলাদা রুমে নিয়ে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সে পাবলিক লাইব্রেরিতে ছিলো। কিন্তু লোকটি তার কথা বিশ্বাস করতে চায় না।

সে বলেছিলো লাইব্রেরিতে খোঁজ নিলেই সত্যিটা জানা যাবে।

তখনই পুলিশের লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ে রাহুলের কানের ওপর একটি থাপ্পড় কষিয়ে বললো, আমারে আইন শিখাস বাঞ্চোৎ? আইন তোর পাছা দিয়া ঢুকাবো!

তারপর জিজ্ঞাসার নামে তাকে সারা রাত কিল-চড়-ঘুষি লাথি থেকে আরম্ভ করে ব্যাটন দিয়ে পিটিয়ে তৃপ্তি না হওয়ায় অবশেষে গজারির লাকড়ি দিয়ে পেটানো হয়। শরিফ সাহেবের দেয়া টাকাগুলো পকেট থেকে কখন ওরা বের করে নিয়েছে বলতে পারবে না সে। কতগুলো কাগজে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সই করতে বাধ্য করা হয়। পরদিন নিঃস্ব অবস্থায় সে চালান হয়ে যায় কোর্টে। সেখানেই জানতে পারে মাদক বিক্রেতা মাসুমের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। সে যে অবৈধ মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত সে ব্যাপারে সে লিখিত দিয়েছে। এমন কি একশ চৌষট্টি ধারায় জবানবন্দি দিতেও প্রস্তুত।

কিন্তু কোর্টে জেরার মুখে রাহুল সব কিছু অস্বীকার করলেও কোনো কাজ হলো না। পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো জেলে। আস্তে ধীরে সে জানতে পারে যে সেই মাসুমের প্রকৃত খুনী। হায়রে আইন! হায়রে আমাদের বিচার ব্যবস্থা!

কিন্তু ভাগ্য ভালো বলতে হবে তার। কেসটা দ্রুতবিচার আইনের আওতায় থাকার ফলে, ছ মাসের ভেতরই তার বিচার হয়ে যায়। তার অপরাধ প্রমাণ হলো না। মাসুমের খুনীরাও ধরা পড়লো না। কতিপয় স্বার্থপর আর লোভী লোকের কারণে মাসুম হত্যার সুবিচার না হলেও রাহুলের প্রতি অবিচারের কারণে প্রকৃত অপরাধীরা রয়ে গেল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু মাঝখান দিয়ে একটি প্রাণ অপচয় হলো। আর রাহুলের ভবিষ্যত আবারো ঝুঁকে পড়লো অন্ধকারে।

জেল থেকে বেরিয়ে প্রথমেই গন্তব্য ঠিক করতে পারে না রাহুল। এমনকি করণীয় কি তাও ঠিক করতে পারে না। কিছুক্ষণ জেল গেটেই দাঁড়িয়ে থাকে সে। একসঙ্গে অনেক ভাবনাই তার মস্তিষ্কে ভীড় করে এলোমেলো করে দেয় তাকে।

সঙ্গে কোনো টাকা পয়সা নেই জানতে পেরে পুরোনো কয়েদীরা মিলে তাকে দুশো টাকা চাঁদা তুলে দিয়েছে। সে টাকাগুলোই এখন তার পকেটে আছে। প্রথমেই মনে হয়েছিলো বাবা মা’র কথা। কিন্তু তারচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে শরিফ সাহেবের সঙ্গে দেখা করা। ভদ্রলোক তাকে ভালো জেনেই টাকাটা দিয়েছিলেন। এখন এতদিন ধরে তার অনুপস্থিতি তাকে প্রতারক শ্রেণীর লোক হিসেবেই তুলে ধরবে। ভদ্রলোক এতদিন পর তার কথা শুনতে চাইবেন কিনা সেটাই প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কথা শুনতে চাইলে তার সমস্যার কথা সে বলতে পারবে। আর দেখা হওয়ার আগেই যদি দূর দূর করে বা জোচ্চোর হিসেবে ফের পুলিশের হাতে তুলে দেয় তাহলে তার জীবনটা আবার মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহ নেই।

একটি চায়ের দোকানে বসে সে এক কাপ চা খেতে খেতে তার করণীয় স্থির করে ফেলে। যে করেই হোক শরিফ সাহেবের সঙ্গে তার দেখা না করলেই নয়। হেমায়েত পুরের ব্যাপারটাও মাথায় রইলো। বাবা মার কথাটাও বিবেচনার বাইরে নয়।

চা খাওয়া শেষ করে সে বাসাবোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় ঠিকই। কিন্তু এখানে এসে ময়ূরী গার্মেন্টস এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায় না সে। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো যে, এটি কিছু দিন হয় বনানীর দিকে স্থানান্তর হয়েছে। কিন্তু বনানী তো আর এতটুকুন জায়গা নয়। সেখানকার কোথায় তা নিশ্চিত করে বলতে পারলো না কেউ। শেষটায় সে শরণাপন্ন হলো একজন পান-সিগ্রেট বিক্রেতার। গার্মেন্টস কর্মীদের অনেকেই হয়তো তার কাছ থেকে পান-সিগারেট কিনেছে।

সে সুবাদে কারো সঙ্গে তার তার ভালো জানাশুনা হওয়াটাও বিচিত্র কিছু নয়। আর এটিই আপাতত রাহুলের কাছে প্রধান উপায় বলে মনে হলো। সে সঙ্গে জানা গেল বনানী নয়, বড় মগবাজারের দিকে সেটি স্থানান্তর হয়েছে।

রাহুল আবার বড় মগবাজারের দিকে ছোটে। এতে অবশ্য কাজও হয়। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একে-ওকে জিজ্ঞেস করার পর সে ময়ূরী গার্মেন্ট-এর হদিস পেয়ে গেল। উপরে উঠে জিএম শরিফ সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল তিনি সিঙ্গাপুরে আছেন। ফিরতে সপ্তাহ দুয়েক দেরি হবে। কিছুক্ষণ হতাশ হয়ে সে বসে থাকলো। তারপর একজনকে জিজ্ঞেস করলো ফরহাদের কথা। কোন ফ্লোরে আছে জানতে চাইলে লোকটি জানালো ফরহাদ এখান থেকে চলে গেছে। উত্তরার দিকে কোনো একটি ফ্যাক্টরিতে জয়েন করেছে। আর তো বোধ হয় উপায় রইলো না। শেষ উপায় হিসেবে সে জানতে চাইলো খায়রুদ্দিনকে কি পাওয়া যাবে? ওই যে হেলপার থেকে পিএম হয়েছে!

কিন্তু খায়রুদ্দিন প্রথমে তাকে চিনতে পারলো না বলে কথা বলতে রাজি হলো না। রাহুল বললো, মাস ছয়েক আগে বাসাবোতে ফ্যাক্টরি থাকতে তার চাকরি হয়েছিলো। শরিফ সাহেব যে তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন তাও সে জানালো। আর তা শুনে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো খায়রুদ্দিন।

তারপর আস্তে ধীরে থানা থেকে জেলে যাওয়ার ঘটনা বলার পর খায়রুদ্দিনের দৃষ্টি সহজ হয়ে উঠলো। বললো, এতদিন পরে আপনের কাগজ পাতি আছে কিনা কই ক্যামনে?

যদি একটু হেল্প করতেন! অন্তত শরিফ সাহেবের কাছে আমাকে ছোট হতে হবে না।

খায়রুদ্দিন সঙ্গে করে রাহুলকে নিয়ে গেল এ জিএমের রুমে। সেখানে জানা গেল তার পোস্টে নতুন লোক নিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনই কাজ চাইলে একটি ছোট পোস্টে তাকে কাজ করতে হবে। শরিফ সাহেব ফিরে এলে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলা যাবে। যেহেতু রাহুলের কথাবার্তায় মোটামুটি সৎ মানুষের পরিচয় ফুটে উঠেছে, সে হিসেবে এ জিএম তাকে এ সহযোগীতাটা করতে পারেন। বেতনও সামান্য। কোনো রকমে তার থাকা-খাওয়ার খরচ চলতে পারে।

চাকরি পাওয়াটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে শরিফ সাহেবের মত মানুষের দৃষ্টির সামনে থাকাটা। আড়ালে থাকলেই তার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ হওয়ার অবকাশ থেকে যায়। আর একজন সৎ মানুষ সমস্যার মুখোমুখি হয়েই তা মেটাতে চায়। পালিয়ে থেকে নয়।

কথাবার্তা পাকা হয়ে গেলে সে দুদিন পর এসে কাজে যোগ দেবে কথা দিয়ে বেরিয়ে আসে। যদি শরিফ সাহেব ফিরে আসতে দেরি হয় কিংবা তাকে টাকাটা তাৎক্ষণিক ভাবে ফিরিয়ে দিতে হয় তাহলে তেমন একটা প্রস্তুতিও থাকা দরকার। অন্তত মাসখানেক চলার মত সংস্থান তাকে করতে হবে। যদিও রাহুলের মনে হচ্ছে শরিফ সাহেব তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরবেন না, তবুও সাবধানের মার নেই। আগেই হেমায়েতপুর না গিয়ে থানায় যাওয়াটা তার ঠিক হয়নি। ঠিক হয়নি এতটা দায়িত্ববান হওয়াও। প্রয়োজনে কিছুটা দায়িত্বহীন হলেও অনেক সময় অনেক ঝামেলা এড়িয়ে থাকা সম্ভব।

খায়রুদ্দিন নিজ থেকেই বললো, আপনে তো এখনই মেস ঠিক করতে পারবেন না। মাসের পনের দিন না গেলে বোর্ডাররা তাদের সিট ছাড়ার কথা জানায় না। তারই ফ্লোরের একজন সুপার ভাইজারের সঙ্গে দিন কয়েক থাকতে পারে সে। সে একাই একটি রুম নিয়ে থাকে। কাজেই যেদিন সে জয়েন করবে সেদিন যেন বিছানা-পত্র সঙ্গে নিয়ে আসে।

দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার কারণে রাহুলের বাবা মা তাকে দেখে কান্না জুড়ে দিলেন। কোনো খোঁজ-খবর চিঠি-পত্র ছাড়া কেন এতদিন সে চুপ করে ছিলো। কী এমন সমস্যা তার হয়েছিলো? সন্তানের শোকে শোকে তার মা অসুস্থ হয়ে প্রায় শয়্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। ছেলে ফিরে আসাতে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। তার বাবা-মা দু’জনই তাকে জানিয়ে দিলেন আর কোথাও তার যাওয়া চলবে না। এখন থেকে গ্রামের বাড়িই তাকে থাকতে হবে। নতুন একটি স্কুল হচ্ছে সেখানে সে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেবে। এমন কি তারা রাতে রাতে রাহুলের জন্য পাত্রীও ঠিক করে ফেললেন। স্কুল প্রতিষ্ঠাতার ছোট মেয়ে। জিন্নাত আরা। যাকে সবাই জিনু বলে ডাকে। জিপিএ সাড়ে চার পেয়ে ম্যাট্রিক পাশ করা। মোটামুটি শিক্ষিত মেয়ে। সুন্দরীও বলা যায়। কিন্তু রাহুলের দৃষ্টিতে মাত্র দশ-বারো ক্লাস পড়ুয়া মেয়ে শিক্ষিত বলে গণ্য হয় না। আর কম শিক্ষিত মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি গিয়ে নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে নৈতিকতা বোধও তাদের কম থাকে বলেই শুনেছে।

তার বন্ধু জুলকারনাইন বলেছিলো, অশিক্ষিত মেয়েরা গ্রুপিং আর পরচর্চায় পটু। কখনো তারা ঈর্ষাকাতরও হয়। কখনো বা পরশ্রীকাতরও। তার কাছ থেকেই রাহুল শুনেছে যে, সে যখন বিয়ে করে তখন তার ভাইয়ের বাসায় থাকতো সে। কিন্তু বিয়ের পর যখন তার ভাই বললো তাকে বউ নিয়ে আসতে, তখনই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তার ভাবি তার থাকার রুমটিকে দিনে দিনে ড্রয়িং রুম বানিয়ে ফেললেন। আর তার শোবার জায়গা হয়েছিলো ড্রয়িং রুমে। যেখানে দরজার বদলে কার্টেনের ব্যবস্থা ছিলো।

নিজের বিয়ের কথা শুনে দীর্ঘদিন পর জুলকারনাইনের কথা মনে পড়লো রাহুলের। কিন্তু সে এখন কোথায় আছে কোনো খোঁজ খবর নেই। অবশ্য তার গ্রামের বাড়ি গেলে খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। আর তখনই রাহুল ঠিক করলো, চাকরিতে পাকা হতে পারলে একদিন সময় করে তার গ্রামের বাড়ি যাবে। ছাত্রাবস্থায় সেখানে কয়েকবার গিয়েছিলো সে।

বাবার মতের বিরুদ্ধে না গিয়ে রাহুল বললো, বাবা, মাত্র চাকরিটা পেয়েছি। তাও জয়েন করিনি। এমন অবস্থায় বিয়ে করলে নানা রকম সমস্যায় পড়ে যাবো। তার ওপর আমি এসেছি কিছু টাকার জন্যে। মাস খানেক চলার মত। তা ছাড়া আমি নিজে শিক্ষিত হয়ে একটি অশিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হবে। দেখা যাবে মেয়েটা আমাকে বুঝতেই পারছে না। কিছু টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে দিতে পারলে দাও। কাঁথা-বালিশ নিয়ে কালই রওয়া হই।

রাহুলের বাবা হাফিজ মিয়া বেশি লেখাপড়া না করলেও আচরণ অশিক্ষিতের মত নয়। তিনি অনেকের চাইতেই ভালো বোঝেন। ছেলের অমতের কারণও হয়তো অনুধাবন করতে পারলেন কিছুটা। বললেন, মেয়ে কলেজে ভর্তি হবে। আরো পড়াশুনা করে তোর সমান যোগ্য হবে। তোর মত দিতে অসুবিধা কোথায়? নাকি কাউকে ঠিক করে রেখেছিস?

রাহুল বাবার কথা শুনে হেসে ফেললো। না বাবা। তেমন কিছু না। রহিম বক্সের মেয়ে আমার সমান হতে হতে কম করে হলেও আরো আট বছর সময় দরকার। ততদিনে মনে হয় আমি অনেকটা বদলে যাবো। হয়তো আমার জীবন-যাপন এমন কি ভাবনা-চিন্তাও বদলে যেতে পারে। তার চেয়ে ভালো ব্যাপারটা বাদ দিয়ে দাও। আগে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াই।

রাহুলের মা পাশ থেকে বলে উঠলেন, থাকুক না। ছেলের মত যখন নেই, তা নিয়ে জোরাজুরি করে লাভটা কি?

না মা, রাহুল বললো, মতামতের ব্যাপার না। সময়। আটবছর অনেক সময়!

রাহুলের বাবা কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়েই যেন বললেন, তোর ভালো তুই বুঝিস। কিন্তু তোর জন্যে একটা ভালো সুযোগ ছিলো। রহিম বক্সের মেয়েটা ছাড়া আর কেউ নেই। তাদের কত বড় বাড়ি আর পুকুর। জমি-জমাও এ অঞ্চলে সবার চেয়ে বেশি। আর কত সম্মানী লোক!

তারপর তিনি কি একটা কাজে বাইরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরই আবার ফিরে এসে বললেন, রহিম বক্সের সঙ্গে যদি দেখা হয়, মান-সম্মান রেখে কথা বলিস।

এবার ছেলেকে একা পেয়ে মা তার একটি হাত ধরে বললেন, বাবা সত্যি করে বল কি হয়েছিলো? এতদিন কী করলি? কোনো বিপদ-টিপদ হয়েছিলো?

সত্যি কথাটা কি বলা উচিত হবে? জেলে থাকার কথা শুনলে হয়তো তিনি তাকে বাড়ি থেকে বের হতেই দেবেন না। তাই আসল কথাটা এড়িয়ে গিয়ে সে বললো, এতদিন চেষ্টা করছিলাম তোমাদের কাছে হাত না পেতে নিজে নিজেই কিছু করতে পারি কি না। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত হেরে গেছি মা। টাকার জন্য আমাকে তোমাদের কাছে আসতেই হলো।

থাক বাবা। তুই তো পরের কাছে আসিসনি। বাবা মায়ের কাছে এসেছিস। আর আমাদের চাইতে কে তোর বেশি আপনজন?

রাহুল চুপচাপ জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে।

তখনই তার মা আবার ফিসফিস করে জানতে চাইলেন, নাকি বিয়ে-শাদি করেছিস? ভয় পাস না। আমাকে সত্যি কথাটা বলতে পারিস। যে ভাবে পারি তোর বাবাকে বোঝাবো।

রাহুল তার মায়ের হাতটি বুকে ধরে বললো, না মা। তেমন কিছু হলে তো তোমাকেই আগে বলতাম। এর আগে তোমার কাছে তেমন কিছু কি লুকিয়েছি, বলো?

ছেলের কথা শুনে তিনি আর কিছু বললেন না। কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

রাহুল বললো, রুহুল কোথায় মা? বাড়ি নেই?

ও পিটিআই পড়ছে। কত করে বললাম, বিএ ক্লাসে ভর্তি হতে। শুনলোই না। বলে কিনা রাহুল ভাই তো এমএ পাশ। কী করতে পেরেছে? দেখো সে চাকরি পাওয়ার আগেই আমি স্কুলে চাকরি পেয়ে যাবো।

বাড়ি আসে তো?

সপ্তাহের বন্ধ পেলেই চলে আসে। এখান থেকে আসা যাওয়া করে নাকি ঠিকমত পড়াশুনা হয় না।

ওর মত আমিও যদি তোমাদের জোর দিয়ে বলতে পারতাম, তাহলে আমাকেও এখন পচে মরতে হতো না।

বাবা মন খারাপ করিস কেন? কোনো শিক্ষাই বিফলে যায় না। তোর ডিগ্রিও একদিন কাজে লাগবে।

হয়তো লাগবে। কিন্তু সে দিনটি আর কত দূর তা যদি জানতে পারতো রাহুল!

অনেক দিন পর বাড়ি এসেছে বলে সে বলতে গেলে সারাদিন বাইরে বের হলো না। কিন্তু একা একা ঘরে বেশিক্ষণ বসে থাকা না গেলেও বিকেলের দিকে সে বাড়ি থেকে বের হলো। অনেকের সঙ্গেই তার দেখা হয়। আর সবাই প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন করে। এতদিন সে বাড়ি এলো না। কী এমন সমস্যা হয়েছিলো? রাহুল নানা ভাবে সে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যায়। কিন্তু হরিচরণ মাস্টারের বাড়ি এলে সে খুব সহজেই প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই নি:সন্তান হরিচরণ মাস্টার এবং তাঁর স্ত্রী বিভাবতীর স্নেহের ছায়ায় বড় হয়েছে বলে সত্যটাকে আড়াল করতে পারলেও মিথ্যের আশ্রয় নিতে পারে না। বলে, পুলিশের ঝামেলায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম। যে কারণে আসার সুযোগ পাইনি।

তখনই হরিচরণ মাস্টারের স্ত্রী বিভাবতী এসে দরজায় উঁকি দিলে রাহুল বললো, চাচি ভালো আছেন?

তিনি মাথায় আঁচল টানতে টানতে এগিয়ে এসে বললেন, এতদিন পর চাচির কথা মনে পড়লো? কেমন আছিস বাবা?

কথা বলার সময় তার কন্ঠে এবং দৃষ্টিতে যুগপৎ স্নেহ-মমতার বুদবুদ ফুটতে থাকে যেন।

একটা সমস্যা হয়েছিলো বলে আসতে পারিনি।

তারপরই সে আবার হরিচরণ মাস্টারের দিকে ফিরে বললো, বাবা মা যেন এ কথা না জানে। এ না হলে আমাকে আর যেতে দেবে না।

হরিচরণ মাস্টার কিছুটা ঝুঁকে পড়ে বললেন, আমার কথা তো শুনলি না। চাকরি বাকরি কিছু জোটাতে পেরেছিস?

একখানে কথা হয়েছে। আগামীকাল থেকে জয়েন করার কথা।

বেতন কেমন? ঢাকা শহরে খেয়ে পরে বাঁচতে পারবি তো?

শুরুতে বেতনটা কমই হবে। আস্তে ধীরে বাড়বে বলেছে।

বাড়লেই ভালো। তোর জায়গায় আফজাল মাস্টারের ছেলে আজমলকে নিয়েছি। সে এখন বেতন আর টিউশানি মিলিয়ে মাসে বিশ হাজারেরও বেশি রোজগার করছে।

রাহুল কিছুক্ষণ তার প্রিয় শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, স্যার, আপনিইতো বলেছেন যে, লক্ষ্মী আর স্বরস্বতী এক জায়গায় থাকতে চান না। স্বরস্বতী ভালোবেসেছেন বলে লক্ষ্মী আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আছেন।

শুধু তো তাই বলিনি! বলেছিলাম, দু’বোনকে ধরে রাখার কৌশলটাও শিখতে হবে।

রাহুলের মন খারাপ হয়ে যায়। বলে, সেটা আর শিখতে পারবো বলে মনে হয় না স্যার। জীবনটা খুবই জটিল আর আমাদের চারপাশের সবকিছুই বলতে গেলে খুব কঠিন আর দুর্বোধ্য মনে হয়।

হরিচরণ মাস্টারের স্ত্রী বিভাবতী বললেন, সন্ধ্যার পর একবার আসতে পারবি?

কোনো কাজ থাকলে তো আসতেই হবে।

আজ পূর্ণিমা ভুলে গেলি?

তখনই রাহুলের মনে পড়ে যে, প্রতি পূর্ণিমার রাতে তিনি পায়েস রেঁধে তাকে আসতে বলতেন।

তারপর তিনি পাশে বসে পায়েসের বাটিটা তার সামনে নামিয়ে রেখে বলতেন, পূর্ণিমার রাতে পায়েস খেলে বিদ্যাবুদ্ধি হয়। স্বরস্বতীর কৃপা বাড়ে। ঢাকা শহরে চলে যাবার আগ পর্যন্ত প্রতি পূর্ণিমায় এসে তাকে পায়েস খেতে হতো। মাঝে মধ্যে গ্রামে এলেও যদি পূর্ণিমা থাকতো তাহলেও এর অন্যথা হয়নি কখনো। আজও যেন সেই দিনটি তাকে পরম মমতায় আশ্রয় দিচ্ছে বুকের উষ্ণতায়।

আসবি তো? কথা দিলে পায়েস করতে বসবো।

বিভাবতী যেন প্রত্যাশা নিয়েই তাকিয়ে থাকেন রাহুলের মুখের দিকে।

রাহুল তখনই বলে উঠলো, অবশ্যই আসবো!

তখনই তিনি ফের মাথায় আঁচল টানতে টানতে ফিরে গেলেন।

হরিচরণ মাস্টার কিছুটা গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন। রাহুল বললো, কিছু ভাবছেন স্যার?

হরিচরণ মাস্টার মুখ তুলে বললেন, ভাবতে কি আর চাই! তবুও কত ভাবনা এমনিতেই চলে আসে। না ভেবেও পারি না!

আপনার এখন যে বয়স বেশি ভাবনা-চিন্তা করাটা তো ঠিক হবে না।

আমার জন্য ভাববে এমন কেউ তো নেই!

হরিচরণ মাস্টারের কথার ভেতর যেন হাহাকার ধ্বণিত হয়।

তারপর তিনি মুখ তুলে আবার বলতে লাগলেন, কোন ভরসায় নিশ্চিন্ত থাকি বল? তা ছাড়া তুই বললি না যে, চারপাশের সব কিছু কেমন কঠিন আর দুর্বোধ্য মনে হয়। আমারও ঠিক এমনটাই মনে হয়। সব কিছু কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এতদিনকার চেনা মানুষগুলো এমন কি আশৈশব যাদের সঙ্গে বড় হয়েছি, মাঝে মাঝে তাদেরও কেমন যেন অচেনা আর দূরের বলে মনে হয়। হেসে কথা বললেও মনে হয় দৃষ্টি যেন নিরেট পাথর। হাসির আড়ালে আরো কঠিন কিছু লুকিয়ে আছে।

হরিচরণ মাস্টার চুপ করে আরো কিছু নিয়ে হয়তো ভাবেন। তারপর ফের বলে ওঠেন, মাঝেমধ্যে কি মনে হয় জানিস? মনে হয় একাত্তরের দুর্বিনীত দিনগুলো যেন এখনো হঠাৎ হঠাৎই আমাদের জনপদের কোথাও জীবন্ত হয়ে ওঠে। লোক মুখে সংবাদ পাই। কখনো সংবাদপত্রের পাতায় দেখি। আর এসব দেখে মনে হয় হানাদাররা চলে গেলেও তাদের নিশ্বাস-প্রশ্বাস আর পদশব্দ এখনও মিলিয়ে যায়নি। যেন অশরীরি হয়ে রয়ে গেছে আমাদের চারপাশে। সুযোগ পেলেই জীবন্ত হয়ে উঠবে। কখনো কখনো তো ভয়ে আধখানা হয়ে যাই। সারারাত ঘুমুতে পারি না। বাইরে বের হলে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নিরাপদ বোধ করি না।

রাহুল হরিচরণ মাস্টারের অন্তর্গত কান্নার শব্দ শুনতে পায় যেন। তিনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন তাও যেন তার ভাবনায় পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে। তবুও সে বলে, বয়স হচ্ছে বলে এমন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।

তোর কাছে স্বাভাবিক মনে হলো?

তিনি কিছুটা উষ্ণ হয়ে উঠে বলতে লাগলেন, হরিহর পাল এক রাতের ভেতর ঘরবাড়ি জমি-জমা চেয়ারম্যানের নামে লিখে দিয়ে রাতের অন্ধকারে পরিবার পরিজন নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। আমাকে একদিন দেখতে না পেলে, আমার এখানে এসে দু’দণ্ড বসতে না পারলে যার পেটের ভাত হজম হয়নি, তার মত মানুষ আমাকে পর্যন্ত কিছু জানায় না! এটাকে তুই স্বাভাবিক বলবি? কিসের উপর, কোন যুক্তিতে তুই এটাকে স্বাভাবিক ঘটনা বলবি? আর কিসের উপর ভিত্তি করে জন্মভূমিতে প্রপিতামহ আর পিতামহের কাছ থেকে পাওয়া আমার পৈতৃক সম্পত্তি শত্রু-সম্পত্তি বলে গণ্য হয়? এটাও কি বলবি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার?

হরিহর পালের কথা জানে না রাহুল। লোকটি কেনই বা এমনটা করলো ভেবে পায় না সে। আড়ালে তেমন কোনো বেদনাদায়ক ঘটনা ক্যান্সারের মত ঘাপটি মেরে নেই তো?

রাহুলের খারাপ লাগলেও সে কিছু বলতে পারে না। চুপচাপ বসে হাতের নখ খুঁটতে থাকে।

আসলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই যেন কেমন। গ্রামীণ জনপদ খুব বেশি পুরোনো হলেও আবহমান কাল থেকেই যেন এখানকার অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাগুলোকে খুব বেশি অন্ধকার মনে হয়। আর কখনো কখনো সে অন্ধকারে শুনতে পাওয়া যায় অজ্ঞাত মানুষের চাপা কণ্ঠস্বর। কখনো বা কোনো নিপিড়ীতের আর্তনাদ। কিন্তু সে অন্ধকারের দিকে আলো ফেলে সত্য উদ্ঘাটনের দিকে কারো আগ্রহ কোনো কালেই ছিলো বলে মনে হয় না। কিংবা কেউ আগ্রহী হলেও হয়তো তাকে সেদিকটি আলোকিত করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ আমাদের পুরোনো আর জরাজীর্ণ পৃথিবীটি অতি আধুনিক যুগ অতিক্রম করে গেলেও গ্রামীণ জনপদের নির্বিকার মানসিকতায় কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না। হয়তো নিকট কিংবা দূর ভবিষ্যতেও তেমন কোনো হেরফের হবে না।

রাহুল যে ফ্লোরে শিক্ষানবীশ হিসেবে নিয়োজিত হয়েছে সেটা খায়রুদ্দিনের দায়িত্বে। খায়রুদ্দিন প্রোডাকশন ম্যানেজার হলেও, চারজন কোয়ালিটি কন্ট্রোলার আর চারজন সুপারভাইজার থাকলেও সে আটজনের ভেতর জাফরুল্লার ক্ষমতাটাই যেন বেশি। বলতে গেলে সারাক্ষণ তার হাঁকডাকেই ফ্লোর গরম হয়ে আছে। আর যারা এখানে কাজ করছে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন বয়সের মেয়ে। তাদের সঙ্গেই জাফরুল্লার চোটপাট দেখা যায় বেশি। মুখ দিয়ে যা আসে তাই সে বলতে দ্বিধা করছে না। প্রথম দিন বলে ব্যাপারটা খারাপ লাগলেও রাহুল কিছু বলতে পারছে না। এরই মধ্যে একটি যুবতী পেট ব্যথা বলে পেট চেপে ধরে এগিয়ে এলো। বললো যে, তার ছুটি দরকার।

জাফরুল্লা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, দেখলাম তো মোবাইলে কার লগে জানি কথা কইলা। আর ফোন পাইয়াই প্যাট ব্যথা শুরু হইছে, না?

জাফর ভাই, সত্যিই আমার পেট ব্যথা করতাছে!

রাহুল দেখলো মেয়েটির চেহারায় যন্ত্রণার ছাপ সুস্পষ্ট। হয়তো সত্যি কথাই বলছে সে। জাফরুল্লা বললো, তোমার ভাতার কি নিচে খাড়াইয়া ফোন দিছে? গেলে যাইতে পার। কিন্তু আইজ তোমার হাজিরা দিমু না!

দিয়েন না! বলে, মেয়েটি কোলাপসিবল গেটের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে জাফরুল্লা তাকে ডেকে ফেরায়। নাসিমা দাঁড়াও!

মেয়েটি ফিরে দাঁড়ালে সে বললো, নিয়ম মত তোমারে চেক করতে হইবো। দুই একটা টি-শার্ট কোমরে নাইলে বুকে বাইন্ধা পাচার করতাছ কিনা আমার দেখতে হইবো।

নাসিমা বললো, মরিয়ম আপা তো চেক করবোই। আপনে চেক করবেন ক্যান?

আমি তিন নম্বর লাইনের সুপারভাইজার। আমারই দায়-দায়িত্ব বেশি। বলে, সে নাসিমাকে হাত ধরে টেনে ব্যালকনির দিকে আড়ালে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মেয়েটিকে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে যেতে দেখে রাহুল।

ব্যপারটা বুঝতে না পেরে সে বললো, কি হইলো ভাই? মেয়েটা কানতেছে ক্যান?

জাফরুল্লা বললো, আপনে নতুন মানুষ। এত কিছু বুঝবেন না!

তার কন্ঠের ধার আর ঔদ্ধত্য রাহুলকে উত্তপ্ত করে তুললেও সে নির্বিকার থাকতে চেষ্টা করে। অনেক কিছুই সে জানে না। আর জানে না বলেই তাকে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে। তবে মনেমনে সে বললো, জাফরুল্লা তোমাকে আমি অনেকদিন মনে রাখবো!

তারপর সে ঘুরে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হেনার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হেনা একটি টি-শার্ট তুলে নিয়ে ফিতে দিয়ে মাপজোক করে বললো, এইটার সব ঠিক থাকলেও কেন রিজেক্টের হিসাবে পড়বে অনুমান করতে পারেন? যদিও আপনার অভিজ্ঞতা নাই। তবুও একটু খেয়াল করলে ব্যাপারটা হয়তো অনেকেই ধরতে পারবে।

রাহুল টি-শার্টটাকে উল্টে-পাল্টে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেও কিছু বুঝতে পারলো না। বললো, ধরতে পারছি না।

হেনা টি-শার্টটার গলার কাছে ধরে বললো সেলাইটা দেখছেন? সমান হয় নাই। নিচের দিকে বাইড়া গেছে। বেশি দাম দিয়া এই টি-শার্ট কেউ পড়তে চাইবো না।

সেলাই খুলে আবার ঠিক করে নিলেই তো হয়!

হয়তো হয়। বলে হাসলো হেনা। তারপর আবার বললো, সেলাই খুলতে যতক্ষণ লাগবে, ততক্ষণে আরো তিনটা টি-শার্ট নামানো যাবে। কাজেই এইটার পিছনে সময় নষ্ট করা অর্থহীন।

তখনই চট করে একটি শব্দ হতেই রাহুল ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেলো, জাফরুল্লা একটি মাঝ-বয়সী মহিলাকে হয়তো চড় মেরেছে। হাতটা তুলে রেখেছে আরেকটা চড় মারার ভঙ্গিতে।

লোকটা করলো কি! বলেই রাহুল সেদিকে পা বাড়ালে হেনা তার বাহু টেনে ধরে বলে, ওইটা আপনার দেখার বিষয় না।

তাই বলে মেয়েদের গায়ে হাত তুলবে?

কয়দিন কাজ করেন, নিজেই বুঝতে পারবেন।

কিন্তু ব্যাপারটা অন্যায়! অমানবিকও!

প্রথম প্রথম আমারও খারাপ লাগতো। এখন কিছুই মনে হয় না। তা ছাড়া আপনে তো বেশিদিন এ পোস্টে থাকবেন না। শিক্ষিত ছেলেরা অল্প কয়দিনেই আরো উপরে চইলা যায়। তখন এসব আপনের চোখে পড়বে না।

আপনিও তো ভালো লেখাপড়া জানা মেয়ে। এমন মধ্যযুগীয় নিয়ম চলতে দেখে চুপ করে থাকেন কিভাবে?

হেনা তখনই কোনো জবাব না দিয়ে বললো, আসেন আপনারে আরো রিজেক্ট হওয়া মাল দেখাই।

সে এগিয়ে যেতে থাকলে, পিছু পিছু রাহুলও যায়। একটি রুমের মেঝেতে অনেকগুলো টি-শার্ট স্তুপ করা আছে। স্তুপ থেকে একটি টি-শার্ট হাতে তুলে নিয়ে হেনা নিচু কন্ঠে বললো, আমাদের মালিকরাও আমাদের ঠিক মানুষ বলে ভাবে না। তাদের চাই প্রোডাকশন! ঠিক ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর দালাল যেন। কী করে কত কম পয়সা ইনভেস্ট করে রাতারাতি বেনিফিট তুইল্যা নিবে সেই চিন্তাই তারা করে। কিভাবে কাজটা হবে বা হইলো তা নিয়া তাদের মাথা ব্যথা নাই। দেখেন না, কয়দিন পরপর গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাস্তায় নাইমা আসে? তার মানে কি? তা ছাড়াও ব্যবসার মেইন কথা হইলো যা ইনভেস্ট হইলো, আগে সেইটারে ঠিক রাখা। যে কারণে অত্যাচারের মত ঘটনা ঘটে।

তাই বলে এসব হতে থাকলেও মুখ বুঁজে থাকবো?

উপায় নেই। মস্তানদের সঙ্গে জাফরুল্লার হট কানেকশান আছে। আমাদের এখানেও শ্রমিকরা বাড়াবাড়ি করলে সে তার মস্তান বন্ধুদের নিয়া আসে। হুমকি ধমকি মারধর অনেক কিছুই করে। একবার তো একটা ছেলে প্রতিবাদ করায় তার হাত নাকি কাইটা ফেলছে। এমনকি সবার সামনে একবার একটা মেয়েরেও যা তা ভাবে হেনস্তা করছে।

মালিক জানে না? কোনো অ্যাকশান নেয়নি? তা ছাড়া র‌্যাবকেও তো জানাতে পারতেন!

মালিকের কাছ থেকে সাহস না পেলে কি আর ওরা এতটা সাহস পায়? একই শ্রেণীর হইয়াও দুই একজন মানুষ কেন পাওয়ার পাইয়া তারই মত মানুষগুলারে পিষ্যা মারতে চায় নিজে বুঝেন না?

হেনার কথা শুনতে শুনতে রাহুলের মনে হয় যেন ইতিহাসের অন্ধকার থেকে উঠে আসছে এসব গল্প। যেখানে শ্রমিকদের গলায় পায়ে শিকল দিয়ে রাখা হতো। এখানেও যেন তার আধুনিকায়ন করে কোলাপসিবল গেটের ভেতর শ্রমিকদের রুদ্ধ করে কাজ আদায় করে নিচ্ছে মালিক পক্ষ। পার্থক্য শুধু তখনকার দাস শ্রেণী কাজ করতো নির্যাতনে বাধ্য হয়ে। আর এখনকার শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হয় অভাবের তাড়নায়। ক্ষুধার যন্ত্রণায়। তাই মেনে নেয় সবই। চেষ্টা করে স্রোতের সঙ্গে মিশে যেতে। কারণ উপরঅলাদের নেক নজরে থাকলে অবাঞ্ছিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না।

তখনই একজন এসে হেনাকে বললো, খায়রুদ্দিন ভাই আপনেরে ডাকে।

টি-শার্টটি স্তুপের উপর ফেলে দিয়ে হেনা বললো, এখানে একজনই মানুষ আছে। আর সেটা হইলো খায়রুদ্দিন। পিএম হইয়াও স্যার শুনতে চায় না। আপনে এখানেই দাঁড়ান। কি বলে শুইনা আসি।

হেনা বেরিয়ে গেলে টি শার্টের স্তুপের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার বলা কথাগুলো নিয়েই ভাবতে থাকে রাহুল। তার মনে হয় মেয়েটার ভেতরে আগুন আছে। ছাই চাপা আগুন। কিন্তু কোনো কারণে যেন খটখটে শুকনো পরিবেশে হাওয়ার মুখেও জ্বলে উঠতে পারছে না। স্টুডেন্ট লাইফে ছাত্র-ইউনিয়ন করতো মনে হয়। তখনই পেছন থেকে কারো কাশির শব্দ ভেসে আসে।

জাফরুল্লা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ ঠায় তার দিকেই তাকিয়ে থাকলো সে। যেন নিরব হুমকি দিচ্ছে শীতল দৃষ্টি দিয়ে।

রাহুল বললো, কিছু বলবেন?

বলতে তো চাই। কিন্তু আপনে আবার কি মনে করেন, তাই ভাবতাছিলাম।

বলার থাকলে দেরি করে লাভ কি। আপনার কাছেও তো আমাকে অনেকদিন কাজ শিখতে হতে পারে।

ঠিক। কিন্তু আপনে নতুন মানুষ। হঠাৎ কইরা অনেক কিছুই খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু প্রথম প্রথম সইহ্য কইরেন ভাই। আমার কাজ খারাপ হইলেও আমি মানুষটা খারাপ না। খোঁজ নিয়া দেইখেন, ওয়র্কারের সুবিধা অসুবিধায় যে যখন আমারে ডাকে আমি যাই। দিন নাই রাইত নাই। ঝড়-তুফান কিছুই দেখি না। ওয়ার্কাররা আমার নাম শুনলে যেমন থুথু করে, তেমন আপনও মনে করে। সত্যি কথা কইলে কি কইবেন জানি না। আসলে লেবাররা লাত্থি-গুতা না খাইলে কাজ করতে চায় না। কাইল থাইকা কতগুলা মাল রিজেক্ট হইছে এই ফ্লোরেই দেখতাছেন। এক মাগিরে চড় লাগাইছি দেখবেন দুই চাইরদিনের ভিতরে আমার লাইনে আর তেমন রিজেক্ট মাল নামবো না।

রাহুল বললো, তবুও ব্যাপারটা ঠিক ভালো লাগেনি।

এবার জফরুল্লা যেন স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হতে চায়। বলে, প্রডাকশন ঠিক রাখতে হইলে এমন এক আধটু করতেই হয়।

এমন না করে বিকল্প কিছু ভাবেন। শুধু শুধু ঝামেলা পাকিয়ে লাভটা কি?

তাইলে ঝামেলা হওনের আগেই আপনে অন্যখানে চইলা যাওন ভালো। আপনেরও মঙ্গল আমারও মঙ্গল!

রাহুল কিছুটা শব্দ করেই হেসে ওঠে। বলে, চাকরি পাওয়া খুবই কঠিন। তার চাইতে আরো কঠিন না খেয়ে থাকা। আপনি কখনো না খেয়ে থেকেছেন? আমি জানি ক্ষুধা কি জিনিস!

জাফরুল্লাকে কেমন যেন বিভ্রান্ত দেখায়। রাহুল তার সঙ্গে মজা করছে নাকি সত্যি কথাই বলছে বুঝতে পারছে না। তাই সে চুপ করেই রইলো।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে রাহুল বললো, মালিক যদি বলে আমার চাকরি নট। তাহলে হাতে ধরবো। লাথি মেরে তাড়াতে চাইলে পায়ে ধরবো। কিন্তু চাকরি ছাড়তে পারবো না!

জাফরুল্লার মুখটা লালচে দেখায়। ভেতরে ভেতরে যেন রাগে ফুসছে। রাহুল যে তাকে পাত্তা দিচ্ছে না সেটা হয়তো সে বুঝতে পেরেছে।

তবুও সে মৃদু কন্ঠে বললো, আইচ্ছা। পরে কথা বলমু। ফ্লোরের অবস্থা কি দেখি যাইয়া।

জাফরুল্লা যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হেনা এসে নিচু স্বরে বললো, বদমাশটা বললো কি?

রাহুল হাসলো। বললো, নাহ। তেমন কিছু না। আমাকে মাপতে এসেছিলো হয়তো।

হেনাকে কেমন ভীত দেখায়। বলে, এরা খারাপ মানুষ। এদের সঙ্গে ঝামেলা কইরা পারবেন না।

আপনি ভয় পাবেন না। কারো সঙ্গেই আমার ঝামেলা হবে না। আর আজ তো প্রথম দিন। আরো কিছু দিন যাক।

হেনার ভীত মুখের দিকে তাকিয়ে রাহুলের মনে হলো যে, ভেতরে ভেতরে খুবই ভালো একটি মেয়ে। যার কাছে নিজকে পরম নিশ্চিন্তে সমর্পণ করা যায়। কিন্তু তার সম্পর্কে তো তেমন কিছুই জানে না রাহুল। তাহলে কিছু না জেনেই এমন একটি ভাবনা কেন তার মাথায় এলো? আর তেমনটি মনে হতেই সে আরো অবাক হয়ে তাকায় হেনার মুখের দিকে।

সন্ধ্যার মুখেই হেনা তাকে ছেড়ে দিলে সে রুমে এসে বাথরুমে ঢুকে দেখলো শাওয়ারটা ঠিক মত কাজ করছে না। বালতির পানি দিয়ে গোসল করতে পারলেও শাওয়ার আর পুকুর এ দু’টোই গোসলের জন্য তার প্রিয়। কিন্তু শাওয়ারটা ঠিক করাতে হলে কাকে বলতে হবে কিংবা নিজেরাই ঠিক করে নিতে পারবে কি না ব্যাপারটা নিয়ে আব্দুল হাকিমের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

আব্দুল হাকিম রুমমেট হিসেবে তেমন একটা মন্দ নয়। তবে বেশির ভাগই চুপচাপ থাকে বলে তার সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করার ইচ্ছে হয় না রাহুলের। কিন্তু শাওয়ারটা খারাপ হয়ে আছে। ঠিক মত পানি আসছে না। ব্যাপারটা হয়তো আব্দুল হাকিমের চোখে পড়েনি। সে বালতির পানি দিয়ে গোসল করে। তাই শাওয়ার ঠিক করার কথাটা বলবে বলবে করেও বলা হয়ে উঠছিলো না। রাত একটার দিকে আব্দুল হাকিম রুমে এলে প্রথমবারের ঘুমটা ভাঙে রাহুলের। তখন নিতান্তই সৌজন্যমূলক দু একটি কথা হয়। তারপরই আবার সে চুপচাপ হয়ে যায়। এমন কি তার চলাফেরার সময় তেমন কোনো শব্দ হয় বলেও মনে হয় না। তখন রাহুল ফের ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আজ সে আবার ঘুমিয়ে পড়তে চায় না। সে একটি পুরোনো পত্রিকা দেখতে দেখতে জেগে থাকে।

রাত একটা বেজে ঘড়ির কাঁটা দেড়টার ঘর পেরিয়ে গেলেও আব্দুল হাকিমের আসার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু আব্দুল হাকিম কখন আসবে? এসে আবার বাইরে থেকে দরজা খটখট করবে। কাঁচা ঘুম নিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতে হবে তাকে। ব্যাপারটা খুবই বিরক্তি কর। কিন্তু নিজের জীবন থেকেই সে শিখেছে যে, কোনো একটি সুবিধা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু অবাঞ্ছিত সমস্যাকেও মেনে নিতে হয়। আর এমন অনেক অবাঞ্ছিত সমস্যার একটি হলো ঘুম থেকে জেগে আব্দুল হাকিমের জন্য দরজা খুলতে হয় রাহুলকে।

রাত দু’টোর দিকে হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে রাহুল। আব্দুল হাকিম যখন আসে তখন কথা বলা যাবে। কিন্তু সকালের দিকে ঘুম ভাঙলে সে বুঝতে পারে গত রাতে আব্দুল হাকিম রুমে আসেনি। তাহলে সারা রাত লোকটা ছিলো কোথায়? হতে পারে ফ্যাক্টরীতেই রাতভর ছিলো। কোনো রাজনৈতিক দল হরতাল ডাকলে আগের রাতে আর কাউকে ছুটি দেয়া হয় না। রাতভর খাটিয়ে নিয়ে হরতালের দিনটির কাজ আদায় করে সকালে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু হরতালের ব্যাপারে তো তেমন কিছু সে শুনতে পায়নি। প্রতিদিন সকালে ফ্যাক্টরিতে যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে একবারেই সে বেরিয়ে পড়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকে নাস্তা করে। তারপর আস্তে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় ময়ূরী গার্মেন্টস-এ। তখনও সবাই এসে পৌঁছে না। গেটকিপার হাশেম ঘড়ি দেখলেও গেট খুলতে কিছুটা সময় নেয়। সে সময়টাতে দেখা যায় হেনা রিকশা থেকে নামছে।

আজও সে গতানুগতিক নিয়মে দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকেই যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই আব্দুল হাকিমকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলো, সারারাত কোথায় ছিলেন?

আব্দুল হাকিমের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। বললো, আজকে তো বিরোধী দলের হরতাল! আপনে কোই যান?

রাহুল অবাক হয়ে বলে, নাস্তা করেই ফ্যাক্টরীতে যাবো ভাবছিলাম।

আজকে হরতাল বললাম না! ফ্যাক্টরি বন্ধ। তার জন্যই তো সারা রাত কাজ করতে হইলো।

আচ্ছা এখানে প্লামার কোথায় পাবো জানেন? বাথরুমের শাওয়ারটা খারাপ হয়ে আছে। ঠিক করানো দরকার।

আব্দুল হাকিমের মুখে আবারও হাসি দেখা যায়। বলে, ওইটা ঠিক করাইয়া লাভ নাই! অত উপরে পানি যায় না। শুরু থাইক্যাই এমন!

ও। নাস্তা কি করে এসেছেন?

ফ্যাক্টরিতেই বিরানী খাইছি। নাস্তার দরকার নাই। আগে আমার ঘুমান দরকার!

আচ্ছা ঠিক আছে। আমি হোটেলে যাচ্ছি।

যান। বলে তাকে পাশ কাটিয়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ে আব্দুল হাকিম।

ঠিকঠাক মত কাজ শিখে নিতে পারলে হয়তো তার বেতন বাড়বে। তা ছাড়া এখানে ক’দিনই বা আর থাকা যাবে। মাসের অর্ধেক পেরুলেই তাকে নিজের জন্য আলাদা সিটের ব্যবস্থা করতে হবে। কাজেই শাওয়ার নিয়ে আর মাথা না ঘামালেও চলবে।

সপ্তাহখানেক পরই শরিফ সাহেব ফিরে এলেন সিঙ্গাপুর থেকে। আসার পর কোনোভাবে রাহুলের কথা শুনতে পেয়েই তাকে ডেকে পাঠালেন।

রুমে ঢুকে রাহুল হাত জোর করে বললো, একটা দূর্ঘটনার জন্য কথা রাখতে পারিনি।

শরিফ সাহেব হেসে বললেন, তা আমি জানি! আপনার পরিকল্পনার কথা জেনেই কিছুটা অনুমান করতে পেরেছিলাম। তবে এটা ভেবে ভালো লাগছে যে, আপনি আমার মুখোমুখি হতে ভয় পাননি।

ভয় তো কিছুটা এখনো আছে!

কিসের ভয়? বসেন! বসেন! বসে কথা বলেন!

রাহুল চেয়ারে বসে বললো, ভয়টা হলো যেহেতু সময় মত আমি আসতে পারিনি। তাই আপনি প্রতিশ্রুতি রক্ষারও প্রয়োজন নেই।

আরে না! প্রতিশ্রুতি প্রতিশ্রুতিই! সময়ের কারণে তা নষ্ট হবে কেন? সাময়িক বিচ্ছিন্নতার কারণে বড়জোর একটি ফাঁক সৃষ্টি হতে পারে। আর তাও সাময়িক। বলেন, চা না কফি দিতে বলবো?

একটা হলেই হয়। দু’টোতেই একই জিনিস আছে।

কিন্তু একটাতে কম, আরেকটাতে বেশি। বলে হাসতে লাগলেন শরিফ সাহেব।

তারপর দু’টো কফির কথা বলে বললেন, একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না।

বলেন।

আমার মনে হয় জেল থেকে ফিরে এসে আপনার একটা ধারণা আমূল পাল্টে গেছে। আর আমার মতে সেটা হলো আপনার অতিরিক্ত দায়িত্বশীলতা। এখন থেকে হয়তো কিছুটা দায়িত্বহীন হতেও চেষ্টা করবেন।

ঠিক বলেছেন। খানিকটা দায়িত্বহীন হলে মনে হয় অনেকটা ঝামেলা এড়িয়ে থাকা সম্ভব।

হয়তো সম্ভব। কিন্তু বারুদের কথা জানেন? ঠিক পরিবেশ পেলে ঠিকই জ্বলে উঠতে দেরি করবে না। দায়িত্বশীল মানুষও অনেকটা তেমন। নিজের দায়িত্বের কথা সে কখনোই ভুলে যায় না। যেমন আপনি এখানে না এলেও পারতেন। ফ্যাক্টরী শিফট হলেও আপনি কেমন করে খুঁজে বের করে ফেললেন। তাই আবারও বলি, আপনারই হবে। তো কাজ কেমন লাগছে?

তেমন একটা খারাপ লাগছে না। কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হেনার সাথে আছি। শুনলাম সামনের সপ্তাহ থেকে আমাকে অন্য কোথাও দেবে।

সেটাই তো ভালো। খায়রুদ্দিন ভালো মানুষ। আপনি তার সঙ্গেই থাকবেন।

আমার তো আরো অনেক কাজ শেখার বাকি রয়ে গেছে!

শিখতে পারবেন। সময়তো চলে যাচ্ছে না। তবে, আমার প্রতিশ্রুতি এখনও ঠিকআছে। চেষ্টা করছি তা ঠিক রাখতে।

একজন লোক কফি নিয়ে এলে, শরিফ সাহেব বললেন, দু’কাপ কফি বানাতে এতক্ষণ লাগলো?

কফি আছিলো না সার!

ঠিক আছে!

লোকটি চলে গেলে কফির কাপ হাতে নিয়ে শরিফ সাহেব আবার বললেন, খায়রুদ্দিনের সঙ্গে কাজ করেন কিছুদিন। এখন সিস্টেম চেঞ্জ হচ্ছে। শিক্ষিত মানুষদের হাতে-কলমে সবকিছু শেখার দরকার পড়ে না।

আসলে প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাজটা কি এখনো কোনো ধারণা পাইনি।

পেয়ে যাবেন। এখন কফি খান।

রাহুল কফিতে চুমুক দিলে তার মুখটা তেতো হয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই। শরিফ সাহেব যেন তা লক্ষ্য করেই বলে উঠলেন, কফি দুধ-চিনি ছাড়াই খেতে হয়।

রাহুল কষ্ট করে কফি খেতে চাইলো না। কাপটা নামিয়ে রাখতেই শরিফ সাহেব বললেন, অভ্যাস করেন। এটাও আপনার ট্রেনিঙের অংশ।

মুখ কাচুমাচু করে রাহুল কফি পান করতে থাকলে শরিফ সাহেব আবার বলেন, খায়রুদ্দিনকে দিয়ে দেশের বাইরের কাজ কিছু হবে না। ও কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে। তাই আমরা আরো শিক্ষিত একজন লোক খুঁজছিলাম। অনেকেই আপনার মত এসেছে। আপনার চেয়ে আরো অনেক স্মার্ট। কিন্তু কাজ শেখার ক্ষেত্রে তেমন একটা ইম্প্রুভ করতে পারেনি বলে, কোয়ালিটি কন্ট্রোলারেই পচে মরছে। আপনাকে দিয়ে হবে বলে আমার বিশ্বাস। তা ছাড়া ওয়ার্কারদের প্রতি মমতা আছে এমন মানুষই প্রোডাকশনে ভালো করে।

রাহুলের কফি খাওয়া হয়ে গেলে সে বললো, তাহলে আমার এখন কি করতে হবে?

যা করছিলেন করতে থাকেন। সামনের সপ্তাহে খায়রুদ্দিন আপনাকে জানাবে।

তাহলে এখন আসি!

আসেন।

জিএমের রুম থেকে বেরিয়ে ফ্লোরে আসতেই হেনার উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পেলো রাহুল। এ কদিনে তার প্রতি মায়া পড়ে গেছে রাহুলের। সম্পর্কটাও অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। কাছাকাছি হতেই উদ্বিগ্ন কন্ঠে হেনা বললো, জিএম কি বললো?

রাহুল মুখ গম্ভীর করে বললো, আমাকে দিয়ে নাকি কিছুই হবে না।

হেনার মুখটা সঙ্গে সঙ্গেই কালো হয়ে গেল।

তারপর অনিশ্চিত কন্ঠে বললো, কিন্তু আপনার রিপোর্ট তো ভালোই হয়েছিলো!

রাহুল বললো, কেউ আমার বিরুদ্ধে কিছু লাগিয়ে থাকবে হয়তো।

জাফরুল্লা কিছু বললো না তো?

হবে হয়তো।

এখন কি করবেন ঠিক করেছেন?

এখনো ঠিক করিনি। নতুন কোথাও জয়েন করতে হবে।

হেনা মুখ তুলতেই রাহুল দেখতে পেলো তার চোখ দু’টো যেন পানিতে টলমল করছে। হয়তো আর কিছুটা হলেই ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু গড়িয়ে পড়বে। সে বললো, আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন তো?

এবার রাহুল হেসে বললো, বলেন কি! আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবো না মানে? আজই আমাকে ঠিকানা দেবেন। বন্ধ পেলেই দেখা করতে যাবো।

হেনা হাতের কব্জিতে বাঁধা ছোট্ট ঘড়িটিতে সময় দেখে বললো, চলেন, আপনারে আজকে লাঞ্চ করাবো।

তার কন্ঠে যেন বিদায়ের সুর ধ্বণিত হয়।

তখনই সমস্ত ফ্লোর জুড়ে কেমন চাঞ্চল্য দেখা যায়। কারো কারো হাতে টিফিনের বাটি। আইসক্রিমের বক্স। কেউ কেউ বা এক কোণে গিয়ে জড়ো হচ্ছে। আবার অনেকেই বাইরে যাবার জন্য কোলাপসিবল গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়ে ভীড় করছে।

মোটামুটি ভালো একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে হেনা জানতে চায় কি খাবেন?

রাহুল নিজের পছন্দের কিছু বলে না। কারণ মনে মনে সে ঠিক করে রেখেছে যে, খাবারের বিল সেই পরিশোধ করবে। কাজেই হেনার নিজস্ব পছন্দের মেনু দেখতেও বলে, আপনার যা ইচ্ছে।

হেনা তাকে টেনে কেবিনের দিকে গিয়েও ফিরে এসে কোণের দিকে একটি টেবিলে বসে। শেষ টেবিল বলে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসতে হয়।

খাবারের অর্ডার হলে খাবার আসে। কাচ্চি বিরিয়ানী। সঙ্গে বোরহানী। রাহুল মনে মনে ভাবে অসাধারণ! সে নিজে হলেও এখন কাচ্চি বিরিয়ানীর কথাই বলতো। এমনিতেও হেনার অনেক কিছুর সঙ্গেই রাহুলের মোটামুটি মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও খাবারের দিক দিয়ে তেমন মিলের কথা জানা ছিলো না। আজ তাও জানা হয়ে গেল। বললো, এটা কি আপনার খুব পছন্দ?

খুব! মন যখন বেশি খারাপ হয় কিংবা কোনো কারণে খুব আনন্দিত থাকি তখনই এটা খাই। খেতে ভালো লাগে।

রাহুল খাওয়া আরম্ভ করতেই হেনা বললো, আপনি আমার বাসার ঠিকানা চেয়েছেন। ঠিকানা দিলে সত্যিই আসবেন তো?

ছুটি পেলেই আসবো।

কথা দিচ্ছেন?

কথা দিতে হবে কেন? আমি তো অবশ্যই আসবো।

না। এভাবে বললে হবে না। সত্যি করে, আমাকে ছুঁয়ে বলেন! বলে, হেনা টেবিলে রাখা রাহুলের কনুইটা ধরে।

রাহুল হেনার হাতটি কিছুক্ষণ ধরে রাখে চুপচাপ। ভাবে যে, ব্যাপারটা কেমন যেন নাটকীয় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হেনা যে মন থেকেই বলছে তা বুঝতে পারছে। মুহূর্তটিকে তার কাছে খুবই নাজুক বলে মনে হয়। হয়তো আজকের প্রতিশ্রুতির উপরই হেনার পরবর্তী দিনগুলোর অনেক কিছু নির্ভর করবে। এ ক’দিনে তার যা মনে হয়েছে, মেয়েটা প্রতারণা জানে না। মিথ্যে বলতেও শেখেনি। তাকে ঠকানোর অর্থ বিশাল কিছু। দিনে দিনে সে রাহুলের প্রতি আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এমনকি তাকে ঘিরে রাহুলের দুর্বলতার জন্ম হওয়াটাও বিচিত্র কিছু নয়। তাই সে হেনার হাতটা ধরে রেখে ভাবলো কিছুক্ষণ। আর ভেবেই বা কি হয়? সে কি ভেবে ভেবে সব কিছু করতে পারছে? হরিচরণ মাস্টার কি ভেবে ভেবে তাঁর সমস্যার সমাধান বের করতে পেরেছেন? নাকি পারবেন? তার জীবনেও বেশির ভাগ ঘটনাই বলতে গেলে অভাবনীয়। আর হেনার সঙ্গে যদি তার জীবনটা কোনোভাবে জড়িয়েই যায়। সেটাও কোনোদিক দিয়ে মন্দ হবে না। বরং সেটা তার প্রত্যাশিতই হবে। কিন্তু মানব জীবন বলে কথা। তার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপই অনিশ্চয়তায় ভরা। এমন একটি অনিশ্চিত জীবনে এত ভাবাভাবি আর এত হিসেব-নিকেশ, মাপজোকেরও কোনো ফলাফল নেই। কাজেই যেটা ঘটার সেটা ঘটবেই। আগেভাগে সেটাকে রোধ করার উপায় জানা থাকলে কিছু একটা করা যেতো। কিন্তু সব মানুষের সে ক্ষমতা নেই। তাই সে বললো, সত্যিই আসবো। মনে হয় আপনাকে না দেখে খুব বেশিদিন থাকতে পারবো না।

হেনার চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠলো ঘনঘন। পাতলা ঠোঁট দু’টো পরস্পর চেপে বসলো আরো। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে বললো, এইটা মনে হয় বাড়াবাড়ি হইলো।

একটুও না। আমি হুট করে কিছু বলি না। জীবনের প্রতিটা স্টেপেই আমাকে কষ্ট করতে হয়েছে। মানুষ চিনতে আমার ভুল কমই হয়।

তারপর সে হেসে বললো, আপনাদের এখানে জয়েন করার দু’দিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আর কিছু টাকা-পয়সার সঙ্গে কাঁথা-বালিশ ম্যানেজ করতে। রাতে রাতেই বাবা আমার জন্য মেয়ে ঠিক করে ফেললেন। জিপিএ সাড়ে চার পাওয়া মেট্রিকুলেট মেয়ে। বাপের একমাত্র সন্তান। বিষয়-সম্পত্তির দিক দিয়েও বলতে গেলে ধনী। কিন্তু শরিফ সাহেবের কাছে ঋণ আছে পাঁচ হাজার কথাটা আপনাকে আগেও বলেছি। সে টাকা প্রতিশ্রুতি মত শোধ করতে আর আমার পরবর্তী অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে মেয়েটিকে না জড়াতেই বাবার প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিয়েছি। একটি অশিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে বাকি জীবন কাটানো আমার জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে। সে কথা জানাতেও আমার দ্বিধা হয়নি। আসলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে রাখঢাক করে কোনো কথা বলতে পারি না। আপনাকেও তাই সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম।

হেনা মুখ নিচু করে খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে বললো, এ ক’দিনে আপনি আমার কতটুকু জানতে পারছেন? কী বা অনুমান করে নিছেন সেটা আপনিই জানেন। তবে, একজন মানুষ আলোতে দাঁড়াইলে তার অন্ধকার ছায়াটা যেমন মাটিতে পড়ে, ছায়াটার কারণেও মাটির খানিকটা ম্লান হইয়া যায়। আমারও তেমন একটা ছায়াচ্ছন্ন জীবন আছে। কাজেই মানুষ হিসাবে ভুল করবেন ভুল নাই। কিন্তু ভুলের মাশুল দিতেই যদি একটা লম্বা সময় পার হইয়া যায়, তা হইলে জীবনের থাকলো কি?

রাহুল হেনার কথার ভেতর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটুকু ধরতে পারলেও বলে, জীবনটা অনেক জটিল। এর সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িয়ে যেতে পারে। চলতে গেলে মানুষ হোঁচট খায়। জীবনে দু’একবার হোঁচট খায়নি এমন মানুষ খুব কমই আছে।

হোঁচট খাওয়ারও একটা জাত-পদ থাকে। বলেই যেন উত্তরের প্রত্যাশায় মুখ তুলে তাকায় হেনা। কিন্তু রাহুলের নিরবতায় সে আবার বলতে থাকে, কারো সামান্য ক্ষত হয়। কারো বা পায়ের বুড়া আঙুলের নখ উল্টায় যায়। এমন কি নখটা মারা গেলে সেখানে আর বাকি জীবনে নখ ওঠে না।

তবু তো ক্ষতটা শুকায়। তা ছাড়া মানুষটি যদি শৌখিন নারী হয়, সে হয়তো বাকি জীবনে পায়ের আঙুলে নেইল পলিশ লাগাতে পারবে না। এই যা অসুবিধা!

আপনের কথাও না! বলে অকস্মাৎ হেসে উঠলো হেনা।

এ পর্যন্ত তাকে খুব কমই হাসতে দেখেছে রাহুল। আর এমন নির্মল হাসি বুঝি এখনই হাসতে পারলো মেয়েটি। রাহুল বললো, সময় অনেক নষ্ট হয়েছে। এবার চটপট খেয়ে ফেলেন তো!

হেনা খেতে খেতে বলতে লাগলো, আমি যখন মাস্টার্সে ভর্তি হই, তার কিছু দিন পরই বাবা মারা গেলেন। ঠিক মত চিকিৎসা দিতে পারি নাই। সংসারে বড় সন্তান বলে আমিই সবচেয়ে বেশি অন্ধকার দেখতে লাগলাম। তা ছাড়া আমার বাবা-মা ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারেন নাই। সবগুলাই মেয়ে। সংসার কি করে চলবে? বাবা তো সরকারি চাকরি করতেন না। একটি বেসরকারি অফিসে অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন। কাজেই সংসারের সাধারণ নিয়মে তিনিই বিনা সঞ্চয়ে মারা গেলেন। তবে একটা সুবিধা ছিলো, শহিদবাগ আমাদের নিজেদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। চোখে অন্ধকার দেখলেও মায়ের হা হুতাশে আরো অন্ধ হয়ে যাই। একটি চাকরির জন্য পাগল হয়ে উঠলাম। পেলাম না। শেষে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে বিজ্ঞাপন দেখে দেখে ইন্টারভিউ দিতে লাগলাম। কিন্তু আমাকে কেউ চাকরিতে ডাকে না। শেষে বুঝতে পারলাম, ছাত্রী বলে কেউ চাকরিতে নিচ্ছে না। কারণ চাকরি পেলে হয়তো আমি আর পড়াশুনা করবো না। শেষে মাস্টার্সের কথাটা উল্লেখ না করেই ময়ূরীতে অ্যাপ্লাই করে দিলাম। তারপর থেকেই এখানে আছি।

রাহুল খুব মনোযোগ দিয়ে হেনার কথাগুলো শুনছিলো। আর হেনাকেও যেন কথায় পেয়ে বসেছে। সে আরেক গ্রাস খেয়ে এক ঢোক পানি খেয়ে আবার গ্রাস মুখে নেয়। চিবোতে চিবোতে বলে, প্রথম দিকে সামান্য কিছু টাকা বাবার অফিস থেকে পেয়েছিলাম। কিন্তু অনেক সদস্যের ঘর বলে তাতে বেশিদিন চালানো গেল না। একদিন মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন, আমাদের কি ভিক্ষে করতে হবে?

ততদিনে আমি কাজ শিখে গেছি। জিএম সাহেবকে বলেকয়ে বেতনটা বাড়িয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমার একার আয়ে সংসার চলে না। তিনহাজার টাকায় কি হয় বলেন? বেশ কিছু দিন আমরা লবন দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেয়েছি। পেঁয়াজ-মরিচ কিনতেও সাহস পেতাম না। অবস্থা খারাপ দেখে মা আবার বললেন, তোর বোনগুলোর লেখাপড়া বন্ধ। কদিন পর তো ওদের পরনের কাপড়ও থাকবে না। কেমন করে সামাল দিবি? শেষে আমার বাকি চার বোনকেও এখানে এনে ঢুকিয়ে দিলাম। সবার ছোট মিথিলা পায় পনের’শ টাকা। তার বয়স মাত্র এগারো বছর। কিন্তু কাগজে কলমে দেখাতে হয়েছে পনের বছর।

রাহুল চমকে উঠে বললো, কই ওদের কথা একদিনও বললেন না তো!

এই তো বলতে আরম্ভ করেছি।

রাহুলের খারাপ লাগলেও খুব বেশি খারাপ লাগেছিলো না। কারণ হেনার কষ্ট কোনো অংশেই রাহুলের চেয়ে বেশি নয়।

সে খাওয়া শেষ করে বললো, একটা টুথপিক নিয়ে আসি।

তখনও হেনার খাওয়া শেষ হয়নি। এ সুযোগে রাহুল কাউন্টারে এসে একটি টুথপিক নিয়ে দাঁতের ফাঁকে রাখে। আর বিল পরিশোধ করে দেয়।

ফিরে এসে আবার হেনার সামনে বসে বললো, ঠিকানা আজই দেবেন তো? এখন?

হেনা বোরহানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো, দিবো। এখনই দিবো।

খাওয়া শেষ করে হেনা বললো, মিথিলা একদিন বললো, তারে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট কইরা দিতে হবে।

মা অবাক হয়ে বললেন, কেন রে?

মিথিলা বলে উঠলো, বারে, ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাইতে হবে না! এখন সে মাসে মাসে পাঁচশ করে টাকা ব্যাঙ্কে জমাচ্ছে।

আসলে মানুষের জীবনে যেমন দুঃখ-কষ্ট আছে, তেমন আনন্দটাও আছে। আমরা বোনেরা যখন বাড়ি ফিরি। মা’কে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াই। মা যেন তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান।

তারপর হেনা মাথা নাড়াতে নাড়াতে খাবার মাখতে মাখতে বললো, আমার দুখিনি মা। সারাদিন ঘরে মুখ বুঁজে পড়ে থাকেন। আমরা ফিরলেই কেবল তার হাসিমুখ দেখতে পাই।

খায়রুদ্দিন বললো, রাহুল সাব লেখাপড়া জানার কত সুবিধা দেখেন! হেলপার থাইক্যা কাজ শিখতে শিখতে আমি এ পোস্টে আসলাম। এতদূর আসতে আমার ষোলো বছর সময় লাগছে। আর আপনের মনে হয় ষোলো সপ্তাহ লাগবে না।

রাহুল বললো, হয়তো ষোলো বছরেও পারতাম না। আপনারা আন্তরিকতা নিয়ে শিখাচ্ছেন বলেই না ব্যাপারগুলো আমার জন্য সহজ হয়ে উঠেছে।

আমাদের জিএম সাহেবও আমার কাছে একদিন কাজ শিখেছেন। হয়তো একদিন আপনেও এজিএম-জিএম হইবেন। কিন্তু আমার এখানেই শেষ। আর্মিতে দেখেন না, যারা বিএমএ লংকোর্সে ঢুকতে পারে না, সিপাহি থাইক্যা অফিসার হয় তাদের দৌঁড় ওই সুবেদার মেজর পর্যন্ত। পুরাপুরি মেজর কোনোকালেই হয় না।

হয়তো কোনোদিন মালিক হবেন!

মালিক হইতে শিক্ষার দরকার লাগে না। টাকা লাগে। কিন্তু জিএম হইতে গেলে শিক্ষা খুবই জরুরি। শিক্ষিত মানুষদের টাকা-পয়সার অভাব থাকতে পারে। কিন্তু তারা মনের দিক দিয়া খুব একটা নিচু মানের হয় না মনে হয়। কথায় কয় মূর্খ মানুষের কাছ থাইক্যা সম্মান পাওনের থাইক্যা জ্ঞানীর লাত্থিও উত্তম!

রাহুল বুঝতে পারে খায়রুদ্দিনও শিক্ষিত কম নয়। হয়তো বা সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পায়নি। কিন্তু তার চারদিক থেকে যে জ্ঞান আহরণ করেছে তা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। তবুও আমাদের অনেকেই নিজের অগাধ পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে এমন কিছু কথা বলে ফেলেন যে, তখন মনে হয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কেবল আসা-যাওয়াই করেছেন। ভারী ভারী বই থেকে পড়া মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দিয়ে এসেছেন। আর সে সুবাদে ভালো ফলাফল নিয়ে বেরিয়ে এলেও মূল সঞ্চয় কিন্তু মূর্খতারই নামান্তর।

রাহুল তার কাজের ব্যস্ততায় হেনার সঙ্গে দেখা করতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে যেন তড়পাচ্ছিলো প্রতিদিন। মনের ভেতর হেনাকে সত্যি কথাটা না বলার জন্য এবং হেনার ভুল ভাঙিয়ে না দেয়ার জন্য কিছুটা অপরাধ বোধেও ভুগছিলো। সেদিন বিদায়ক্ষণ ভেবে হেনা যখন তাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিলো তখন সত্যি কথাটা কেন যে বললো না তা কিছুতেই তার বোধগম্য হচ্ছে না। এখন কি আর ভুল শোধরানোর সময় আছে? হেনা যদি বেঁকে বসে? যদি ধরেই নেয় সে তাকে প্রতারণা করেছে? মেয়েটা তাহলে আরো বেশি কষ্ট পাবে। তবে একটি মিথ্যেকে ঢাকতে তাকে আরেকটা মিথ্যে বলতে হবে? তা ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায়ও নেই। এটুকু মিথ্যে তাকে বলতেই হবে যে, জিএম সাহেব তাকে খানিকটা শাস্তি দিয়েছেন।

পরদিন সাড়ে দশ কি দশটার দিকে মনেমনে সে ভাবছিলো যে, কিছুক্ষণ পরই খায়রুদ্দিন বেরিয়ে গেলে সে সরাসরি হেনার সঙ্গে দেখা করবে নয়তো কাউকে দিয়ে এখানে ডেকে পাঠাবে। ঠিক তখনই কিছু ভাঙচুরের শব্দ তার কানে আসে। কানে আসে মেয়েদের আর্তনাদ। কি হচ্ছে এসব? সে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় খায়রদ্দিনের দিকে। খায়রুদ্দিন বললো, চলেন তো দেখি!

কিন্তু বেরোতে গিয়ে ওরা আতঙ্কিত মেয়েদের ভীড় ঠেলে সামনের দিকে এগোতে পারলো না। তার ওপর কিছু মেয়ে তাদের পথ রোধ করে বললো, সামনে যাইয়েন না। সব কিছু ভাইঙ্গা ফালাইতাছে। আগুনও মনে হয় লাগাইছে।

খয়রুদ্দিন এগোতে চেষ্টা করেও পারে না। এতগুলো মেয়েকে ডিঙিয়ে যাওয়া অসম্ভব! কিন্তু মাথা উঁচু করে হলুদ হেলমেট পরা কতগুলো কঠিন চেহারার লোককে বেরিয়ে যেতে দেখলো। গায়ে সাদা টি-শার্ট। পরনে কালো প্যান্ট।

রাহুলও হয়তো দেখছিলো। ত্রিশ জন বা তারও বেশি হবে। সে বললো এরা তো মনে হয় আর্মি বা পুলিশের লোক। না হলে এতটা সাহস হওয়ার কথা না। ফ্যাক্টরির ভেতর আজকের হাজিরা অনুযায়ী তিন’শ পঁচাত্তর জন কর্মী আছে। সবাই জাপটে ধরলেও কেউ বেরিয়ে যেতে পারে না। প্রশিক্ষিত না হলে এমন দু:সাহসী কর্ম সম্ভব নয়। কারা এরা? কে পাঠালো এদের?

খায়রুদ্দিনের চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠে বললো, আজকে আমার ফ্লোরের শিপমেন্ট হওয়ার কথা আছিলো!

ঘন্টা খানেকের ভেতর খবর পাওয়া যায় যে এ গ্রুপটি আরো কয়েকটি ফ্যাক্টরিতে একই কায়দায় হামলা চালিয়েছে। উত্তরা বনানী মগবাজারের অনেক ফ্যাক্টরিই ক্ষতিগ্রস্ত। যেভাবে ভাঙচুর চালিয়েছে, দু এক সপ্তাহের ভেতর নতুন যন্ত্রপাতি আনলেও কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। কিন্তু ঘটনার পেছনে কার এমন শক্তিশালী হাত কলকাঠি নাড়লো? বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী বা সামরিক বাহিনীর প্রধান এমন কাজ করাতে পারেন না। তাহলে?

সবাই বলাবলি করতে লাগলো, এই দেশে একটা লোকই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান। হাওয়া ভবনে বসে যে সব ধরনের ক্ষমতার হাওয়া খাচ্ছে। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সে হাত বাড়ায়নি। কিন্তু কেন? ভেতরে ভেতরে ঘটছে কি? রাহুলের প্রশ্নে অনেকেই হকচকিয়ে যায়। কিন্তু জবাব দিতে পারে না কেউ।

খায়রুদ্দিন হঠাৎ করেই মাথা তুলে বললো, আমার ওয়ার্কারগুলার কী উপায় হইবো? তারপরই সে মেঝেতে শুয়ে পড়লো কিংবা জ্ঞান হারালো বলতে পারবে না। মেয়েরা তাকে ধরাধরি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে গেল। আগুন নিভিয়ে ফেললেও চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কাশতে কাশতে রাহুল কোনো রকমে নিচে নেমে এলেও খায়রুদ্দিনকে দেখতে পায় না। জিজ্ঞেস করেও কারো কাছে সদুত্তর পায় না।

কিছুক্ষণ পর বাকি যারা উপরে ছিলো তাদেরও নিচে নামিয়ে দিয়ে ফ্যাক্টরির গেট বন্ধ করে দিয়ে নোটিশ টানিয়ে দয়া হলো যে, অনির্দিষ্ট কালের জন্য ফ্যাক্টরি বন্ধ। সবার ভেতরই একটি হায় হায় রব উঠলো যেন।

রাহুলের তখনই মনে হলো হেনার কি হবে? তার বোনেরা? তাদের পরিবার চলবে কি করে? শুধু কি হেনা, রাস্তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হতাশার ছায়াক্লিষ্ট মেয়েদের দিকে তাকিয়ে রাহুলের মনে হয়, প্রত্যেকেই যেন হেনা। একজন হেনা যেন শত মুখ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে রাস্তায় আর ফুটপাতে।

পরদিন মোটামুটি সবগুলো দৈনিক পত্রিকায়ই শিরোনাম হলো হলুদ হেলমেট সাদা টিশার্ট আর কালো প্যান্টের গ্রুপটির কথা। তারা নাকি আশুলিয়ায় সংঘবদ্ধ হয়। কিন্তু সম্পাদকীয়তে এমন কি কোনো কোনো সাংবাদিকও প্রশ্নটা রেখেছেন যে, ওরা যখন ট্রাকে করে শহরের দিকে আসছিলো টহল পুলিশ কি করলো? সরকারের নতুন বাহিনী র‌্যাবই বা কী করছিলো তখন? একখানে হামলা চালিয়ে তারা যখন অন্যখানে যাচ্ছে তখনই কেন তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না। এমনি নানা রকম প্রশ্নবিদ্ধ সংবাদ প্রকাশ হলেও কেউ আড়ালের মানুষটির সম্পর্কে কিছু বললো না। নেপথ্য কারণ চাঁদাবাজির কথা বললেও চাঁদাবাজের নাম কেউ প্রকাশ করলো না।

আব্দুল হাকিম বললো, অখন কী করমু? কোনদিন ফ্যাক্টরি খুলবো তার তো ঠিক নাই। নতুন চাকরি ভাও না করলে তো রাস্তা দেখি না!

রাহুল পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে ভাবছিলো, তার কি করণীয়? সে তো তেমন কোনো কাজই শিখতে পারলো না। তাকে কে চাকরি দেবে? আবার কি শিক্ষানবীশ হিসেবে ঢুকবে? তখনই আব্দুল হাকিম বলে উঠলো, আমি ভাবতাছি দেশের বাড়ি থাইক্য ঘুইরা আসলে পারি। আপনে কি এহানেই থাকবেন?

রাহুল চমকে উঠে বলে, নাহ। ভাবছি আমিও দেশের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

চাবি লগে নিয়া যাইয়েন। আমি না থাকলেও আপনে থাকবেন। ঠিকমতন ভাড়াটাড়া দিয়া দিয়েন। মালিক তেমন খারাপ মানুষ না।

তারপরই আব্দুল হাকিম ব্যাগ গোছগাছ করতে থাকে।

রাহুল সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। হয়তো তাকিয়েই থাকে। তেমন কিছু হয়তো দেখে না। সে ভাবে হরিচরণ মাস্টার তাকে বলেছিলেন, যে বেতন পাবে তাতে সে নিজে চলতে পারবে কি না! কিন্তু সে তো এখনও বেতনই পায়নি। আর তখনই সে হেসে উঠলো। আর তার হাসি শুনে চমকে উঠে আব্দুল হাকিম বললো, হাসেন ক্যান?

এমনিই। আমার ভাগ্যের সঙ্গে হাসি।

বাড়ির পথে থাকতেই তার সঙ্গে দেখা হয় আজমলের। তাকে দেখতে পেয়েই আজমল ছুটে এসে বললো, এত দেরি করলি?

রাহুল অবাক হয়ে বলে, কি হয়েছে? বাড়ির সবাই ভালো আছে তো?

হরিচরণ স্যার নেইরে! বলেই কেঁদে উঠলো সে।

রাহুলের বুকের ভেতরে কোথাও যেন ধ্বক করে কিছু একটা পতন হয়। কি হয়েছিলো স্যারের?

কাকি তো বলতে পারছেন না কিছু। গত বুধবার রাতের বেলা একটি মুখবন্ধ খাম কাকির হাতে দিয়ে নাকি বলেছিলেন চিঠিটা যত্ন করে রাখতে। যেদিন তুই গ্রামে আসবি তখনই যেন তোর হাতে দেয়। তারপর রাতে নাম জপটপ করে নিয়ম মত শুয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ভোরের দিকে জেগে না উঠলে কাকি স্যারকে জাগাতে গিয়ে দেখেন শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে।

কি আছে চিঠিতে?

কাকি বলতে পারছেন না। চিঠি তিনি পড়েননি।

তুই যাচ্ছিস কোথায়?

আজমল চোখ মুছে বললো, বাজারে। কাকির জন্য তরকারি আনতে। তিনি তো এখন নিরামিষ ছাড়া কিছু খান না।

আচ্ছা যা। পারলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস।

রাহুল প্রথমেই হরিচরণ মাস্টারের বাড়ি এসে উপস্থিত হয়। সে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই অনেকগুলো অচেনা মুখ দেখতে পায়।

এরা কারা? তাহলে আজমল কি এদের কথা জানে না?

তাকে দেখতে পেয়ে একজন মাঝ বয়সী লোক বলে উঠলো, তুমি কে? না বলে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লে যে!

আমি এ গ্রামেরই ছেলে। কিন্তু আপনি কে? আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হয় না!

আরে বলছে কি দেখ না! আমার আত্মীয়ের বাড়িতে আমাকেই বলছে আমি কে? জানো এখন থেকে আমি এ বাড়ির খানিকটার মালিক! জানো তো হরিচরণ মাস্টারের ছেলেপুলে কেউ ছিলো না। আমরা নিকটাত্মীয়রাই এখন তার সব কিছুর অধিকারী।

তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে আগে জানতে হবে আপনারা কেমন আত্মীয়! কাকি কোথায়?

রাহুলের কন্ঠের সাড়া পেয়েই হরিচরণ মাস্টারের বিধবা স্ত্রী বিভাবতী ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন রাহুলকে। বাবা, আমার তো সবকিছুই শেষ হয়ে গেল! আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কে রইলো আমার?

সাদা পাড়হীন ধূতি পরনে হরিচরণ মাস্টারের স্ত্রীকে দেখে রাহুলের সত্যি সত্যিই কান্না পাচ্ছিলো। তবুও কোনো রকমে কান্না সামলে বললো, কে বললো আপনার কেউ নেই। এই যে এরা আছেন। আপনাদের আত্মীয়!

তখনই তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে এক দলা থুথু ফেলে বললেন, এরা আত্মীয় না শকুন! ভাগারে এসেছে মরা খেতে। এতটা বছর ছিলো কোথায়? দূর কর এদের! এখানে ওদের কোনো কাজ নেই!

মাঝবয়সী লোকটি শকুনের মতই হাসতে হাসতে বললো, বউদি, আমাদের তুমি কোনোভাবেই তাড়াতে পারবে না। গায়ের জোরে তাড়ালেও আমি আবার আসবো। আমার পাওনা থেকে কোনো আইনেই আমাকে ঠেকাতে পারবে না।

রাহুল হরিচরণ মাস্টারের স্ত্রীকে নিয়ে ঘরে গেলে তিনি বললেন, তোর একটা চিঠি আছে। বলেই তিনি কাঠের আলমারিটা খুললেন। কিন্তু অবাক হয়ে বললেন, এখানেই তো ছিলোরে!

তারপরই তিনি ঘরের ভেতর বসে থাকা দু’জন মহিলার দিকে ফিরে বললেন, শকুনের দল চিঠিটা কি করেছিস ভালোয় ভালোয় দিয়ে দে। এই কিছুক্ষণ আগেই এখানে দেখেছি আছে। তোদের ছাড়া ঘরে তো আর কেউ ছিলো না!

মহিলা দু’জন তেমনি গলার পর্দা চড়িয়ে বললো, যা দেখনি তা বলছো কি করে?

এই কিছুক্ষণ আগেই আমি দেখেছি।

তোমার মাথা এখন ঠিক নেই। কোথায় রাখতে কোথায় রেখেছো ভেবে দেখ!

রমলা, আমার মাথা এতটা খারাপ হয়নি তোদের যতটা হয়েছে!

রাহুল এখানে এসেছে জানতে পেরে কৌতুহলী অনেকেই এসেছে চিঠির ব্যাপারটা জানতে। কারণ ব্যাপারটা অনেকেই শুনেছে। তিনি নাকি কেঁদেছেন আর চিঠির কথা বলেছেন।

রহিম বক্সও কি কারণে এ বাড়ির পাশ দিয়েই যেতে যেতে হইচই শুনে ঢুকে পড়েছেন।

তিনিও নবাগতদের দেখে কিছুটা অবাক হলেও মাঝবয়সী লোকটিকে দেখে চিনতে পেরে বলে উঠলেন, কিরে কালিচরণ? তুই এ বাড়িতে কি মনে করে? তুই না তোর অংশ মাস্টারের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চলে গিয়েছিলি?

গিয়েছি তো হয়েছে কি? দাদার তো ছেলেপুলে নেই। এখন তার সব কিছুই আমার।

মানলাম তোরই সব। কিন্তু তোর বউকে বল চিঠিটা বের করে দিতে। নইলে সবার সামনে কাপড় খোলাবার ব্যবস্থা করবো।

তখনই রমলা লাফিয়ে উঠে বাইরে এসে বললো, দেখছো কি? মান সম্মান থাকতেই এ বাড়ি থেকে বেরোও।

রহিম বক্স বললো, মান সম্মান থাকতেই চিঠিটা আগে বের করে দাও। তোমাদের ইতিহাস এ গ্রামের সবাই কমবেশি জানে।

বকশি দাদা আমাদের কি অপমান না করলেই নয়?

আমরা জানি মাস্টারের স্ত্রী মিথ্যে বলবে না।

তাহলে কি আমরা মিথ্যে বলছি।

কিছুক্ষণ পরই বুঝতে পারবে কে মিথ্যে বলছে। তারপরই রহিম বক্স চিৎকার করে উঠলেন, এই তোমরা সবাই মিলে এদের তিন জনকে আগে দড়ি দিয়ে বাঁধো। চকিদার দিয়ে তিনজনেরই কাপড় খোলাবো!

তখনই রমলা তার ব্লাউজের ভেতর থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো চিঠিটা বের করে মাটিতে ফেলে দিলো।

রহিম বক্স চিঠিটা তুলে হাতে নিয়ে কালিচরণকে বললেন, মার খাওয়ার আগেই তোরা এ বাড়ি থেকে বের হ।

কালিচরণ তার স্ত্রীর হাত ধরে টানতে টানতে বললো, চলে এসো। যেদিন আইন করে এ বাড়িতে এসে উঠতে পারবো তখন এর শোধ তুলবো।

যা যা। তোর চেয়ে মাস্টার কম আইন জানতো না। তোকে সে ভালোমতই জানে। আর জানে বলেই বার বাড়ির কুকুর বাইরে রেখেছে!

তারপর রাহুলকে ডেকে চিঠিটা হাতে দিয়ে রহিম বক্স বললেন, চিঠিতে কি আছে পড়।

রাহুল বললো, আপনিই পড়েন কাকা।

রহিম বক্স চিঠি খুলে জোরে জোরে পড়তে লাগলেন।

বাবা রাহুল

পত্রে আমার আশীর্বাদ জানিও। যখন এই পত্র তোমার হাতে পড়িবে তার আগেই হয়তো ইহধাম ত্যাগ করিব। আমার প্রিয়জনদের কারো মনই তখন হয়তো ভালো থাকিবে না। কিন্তু জগতের অনেক কিছুই মন খারাপের কারণে থামিয়া থাকে না।

প্রত্যাশা করি তুমিও তোমার চাচির মত ভাঙিয়া পড়িবে না। এ বিশ্বাস আমার আছে। আমি জানি আমার চল্লিশ বৎসরকাল যাবত শিক্ষকতার জীবনে একমাত্র তোমাকেই দেখিয়াছি শত ঝড়-ঝাপটা আর বাধা বিঘ্নে অবিচল। খানিকটা মাথা গরম হইলেও চিন্তা-ভাবনায় স্থির। তুমি আজ যাহা ভাবিতেছ অন্যরা হয়তো বা আরো দীর্ঘকাল পরে তা নিয়া ভাবিতে আরম্ভ করিবে। কাজেই যুগের চাইতে অগ্রবর্তী এসব চিন্তা-ভাবনা তোমার সমসাময়িক কাহারো পছন্দ না হইলেও বলি, ভাঙিয়া পড়িও না বা চলা থামাইয়া দিও না। জানিয়া রাখিও তুমিই সবার চেয়ে অগ্রগামী। তাই তোমার চিন্তা ভাবনাও অনেক সময় আমার মত বয়োবৃদ্ধকেও বেশ খানিকটা প্রভাবিত করিয়াছে।

একদিন বলিয়াছিলে যে, চারপাশের সব কিছু কেমন কঠিন আর দুর্বোধ্য মনে হয়। অনেক ভাবিয়া দেখিয়াছি, তোমার ওই সামান্য কথার পিছনে কতবড় ঘটনা আত্মগোপন করিয়া আছে। আমি স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি দিনে দিনে মানুষের মনুষ্যত্ব ক্রমশ লোপ পাইতেছে। মানুষ তার আপন চাহিদাকেই সব কিছুর উর্ধে স্থান দিবে। সম্পর্কের চাইতে স্বার্থ বড় হইয়া দেখা দিতেছে। নিজের গুণকীর্তন করাইতে লোকে মানুষ ভাড়া করিতেও লজ্জা বোধ করে না। আমার চতুস্প্বার্শের মুখগুলিকে এতকাল পর হঠাৎ করিয়া আর আপন মনে করিতে পারিতেছি না। এমন কি তোমাকেও আমার আপন মনে না হইলেও তুমি দায়িত্ববান ছেলে বিধায় তোমার চাচি শ্রীমতি বিভাবতী বন্দ্যোপাধায়ের ভার লইতে অনুরোধ করি। আর আমার সমুদয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি রণদীপ মুহুরীর হাতে দানপত্র তৈরী করাইয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করিয়া তোমার নামে করিয়া দিলাম। আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন এ সম্পদ সমূহের কিয়দংশও দাবী করিতে পারিবে না। মুহুরীর নিকট হইতে দলিলের নকল সংগ্রহ করিয়া তোমার নামে নাম জারি করাইয়া স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, পৌত্র-পৌত্রাদি নিয়া ভোগ দখল ও দান বা বেচা-বিক্রি করিতে রহ। আমার এই দানপত্রের কথা রহিম বক্সও জানেন। তাহার সহিত আমার কথা হইয়াছে যে, তুমি অত্র বিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষক হিসাবে যোগ দিবে। অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো শিক্ষিতা নারীকে বিবাহ করিবে যিনি সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে একই বিদ্যালয়ে যোগ দিতে পারেন। বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সঙ্গেও আমার এমন কথাই হইয়াছে। প্রত্যাশা করি তাহারা আমার কথা ফেলিবেন না।

আরেকটা কথা এই যে, কেন আমি এমন একটি কর্ম করিয়া মৃত্যুকেই উত্তম বলিয়া জ্ঞান করিলাম আশা করি সেই প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া আমার পরকাল কণ্টকিত করিবে না। যদিও তুমি ইহার নেপথ্য কারণ খুব ভালোমতই অনুধাবন করিতে পারিতেছ। তবুও ইহা লইয়া অনাবশ্যক বিতর্কের সৃষ্টি করিও না।

এ পর্যন্ত পড়ার পর মুখ কালো করে রহিম বক্স তাকালেন রাহুলের দিকে। বললেন, ভেবেছিলাম সম্পত্তিগুলো স্কুলের নামে দানপত্র হবে।

তারপর তিনি চিঠিটি রাহুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, যে সম্পদ পেয়েছো তাতে দুই পয়সার মাস্টারি কেন করবে? আরো বড় কিছুতেও হাত দিতে পারবে।

রাহুল চিঠিটি হাতে নিতেই রহিম বক্স হন হন করে হরিচরণ মাস্টারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আট-দশদিন পর স্কুল পরিচালনা পরিষদের সভায় রাহুলকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, তার পিটিআই বা বিএড প্রশিক্ষণ করা নেই। তার ওপর শিক্ষকতার তেমন কোনো অভিজ্ঞতাও তার নেই। কাজেই তাকে স্কুল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে নানা জনে নানা কথা বলবে। তা ছাড়া তার কারণে শিক্ষা দানের মানও ক্ষুন্ন হতে পারে।

আজমল বললো, আসল কথা কিন্তু তা না।

রাহুল অবাক হয়ে তাকায় আজমলের মুখের দিকে। আসল কথাটা তাহলে কি?

আজমল হেসে বললো, রহিম বক্স তোকে জামাই বানাতে চেয়েছিলো। কিন্তু তুই রাজি হলি না। তার ওপর হরিচরণ স্যার যখন তাদের সঙ্গে দানপত্রের ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন তখন রহিম বক্স ভেবেছিলো স্যার স্কুলের নামে সব দিয়ে দেবেন। আমি এমনও শুনেছি যে, স্কুলের সঙ্গে স্যারের চার বিঘা জমি পেলে তিনি মার্কেট করার চিন্তা ভাবনা করছিলেন। এমন কি নকশা নিয়েও কোনো এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আলাপ করে এসেছেন। তোর আর স্যারের কারণে লোকটার দু’টো পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেল। কাজেই তোদের কোনো কাজে আর তার সহযোগিতা পাবি না।

রাহুল বললো, কেউ যদি কাউকে সহযোগিতা না করে তাই বলে কোনো কিছু কিন্তু আটকেও থাকে না।

আজমল আরো জানালো রুহুল হয়তো জিন্নাত আরাকে বিয়ে করবে। সে কারণেই দু’জন পিটিআই ট্রেনিং করছে। বিয়ে করে একই স্কুলে মাস্টারি করবে।

তুই কার কাছ থেকে শুনলি?

কথা কি আর গোপন থাকে? মেয়েদের আড্ডায় অনেক গোপন কথাই আলোচনা হয়। আর এভাবেই আমার বউয়ের কাছ থেকে ব্যাপারটা জেনেছি।

রাহুল অবাক হয়ে বললো, তুই বিয়ে করেছিস শুনিনি তো!

তুই কি আর বাড়ি-ঘরে আসিস যে জানবি?

কাকে করলি? নাসিমা নাকি ফাতেমাকে?

ফাতেমাকে।

নাসিমা তো ফাতেমার চেয়েও সুন্দরী।

নাসিমার প্রেমিকের অভাব ছিলো না। আমার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও ইয়াসিনের সঙ্গে সিনেমায় যেতো। এক সঙ্গে ছবিও তুলেছে। আকবরের সঙ্গে একই রিকশায় ক’দিন পর পরই তাকে ঘুরতে দেখা গেছে।

রাহুল আজমলের কথা শুনে আরো অবাক হয়ে যায়। এমন মেয়ে কি আছে আরো? তাহলে ছেলেরাই কেবল এমন হয় না!

বিভাবতী রাহুলকে বললেন, আজমলের সঙ্গে কি কথা হলো? স্কুলে তোর চাকরি হলো?

না চাচি। স্যার মনে হয় আমার নামে সম্পত্তি লিখে দিয়ে ভালো করেননি। যদিও বিশ্বাস করি স্যারকে ওরা কথা দিয়েছিলো, কিন্তু এখন সুর পাল্টে ফেলেছে। মনে হয় আমি তাদের শত্রু হয়ে উঠেছি।

বিভাবতী আঁচলে চোখ মুছে বললেন, উনি তোকে খুবই ভালোবাসতেনরে! মাঝখান দিয়ে তুই যখন অনেকদিন বাড়ি আসিসনি তখন কীযে ছটফট করতেন! মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে বলে উঠতেন ছেলেটার হলো কি? হাফিজটাও কোনো খোঁজ-খবর নেবার কথা ভাবছে না নাকি? তিনি চাইতেন তুই যখন তার আদর্শেই বেড়ে উঠেছিস, তার মত করেই স্কুল আর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসবি। কিন্তু স্বার্থে আঘাত লাগলেই মানুষের সত্যিকার চেহারা বেরিয়ে পড়ে। তুই এত ভাবিস না বাবা। দরকার হলে আমরা এ গ্রামে কলেজ বানাবো। তুই সে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হবি! রহিম বক্স যদি এইট পাশ হয়ে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হতে পারে, তুই তো এমএ পাশ। তাদের কার থেকে কম?

রাহুল বললো, চাচি, অশিক্ষিত আর শিক্ষিত মানুষদের মূল পার্থক্যটা এদিক দিয়েই বেশি। একজন অশিক্ষিত মানুষ চেষ্টা করবে কী করে সে নিজকে অন্যদের চোখে বড় করে তুলবে। তার সব কিছুতেই এমন একটি চেষ্টা থাকে যে, সে কারো অংশে কোনোদিক দিয়ে কম নয়। আমিও যদি গ্রামের মানুষদের দেখাতে চেষ্টা করি যে আমি রহিম বক্সের চাইতে কম নই, তাহলে কিন্তু সেটা মূর্খতাই হবে। মহৎ কিছু হবে না। যার ভেতরের দিকটা মলিন, তারই বাইরের দিকটা ঝকঝকে করার প্রয়োজন হয়।

কিছু একটা তো তোকে করতে হবে। বেঁচে থাকতে হলে, সংসার-কর্ম করতে হলে কিছু একটা অবলম্বন চাই। তুই ছাড়া আমাকে আর কে দেখার আছে, বল? তোকে এখানে থাকতে হলে তো কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে!

আমি তা নিয়ে ভাবছি না। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। স্যার আমাকে যখন দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটা যে ভাবেই পারি ঠিক রাখবো। তার আগে স্যারের শ্রাদ্ধকর্মটা শেষ করা দরকার বলে মনে করি। আপনাদের কার্তিক ঠাকুর এ ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।

না না বাবা! শকুনের পেছনে খরচ করার কোনো প্রয়োজনই নেই। উনি এসব কিছুই মানতেন না। বিশ্বাসও করতেন না। তারচেয়ে ভালো হবে কোনো সৎ কর্মে ব্যয় করলে।

এমন কী সৎ কর্ম আছে, যে ব্যয় করতে পারি? রামকৃষ্ণ মিশনে টাকা দেবো?

ও তো সেই ধর্মীয় কাজই হয়ে গেল। মানুষের কাজে আসে এমন কিছু কর।

আমার তো ভাবনায় আসছে না।

সময় হলে দেখা যাবে। এখন এসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আগে আমার ঘরদোর ঠিক করে দে। চারদিকে দেয়াল করে সবার থেকে আমাকে আড়াল করে দিয়ে যা। এখন তো আর আমার জন্য ভাবনা নেই। তুই যাতে এখানে নিরাপদে বাস করতে পারিস সেটাই এখন আমার প্রধান ভাবনা।

বিভাবতীর কথা শুনে রাহুল চুপ করে থাকে। একবার ছোট থাকতে পড়া না করার অপরাধে বেত মারার জন্য হরিচরণ স্যার তাকে হাত পাততে বলেছিলেন। রাহুল তখন দু’হাতই স্যারের সামনে মেলে দিয়েছিলো। বেত দিয়ে হাতের তালুতে মারতে চেয়েও তিনি থেমে গিয়েছিলেন। চোখ দু’টো বড়বড় করে বলেছিলেন, তোর তো খুবই অসাধারণ ভাগ্যরে!

তারপরই কেমন বিরস মুখে বলেছিলেন, কিন্তু জন্মভূমি বা পৈতৃক ভিটেতে তোর বাস করা হবে না!

হয়তো সেদিন থেকেই স্যারের স্নেহাধিক্য তার প্রতি দিনদিন বেড়েছে বৈ কমেনি। স্যারের কথা ঠিক হলে এ গ্রামেও সে বাস করতে পারবে না। এ দেশেও নয়। তাহলে কি সে উদ্বাস্তু?

বিভাবতী বললেন, কি নিয়ে এত ভাবছিস বাবা, আমাকে বলা যায়?

যায়। ভাবছি এখানকার সব বিক্রি করে দিয়ে টাকাগুলো আপনার নামে ব্যাঙ্কে রেখে দেবো। মাসে মাসে আপনার হাতে নির্দিষ্ট একটা অংক এলো। আপনারও খরচের বা চলার সমস্যা হবে না।

বলিস কি তুই! স্বামীর ভিটে ছেড়ে চলে যাবো?

ভিটে বিক্রির কথা ভাবছি না।

তোর বউ না থাকলে আমাকে দেখবে কে? শেষকালে কি আমি একা ঘরে জলপিপাসায় মারা যাবো?

তাও হবে না চাচি। সব ব্যবস্থা হবে। আপনার কোনোদিক থেকে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে ব্যবস্থাই আমি করবো।

কর। যা ভালো বুঝিস কর। আমার নিজের খরচের টাকার জন্য ভাবিস না। ওটার ব্যবস্থা উনি নিজেই করে দিয়েছেন। তার আগে শ্রাদ্ধের টাকাটা তুই কোথাও দান করার ব্যবস্থা কর। রাতে খুবই একা মনে হয়। ভয়ও হয়। ভাবছিলাম কাউকে এখানে নিয়ে এলেই পারি।

সেটাই ভাবছি। এমন কেউ কি নেই যে খাওয়া-পরার দিক দিয়ে বাকি জীবনটা স্বস্তিতে থাকতে চায়? তাহলেও একটা আপাতত সমাধান হয়।

বিভাবতী কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, তাহলে তো আমাকে আমার বাবার বাড়ি যেতে হবে। শুনেছি কার্তিক ঠাকুরের মেয়েটা আর বিয়ে থা করবে না। জপ-তপ আর ধ্যান-পূজা নিয়েই থাকতে চায়। কিন্তু কার্তিক ঠাকুর আবার উঠে পড়ে লেগেছে তাকে বিয়ে দিতে। মাসখানেক আগে একবার তোর স্যারকে এসে ধরেছিলো মেয়েটা। অনেক কান্নাকাটি করেছিলো।

রাহুল বললো, কোন মেয়েটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কে বিধবা হয়ে ফিরে এসেছে তাও জানি না।

ছন্দার কথা শুনিসনি? বছর খানেক তো হয়ে গেল।

কার্তিক কাকার সঙ্গেও কথা বলা যায়। কিন্তু তিনি কি রাজি হবেন?

হবে না কেন? অভাবের সংসারে একটা মেয়ে বসে বসে খেলে তার জোগান দিতে হবে না? তারও তো ছেলে-মেয়ে কম নেই। যদি রাজি না হয় তাহলে বলবো, তার মেয়েটাকে বাকি জীবনের জন্য আমাকে দিয়ে দিলেই তোর স্যারের শ্রাদ্ধ ছোট্ট করে করাবো। বাড়িতে ঠাকুরও বসাবো। প্রতি সপ্তাহে এসেও সে জজমানি করতে পারবে।

সে বললো, এ কথা শুনলে অভাবী পুরোহিত কার্তিক ঠাকুর এক কথায় রাজি হয়ে যেতে পারেন।

হতেই হবে। এ গ্রামে কয় ঘর আর হিন্দু আছে? আর থাকলেও ওই কালিপূজা আর দূর্গাপূজার সময় ছাড়া কেউ তাকে পোছেও না!

রাহুলের মনে হলো বিভাবতী চাচি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি।

রাহুল গ্রামে হেঁটে হেঁটে তার আত্মীয়-স্বজন আর পুরোনো পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করতে আর আলাপ করতে করতে ঘুরে বেড়ায়। পুরোনো সম্পর্কগুলো এ কদিনেই যেন বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু তার এ জনসংযোগ রহিম বক্স আর চেয়ারম্যান রশিদের ভালো লাগেনি হয়তো। ব্যাপারটাকে তারা তাদের ভবিষ্যত সংকট বলেই বিবেচনা করলো। তাই তারা প্রচার করতে আরম্ভ করলো যে, রাহুল আগামীতে চেয়ারম্যান হতে চায়। কিন্তু সে যদিও তার মনোভাব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে তবু লোকজন বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ হরিচরণ মাস্টারের বিশাল সম্পদের অধিকারী সে। তা ছাড়া হরিচরণ মাস্টারের স্ত্রী বিভাবতীর কম করে হলেও তিন-চারশ ভরি স্বর্ণালঙ্কারেরও ভবিষ্যত মালিক সে। নির্বাচনে অংশ নেবার সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখারও অবকাশ নেই।

এরই মধ্যে রুহুল গ্রামের স্কুলেই সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। মায়ের কাছ থেকে রাহুল শুনতে পেয়েছে কিছু দিন পর জিনুও মাস্টারিতে ঢুকবে। তার আগে রুহুল তাকে বিয়ে করতে চায়। অল্প কিছুদিনের ভেতরই বিয়ের তারিখ পাকা করতে চাচ্ছে রহিম বক্স। কিন্তু রাহুল বিয়ে করেনি বলে তার বাবা রাজি হচ্ছিলেন না বলে, রুহুল কোর্টে গিয়ে বিয়ে করার ভয় দেখিয়েছে। কথা শুনে রাহুলের মনে হয়েছে যে, রুহুল মুখে যেমন বলেছে, কাজেও করে দেখাতে পারবে। রাহুলের চেয়ে সে অনেক বাস্তববাদী আর সাহসী। যে কারণে মা তাকে বলে দিয়েছেন, রুহুলের আগেই তাকে বিয়ে করা চাই। তার বাবা নাকি পাত্রী দেখাও শুরু করেছেন। কিন্তু রাহুল এখনই বিয়ে করতে চায় না। তা ছাড়া কম শিক্ষিত মেয়ে নিয়ে সংসার-জীবন পার করা তার জন্য ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে। তাই সে জানিয়ে দিলো রুহুল যদি তার আগে বিয়ে করতে চায় তার আপত্তি নেই। কিন্তু হাফিজ মিয়া তা কিছুতেই মানতে পারেন না। তিনি রেগে উঠে বলেন, তোমার আগে তোমার ছোট ভাই বিয়ে করলে তুমি এ বাড়িতে থাকতে পারবে না। তোমার জায়গা তাহলে হরিচরণ মাস্টারের ভিটেতেই উপযুক্ত হবে।

হোক। তাতেও তার সমস্যা হবে না। কিন্তু এ জীবনে তার একজনকেই সবদিক দিয়ে ভালো লেগেছে। সে হচ্ছে হেনা। শিক্ষার দিক দিয়ে, কি চিন্তা-ভাবনা এমনকি কথাবার্তার দিক দিয়েও যথেষ্ট ভালো। নিরহঙ্কারী এ মেয়েটিকে যদি তার বাকি জীবনে সহযোগী হিসেবে পায় তাহলেই মনে হয় সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। এ ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে হলে তাকে কতটুকু বুঝতে পারবে? সেই বা তাকে কতটুকু বুঝতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তাই সে তার মা’কে বললো, একটি মেয়ে আছে। তাকে মোটামুটি আমার পছন্দ। তার সঙ্গে কথা বলে দেখি। সে যদি রাজি হয় তাহলে তোমাদের জানাবো।

কদিন আগে না বললি তেমন কোনো মেয়ে নেই?

রাহুল হেসে বললো, এখনও তো তাই বলি। মেয়েটির সঙ্গে কদিন চাকরি করেছি। তেমন বেশি জানাশুনার সুযোগ হয়নি।

তাহলে ঠিকানা দে। তোর বাবা গিয়ে মেয়েটির বাবার সঙ্গে কথা বলে আসুক।

মেয়েটির বাবা নেই। তা ছাড়া বেশ অভাবীও। বাবা পছন্দ নাও করতে পারেন।

আমি বুঝিয়ে বলবো।

এখন কিছু বলতে যেয়ো না মা। আগে আমি কথা বলে দেখি।

আচ্ছা বল। কালই একবার যা।

এমনিতেও তাকে ঢাকা যেতে হবে। ফ্যাক্টরিটা চালু হয়েছে কি না। তার চাকরি বহাল আছে কি না তা দেখার জন্যেও তাকে একবার যেতে হবে। তারচেয়ে আরো বেশি প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে হেনার সঙ্গে কথা বলা।

ময়ূরী গার্মেন্টস ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সব চেয়ে বেশি। কাজেই মালিক ঘোষনা দিয়ে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়েছেন। শ্রমিকদের যারা যত পাওনা ছিলো তাদের তা আংশিক পরিশোধ করে দিয়েছে। যারা প্রাপ্য বুঝে নেয়নি তাদের জন্য পনের দিন সুযোগ রয়েছে। এমন হলে তো রাহুলেরও কিছু টাকা পাওনা হবার কথা। কিন্তু হিসেবে এত কম টাকার জন্য কি তার যাওয়া উচিত হবে? আর সে আদৌ কোনো টাকা পাবে কি না তাও সন্দেহ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবছিলো। পাওনা না হোক। অন্তত জিএমের সঙ্গে তাকে দেখা করা উচিত। ভদ্রলোক ন্যায্য হিসেব মত পাঁচহাজার টাকা তার কাছে পান। সেটাও তার পরিশোধ করা উচিত। আর তাই সে শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত সাময়িক অফিসের ঠিকানায় গিয়ে তেমন পরিচিত কাউকে পেলো না। জিএম শরিফ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে লোকটি সন্দেহ মাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তার সঙ্গে আপনার কি দরকার?

তিনি আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা পান।

লোকটি এবার অবাক হয়ে তাকালো। যেন বর্তমান পৃথিবীতে এমন বেকুব দ্বিতীয়টি নেই। যেখানে পারলে মানুষ ব্যাঙ্কের স্ট্রংরুম খালি করে ফেলতে চায় সেখানে কিনা আত্মগোপন করে থাকা একজন লোকের পাওনা পরিশোধ করতে এসেছে। এমন বেকুবও পৃথিবীতে আছে!

হয়তো নিরাপত্তার কারণেই লোকটি বললো, ঘন্টা খানেক পর আসতে পারলে সে চেষ্টা করে দেখতে পারে।

রাহুল বললো, স্যারের সঙ্গে যোগাযোগের একটি ফোন নাম্বার হলেই হবে। ঠিকানার প্রয়োজন নেই।

তখনই লোকটি মাথা নেড়ে বললো, তা হয়তো দেয়া যায়। আচ্ছা দেখি। বলে লোকটি তার পকেট থেকে কতগুলো কাগজ বের করে তা থেকে পাতলা একটি ফোন ডিরেক্টরি বের করে একটি কাগজে দু’টো সেলফোন নাম্বার দিয়ে বললো, চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

রাহুল কাগজটা পকেটে রেখে বললো, কেউ যদি শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করে, তাকে কি টাকা পয়সা দিচ্ছেন?

নামটা কি? আর টাইমকার্ড কি আছে?

আছে। বলে রাহুল তার টাইমকার্ড বের করে দেয়।

লোকটি টাইমকার্ডের নাম্বার আর নাম মিলিয়ে রাহুলের খাতে দেখলো এক হাজার টাকা লেখা আছে।

তারপর টাকা গুণে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললো, আপনার আছে এক হাজার। টাকাটা নিয়ে এখানে একটা সাইন করে দেন।

রাহুল তাই করলো।

টাইমকার্ডটা নিতে চাইলে লোকটি জানালো, কার কার টাকা পরিশোধ হয়েছে টাইম কার্ডটিই তার প্রমাণ। কাজেই এটা সে নিতে পারবে না।

তার মানে ময়ূরী গার্মেন্ট এর সঙ্গে তার সম্পর্কও ঘুঁচে গেল চিরতরে।

সে সেখান থেকে বেরিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে হালকা নাস্তা করে এক কাপ চা খেতে খেতে ঠিক করে যে, সে এখান থেকে বেরিয়েই শরিফ সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করবে। হেনার সঙ্গে দেখা করতে গেলেও তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। স্বাভাবিক নিয়মে সে আরেকটা কাজ খুঁজে নেবার কথা। সে অনুযায়ী সে তার কর্মস্থলে থাকাই স্বাভাবিক। তবে একটা কাজ করা যেতে পারে। আর তা হলো সে গিয়ে বাড়িটা চিনে আসতে পারে। পরিচিত হয়ে আসতে পারে তাদের মায়ের সঙ্গে। তারপর না হয় শরিফ সাহেবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করবে।

মিথিলা বলে এগার বছরের একটি বোন আছে হেনার। তার জন্য দু’শ টাকা দিয়ে বিদেশি চকলেটের একটি গিফট বক্স নিয়ে শহিদবাগের কথা বলে রিকশায় ওঠে রাহুল। হেনার দেয়া ঠিকানা অনুসারে শহিদবাগ গিয়ে একটি চৌরাস্তা পেরিয়ে টিন-শেডের একটি একতলা বাড়ি পেলো। সরু লোহার গেট ভেতর থেকে হয়তো বন্ধ। তাই সে গেটের ওপর হাত দিয়ে আঘাত করে ঝনঝন শব্দ করে।

বেশ কিছুক্ষণ শব্দ করার পর ভেতর থেকে কারো বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠস্বর শোনা যায়, এই অসময়ে ফকির আসলো কোই থাইক্যা!

রাহুল বাইরে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসা কারো পায়ের শব্দ শুনতে পায়। তার সঙ্গে সঙ্গেই বিচিত্র শব্দ করে গেটটা খুলতেই বিস্মিত হেনা বলে উঠলো, রাহুল!

কেমন আছেন?

আরে আসেন আসেন! আপনি তাইলে সত্যি সত্যিই আসলেন!

রাহুল ভেতরে ঢুকলে হেনা গেট আটকে দিয়ে বললো, ফ্যাক্টরিতে গেছিলেন? ওটা বন্ধ করে দিছে।

হ্যাঁ। আমাকে এক হাজার টাকা দিয়েছে।

তাহলে এখন সেখান থেইকাই আসলেন?

হুঁ।

বসার ঘরে ঢুকে হেনা বললো, বসেন। আপনে কি কোথাও জয়েন করছেন?

না।

গ্রামের বাড়ি থেকে এলাম। সেখানে একটা সমস্যায় পড়ে আগে আসতে পারিনি।

রাহুল পুরোনো একটি সোফায় বসে বললো, আপনি কোথাও জয়েন করেননি?

করেছি। এলিয়েনে।

আজ কি মনে করে বাড়িতে?

কাজ আরম্ভ করবো সামনের শনিবার থেকে।

অন্যান্যরা?

সবাই আবার একই ফ্যাক্টরিতে। বলে হাসলো হেনা।

আপনার বোন মিথিলা আছে?

আছে। বলেই মিথিলা! মিথিলা! বলে ডাকতে লাগলো হেনা।

রাহুল খুশিতে উপচানো হেনার দিকে তাকিয়ে দেখলো পরনের কাপড়গুলো বেশ পুরোনো। অনেকটা ময়লাও। ওড়নাটার অবস্থাও তেমনি। সে ভাবলো যে, তাহলে বেশ কষ্টেই এদের দিন কাটছে। এ কথা মনে হতেই তার মনটা হাহাকার করে উঠলো। সে যদি এদের জন্যে ভালো কিছু একটা করতে পারতো।

তখনই শর্টপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরা একটি মেয়ে এগিয়ে এলো। আপা ডাকতেছো ক্যান?

আরে রাহুল আসছে। তুই না দেখতে চাইছিলি!

মিথিলা খানিকটা দূর থেকেই বললো, ভালো আছেন?

রাহুল হেসে বললো, তুমি কেমন আছো?

ভালো। জানেন, আমরা আবার একসঙ্গে চাকরি পেয়েছি!

তাই? তাহলে তো খুব ভালো! তোমাকে কত বেতন দেবে?

মিথিলা চোখ বড় বড় করে বললো, দুই হাজার!

বাহ! তাহলে তো তোমাকে কিছু একটা দিতেই হয়। কি দেবো বলো?

মিথিলা হেসে, এক হাতে দাঁত আড়াল করে বললো, কিছু দিতে হবে না!

তাহলে কিছু খেতেই হবে। চকলেট না মিষ্টি খাবে? অবশ্য আইসক্রিমও খেতে পারো।

রাহুলের কথা শুনে সে তাকায় হেনার মুখের দিকে।

হেনা ঝলমল করে উঠে বললো, আমার দিকে তাকাইতেছিস কেন? তুই কি খাবি সেইটা কি আমি বলবো?

রাহুল বললো, আচ্ছা বলতে হবে না। তোমার পছন্দ চকলেট। তাই চকলেটই এনেছি। বলে, রাহুল তার হাতের প্যাকেটটি বাড়িয়ে ধরলো।

মিথিলা লাফিয়ে এগিয়ে এসে বললো, আমার জন্য?

হুঁ।

প্যাকেটটা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে বক্সটা দেখে বললো, এতগুলা!

রাহুল তার বিস্ময়াবিষ্ট খুশিমুখ দেখে হেসে বললো, তুমি একা না খেতে পারলে তোমার আপুদের দিতে পার। আমার আপত্তি নেই।

সে বক্সটা হেনার হাতে দিয়ে বললো, খুইলা দাও তো!

হেনা বক্সটা খুলতে খুলতে বললো, এত দামী আনার দরকার কি ছিলো?

কাউকে কিছু দিতে হলে দামী আর সুন্দরটাই দিতে হয়।

হেনা আরো ঝলমলে মুখে বলে, আপনাকে দেখে শিখলাম।

সে চকলেট বের করে নিজে একটি নিয়ে রাহুলের দিকে একটি বাড়িয়ে ধরে বললো, আপনি তো এখান থেকে একটা খাইয়া দেখা উচিত।

তা অবশ্য ঠিক! বলে রাহুল হাত বাড়িয়ে চকলেটটা নেয়। আসলে সেও কখনো এসব চকলেট খায়নি। আসার সময় ঝোঁকের বশেই কিনে ফেলেছে। আর হেনাও বুঝি সেটা বুঝতে পেরেই একটি চকলেট এগিয়ে দিলো।

তারপর মিথিলাকে বক্সটা দিয়ে বললো, শান্তা আর অন্তরাকেও দিস।

আচ্ছা! বলে ঘরের ভেতর চলে গেল সে।

মিথিলা চলে গেলে রাহুল বললো, একটি কঠিন বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি! যদি উদ্ধার করতে পারেন তাহলে বলবেন। না পারলেও বলবেন। বলবেন তো?

হেনা অবাক হয়ে বললো, বিপদটা কি? আর আমার চেয়ে মনে হয় আপনার বিপদ বেশি না।

আপনার বিপদটা সাময়িক। আমারটা চিরস্থায়ী হয়ে যাবারও সম্ভাবনা আছে।

হেনা চকলেট খেতে খেতে বললো, আপনার বিপদটা কি?

আমার ছোট ভাই রুহুল বিয়ে করছে। আপনাকে বলেছিলাম না জিপিএ সাড়ে চার পাওয়া শিক্ষিত মেয়েটির কথা? তাকেই। এখন বাবা বলেছেন তার আগে আমাকে বিয়ে করতে হবে। নইলে হরিচরণ স্যারের বাড়িতে আমাকে থাকতে হবে।

সেখানে কেন? হেনা অবাক হয়ে তাকায়।

কিছু দিন আগে হরিচরণ স্যার মারা গেছেন।

আশ্চর্যতো!

তারপর হেনা চকলেট পুরোটা মুখে দিয়ে একই সঙ্গে চিবোতে চিবোতে ওড়নার প্রান্ত দিয়ে মুখ মুছে বললো, পানি নিয়ে আসতেছি।

হয়তো সে রাহুলের কথাটা নিয়ে ভাবতেই আড়াল হলো। কিংবা তার মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়েছে।

কিছুক্ষণ পরই একটি গ্লাসে করে পানি নিয়ে ফিরে এলো হেনা। ছোট্ট টেবিলটাতে রেখে বললো, বুঝতে পারতেছি আপনের সমস্যা কিছুই না।

আপনি বলছেন কিছুই না! রাহুল অবাক না হয়ে পারে না।

হেনা রাহুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, হুঁ। আপনার কি মনে আছে? একদিন বলছিলাম যে, একটা মানুষ আলোতে দাঁড়াইলে মাটিতে তার একটা ছায়া পড়ে। আর সে ছায়ার কারণে মাটির কিছু অংশও ম্লান হইয়া যায়। বলছিলাম কি না?

হ্যাঁ। বলেছিলেন।

আমারও তেমন একটা ছায়া আছে। সূর্যগ্রহণের মত। সূর্যের উপর যখন পৃথিবীর ছায়া পড়ে তখন সূর্যটাও ম্লান হইয়া যায়। ম্লান হইয়া যায় দিনটাও।

তারপরই হেনা অকস্মাৎ রাহুলের একটি হাত ধরে টেনে বললো, আমার সঙ্গে আসেন।

পাশের একটি রুমে গিয়ে দাঁড়াতেই রাহুল দেখতে পেলো, হুইল চেয়ারে দাড়ি-গোঁফে আচ্ছাদিত চেহারা নিয়ে একজন বসে আছে। কাঁধ অবধি ঝাকড়া চুল। তাকে দেখেই রাসপুটিনের কথা মনে পড়লো রাহুলের।

হেনা তাকে বললো, কামরান, তোমারে রাহুলের কথা বলছিলাম না? এই হইলো রাহুল!

রাহুলের হঠাৎ করেই মনে হলো যে, এমন একটি নাম সে কোথাও শুনেছে। কিন্তু কোথায়? তার আগেই কামরান বললো, রাহুল, কেমন আছেন? হেনার মুখে আপনার কথা শুনেছি। বলে, সে একটি হাত বাড়িয়ে দিলো।

বিস্মিত রাহুল এগিয়ে গিয়ে তার হাতটি ধরে বললো, আপনার কথা হেনা আমাকে কখনো বলেনি!

বলার পরিবেশ হয়তো পায়নি! বলে হাসলো সে।

হেনা বললো, রাহুল এই মানুষটাই হইলো আমার ছায়া। আর এই ছায়াটাই আমাদের সংসারটারেও ম্লান করে দিছে।

তারপর সে আবার বললো, এর আরেকটা খুব ফুটানিঅলা নাম আছে! কামরান মসনবি।

হ্যাঁ। কবি কামরান মসনবি। কবিতা লেখার কারণে যাকে জেলে যেতে হয়েছিলো! তারপর জেল থেকে বেরিয়ে এলে কারা যেন রাতের অন্ধকারে তার ওপর হামলা করে। সে হামলার পর থেকেই যে এখন দু পায়ে ভর করে স্বাভাবিকভাবে চলতে ফিরতে অক্ষম। সেই মানুষটিকে এত কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে রাহুল? আর হেনাই কি না সেই ভাগ্যবতী!

রাহুল বেশি কিছু ভাবতে পারে না। বিস্মায়াহত হয়ে একবার হেনা আর একবার কামরানের দিকে তাকায়। ভাবে কত বাক-সর্বস্ব আর বর্জ্য উৎপাদনকারি অহংকারি লোক কবির খেতাব নিয়ে ঢাকা শহরের অলিগলি আর পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তর নোংরা করে বেড়াচ্ছে। তাদের কেউ কেউ হয়তো ঈর্ষান্বিত হয়ে কাজটি করিয়েছে। কিন্তু একজন কবি কী করে আরেক কবির শত্রু হয়? কবিরা কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? একজন কবি যদি শিল্পীই হয় তাহলে সে হবে মার্জিত। বিনয়ী। নিষ্ঠুরতা তো হিংস্র জন্তুদের মানায়। বড় কবিকে হেনস্থা করে ছোট কবিরা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে? আর যে দেশে কবিদের ভেতর এমন নোংরা অবস্থা বিরাজমান, সে দেশের কবিতা আর যা কিছু হোক সুস্থ অন্তত নয়।

প্রায় ধ্যানস্থ হয়ে হেনার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিলো রাহুল। আসলে হয়তো শুনতে পাচ্ছিলো না। সে হারিয়ে গিয়েছিলো আপন ভাবনার স্রোতে। শেষের দিকে নাক টেনে ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেনা বললো, এখনও কি আমার প্রতি আপনার আগ্রহ আছে?

রাহুল বললো, আগ্রহ বরং দ্বিগুণ হলো। আগে আপনাকে একটু ভালোবাসতাম। এখন আপনাদের পুরোপুরি ভালোবাসতে আরম্ভ করেছি।

হেনা ধমকে উঠে বললো, আবার প্যাঁচ দিয়ে কথা বলতেছেন কেন?

আমি তো আগেই বলেছি যে, রাখঢাক করে কথা বলতে পারি না!

তারপর সে কামরানের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি বিপদে পড়ে এসেছিলাম জানতে যে, হেনা আমার পাশে দাঁড়াতে পারবে কি না। কিন্তু আমাকে যদি আপনাদের পাশে দাঁড়াতে দেন তাহলে অনেকটা স্বস্তি পাবো!

আমার পাশে বেশিক্ষণ কেউ দাঁড়াতে পারবে না। আমার হাঁটুর প্লেট দু’টো রিপ্লেস করাতে হবে শুনেই আমার ভাই-বোনেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার প্রিয় কমরেডরা ভুলেও কোনোখানে আমার নাম উচ্চারণ করে না! তবু আপনার কথা শুনে ভালো লাগলো। মনে সাহস পেলাম। আর এ কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে যে, আমি অপাংক্তেয় হয়ে যাইনি। বলে, মাথা নাড়তে নাড়তে হাসে কামরান।

তারপর আবার বলে, হেনা তো এতটাই ভেঙে পড়েছে যে ঠিক মত খাওয়া-ঘুম কোনোটাই করতে পারে না। তাকে পারলে বোঝান যে, জীবনটা এত সহজ সরল নয়। আর আমাদের চারপাশের মুখগুলোও ততটা আন্তরিক নয় যা আমরা প্রত্যাশা করি।

তখনই হেনার মা এসে বললেন, তুমি রাহুল?

রাহুল মাথা দোলালে তিনি আবার বললেন, তোমার কথা মেয়েটা অনেক বলে।

তারপর তিনি বললেন, দুপুরে খেয়ে যাবে।

তা পারবো না।

তখনই হেনা বলে উঠলো, কোথায় যাবেন আপনে? এখন তো চাকরিও করেন না। এমনও না যে ইন্টারভিউ দিতে যাবেন!

আসলে শরিফ সাহেবের সঙ্গে দেখা করা দরকার। ভদ্রলোক আমার কাছ থেকে এখনও পাঁচ হাজার টাকা পান।

খাওয়া দাওয়া কইরা যাবেন। বলেই হেনা রাহুলে একটি হাত ধরলো।

তারপর আবার বললো, আমার কথা না শুনলে আমাদের পাশে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, ধারে কাছেও আসতে পারবেন না!

আজকের মত ছেড়ে দেন! আবার তো আসছিই!

কবে আসবেন? কালকে? পরশু? তার পরদিন? কবে?

পরের সোমবার। আজ থেকে ছ’দিন পর। কথা দিচ্ছি!

রাহুলের কথা শুনে হেনার মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে ওঠে। বলে, সেদিন তো আমরা বোনেরা কাজে ব্যস্ত থাকবো।

আপনারা ঘরে থাকেন সেটাও আমি ঠিক আশা করি না। আপনারা বিশেষ করে আপনি থাকলে আমার পরিকল্পনায় কিছুটা বাধা পড়তে পারে।

আমার অবর্তমানে আপনার কী এমন পরিকল্পনা থাকতে পারে?

সেটা নিয়ে এখনো ভাবিনি।

তাহলে পরের সোমবার আসার দিন ঠিক করলেন কিভাবে?

আসবো যে ঠিক। কিন্তু পরিকল্পনাটা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে বলে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছি না।

তবে একটা রিকোয়েস্ট থাকবে। এমন কিছু করবেন না, যার কারণে আমাদের ছোট হইতে হয়।

রাহুল হেনার কথাটাকে পাশ কাটাতেই বলে, বড় হতে হলে আগে ছোট হতে হয়। এমন কথাই তো ছোটবেলা শিখেছি। সেটা কি এখন বদলে গেছে?

কিছুই তো বদলায় না। বদল হয় আমাদের ধারণাগুলা।

রাহুল কামরানের একটা হাত ধরে বললো, আজ আমি যাচ্ছি। আবার যখন আসবো তখন কেবল আপনার জন্যেই আসবো। সেদিন যেন আমাকে কথার মারপ্যাঁচে দমিয়ে দেবেন না। এটাই আমার অনুরোধ।

কামরান হাসলেও হাসিটা আগের মত ঔজ্জ্বল্য পেলো না। রাহুলের কথায় মনে মনে কী ভাবছে সেই বলতে পারবে।

সে বেরিয়ে আসার আগে হেনা তার বাকি দু’বোনকেও ডেকে নিয়ে এলো। তারা দু’জনই রাহুলকে সালাম দিয়ে কেমন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ালো। পরনে ময়লা আর খুব বেশি পুরোনো কাপড় বলেই হয়তো।

একজনের পিঠে হাত রেখে হেনা বললো, এ হচ্ছে শান্তা।

তারপর পাশের জনকে দেখিয়ে বললো, আর ও হচ্ছে অন্তরা।

রাহুলের মনে হয় যে, তিন বোনের চেহারা প্রায় একই রকম দেখতে।

বের হয়ে আসার সময় হেনা গেট পর্যন্ত এগিয়ে এসে বললো, আপনার পরিকল্পনাটা হয়তো আমি কিছুটা অনুমান করতে পারছি। কিন্তু সময় মানুষকে অনেক সময় স্থবির কইরা দেয়। তাই আপনেরে থামানোর তেমন কোনো সাহস পাইলাম না। আসলে প্রয়োজন মানুষরে কেমন যেন স্বার্থপর কইরা ফালায়। মনে হয় আমিও তেমন স্বার্থপর হইয়া গেছি।

নিজকে কখনো ছোট ভাববেন না। মনও ছোট করবেন না।

মন বা নিজেরে বড় ভাবতে হইলেও তেমন জোগান লাগে। গাঙে পানিই যদি না থাকলো তাইলে স্রোত আসবে কোই থাইক্যা?

তবুও মন খারাপ করবেন না। সময়টাই হলো সব। সেটা অতিক্রান্ত হলেই সব কিছু বদলাতে আরম্ভ করবে।

তারপর, দুশ্চিন্তা করবেন না যেন! বলেই গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে রাহুল।

সে বুঝতে পারছে যে, হেনা হয়তো গেটের ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে কি ফিরে তাকাবে? না। তাকাবে না। তার চোখের দিকে চোখ তুলেও তাকাতে পারবে না। সে একটি রিকশায় চড়ে চালককে বললো, মগবাজার চলো।

আসলে মগবাজার নয়। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই সে নেমে যেতে পারে। রিকশায় উঠেছে যতটা দ্রুত পারা যায় হেনার দৃষ্টি থেকে নিজকে আড়াল করতে। কোনো ব্যাপারে খুব বেশি প্রত্যাশা থাকতে নেই। প্রত্যাশা থাকলেই নিরাশ হবার সম্ভাবনা থাকে। সে ভেবেছিলো হেনা এখনও বিয়ে করেনি। তাকে বিয়ের প্রস্তাবটা দিলে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে হলেও রাজি না হয়ে পারতো না। কৈশোর পেরিয়ে বাকি সময়টা রাহুল বলতে গেলে অবহেলা পেতে পেতেই বড় হয়েছে। মা আর হরিচরণ স্যারকে বাদ দিলে বাকি জন হলেন বিভাবতী। যাঁরা তাকে ভালোবাসেন। হেনার দৃষ্টিতেও ভালোবাসা ছলকে উঠতে দেখেছে সে। জীবনটাকে কামরানের সঙ্গে একই বৃত্তে বেঁধে ফেলেছে বলেই হয়তো সেখান থেকে নিজকে বিযুক্ত করতে পারবে না। কিন্তু হেনার মনে রাহুলের জন্য যে স্থানটুকু নির্ধারণ হয়ে গেছে, তা হয়তো বাকি জীবন তেমনিই থেকে যাবে।

ভাবতে ভাবতে সে খেয়াল করতে পারে না চালক তাকে কখন সত্যি সত্যিই মগবাজার মোড়ে নিয়ে এসেছে। চমক ভাঙে তখনই যখন লোকটা মাথা ঘুরিয়ে জানতে চায় মগবাজার কই নামবেন?

রাহুল তখনই নেমে পড়ে।

রিকশা থেকে নেমে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে কলসেন্টার খোঁজে। রাস্তার পাশেই একটি কলসেন্টারে ঢুকে সে শরিফ সাহেবের উদ্দেশ্যে ফোন করে। ল্যান্ড লাইনটা হয়তো নষ্ট। অনেকক্ষণ রিং হলেও কেউ ধরলো না।

তারপর সেল ফোনের নাম্বারে চেষ্টা করতেই সে শরিফ সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। সালাম দিয়ে বলে, আমি রাহুল।

ওপাশ থেকে তিনি প্রায় চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, আরে আপনি কোথায়? আপনার গ্রামের ঠিকানায় আজই লোক পাঠিয়েছি।

গ্রামের ঠিকানায় লোক পাঠিয়েছেন? আর আমি এখন মগবাজারের মোড়ে।

আফিয়া টাওয়ারের দশ তলায় চলে আসেন। একত্রিশ নাম্বার রুম।

রাহুল অবাক হয়ে ফোন রেখে দেয়। আশ্চর্য! আমার গ্রামের ঠিকানায় লোক কেন পাঠালো? কি এমন সমস্যা হলো? নাকি ভেবেছেন টাকাটা তিনি খুইয়ে ফেলেছেন?

যাবে কি যাবে না ভেবেও যাবে বলে ঠিক করে সে। না গিয়ে তো উপায় নেই। গ্রামের ঠিকানায় লোক গিয়ে থাকলে এতক্ষণে সে বোধহয় ঘরবাড়ি চৌদ্দ পুরুষের ঠিকানা লাগিয়ে ফেলেছে।

আফিয়া টাওয়ার এখান থেকে বেশি একটা দূর নয়। সে মিনিট পাঁচেক হেঁটেই সেখানে পৌঁছে গেল। লিফট বেয়ে একত্রিশ নাম্বার রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো এলাহি কাণ্ড! বিশাল অফিস নিয়ে বসেছেন শরিফ সাহেব। তাকে দেখতে পেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বললেন, আরে, আপনার কারণে আমি প্রায় পঙ্গু হয়ে বসে আছি।

রাহুল কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে।

তাকে টেনে নিয়ে পাশের সোফায় বসতেই রাহুল বললো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

সবই বুঝতে পারবেন। একদিন বলেছিলাম না যে, আপনাকে দিয়েই হবে। তো কতটুকু হয় সেটাই আমার দেখার ইচ্ছে।

শরিফ সাহেবের কথা শুনে রাহুলের বিভ্রান্তিই বাড়ে কেবল।

আপনার পাসপোর্ট আছে?

রাহুল মাথা নাড়লে বললেন, এখনই গিয়ে ইমার্জেন্সি আটকপি পাসপোর্ট সাইজ ফোটো তুলে আনেন। আপনার পাসপোর্ট বানাতে হবে!

রাহুল শরিফ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে তিনি বললেন, সবই বলবো। আগে বলেন খাওয়া দাওয়া করেছেন?

এখনো তো খাওয়ার সময় হয়নি।

এখনি যান! ফোটো তুলে নিয়ে আসেন। আর আজ আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবেন কিন্তু!

রাহুল বিভ্রান্তি নিয়েই উঠে দাঁড়ালে তিনি বললেন, সঙ্গে টাকা পয়সা আছে তো?

আছে।

ফোটোঅলা বেশি টাকা চাইতে পারে। আপনি বেশিতেই রাজি হবেন।

আচ্ছা।

রাহুল দ্বিধা নিয়েই সেখান থেকে বের হয়। কাছাকাছি একটি স্টুডিওতে ঢুকে এখনি আটকপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে বলে জানায়।

লোকটা বললো, এখনি হবে না। ঘন্টা খানেক সময় লাগবে।

এত লাগবে কেন? একটি ফিল্মের দাম যত সেটা তো আমিই দিচ্ছি।

তবুও হবে না।

ধুর! বলে সে বেরিয়ে পড়ে সেখান থেকে। ফুজি ফিল্মের সাইন আর ব্যানার দেখে সে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে একটি ল্যাবে।

জানালো তার এখনি পাসপোর্ট সাইজ ছবি লাগবে আটকপি।

এত ইমার্জেন্সি!

আরে ভাই! স্টুডিওঅলা বললো এক ঘন্টা সময় লাগবে। বললাম, একটি ফিল্মের দাম দেবো। তবুও ব্যাটা রাজি হলো না!

ব্যাটা হয়তো এমনিই এমনিই বসে আছে। নন-প্রফেশনাল।

মনিটরে নিজেই নিজের ছবি দেখতে দেখতে কখন তার আটটি ছবি একই কাগজে প্রিন্ট হয়ে বেরিয়ে এলো তা বুঝতেই পারলো না রাহুল। কিন্তু সে তুলনায় তেমন বেশি টাকাও দিতে হলো না।

শরিফ সাহেব একটি পাসপোর্টের আবেদন ফরম তার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, চটপট আপনার নিজের ব্যাপারগুলো লিখে ফেলেন। নাম-ধাম, জন্ম তারিখ ইত্যাদি ইত্যাদি।

পাসপোর্টের ফরম পূরণ করতে করতে রাহুল বললো, কিন্তু কেন এত আয়োজন আর তাড়াহুড়ো কিছুই তো বুঝতে পারছি না!

শরিফ সাহেব বললেন, ভাংচুরে অবশ্য আমাদের তেমন ক্ষতি হয়নি। ইন্সুরেন্স করা ছিলো। বলতে গেলে লাভই হয়েছে। মালিক শ্রিলংকায় একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ভাড়া করেছেন। এ দেশে আর ব্যবসা করবেন না। বায়িং হাউজের নাম ঝুলিয়ে আমি বসে থাকবো এখানে আর আপনি সামাল দেবেন সেখানকার কাজটা। পারবেন না?

রাহুল আরো অবাক হয়ে বললো, আমি তো তেমন কোনো কাজই শিখলাম না!

আরে ভয়ের কিছু নেই। যেন তাকে আশ্বস্ত করেন শরিফ সাহেব। খায়রুদ্দিনকে সেখানে পাবেন।

বাংলাদেশী কোনো ওয়ার্কার সেখানে থাকবে না?

আমরা তো একটি চালু ফ্যাক্টরি নিয়েছি। সব কিছুই আছে। কেবল লোকগুলোকে আমাদের হয়ে খাটানোর জন্যই আপনারা দু’জন। পরে আস্তে ধীরে আরো কিছু লোক পাঠাবো।

পাসপোর্টের ফরম পূরণ করে দিয়ে রাহুল বললো, সেখানে আমার কাজটা কি?

তেমন কিছু না। বিভিন্ন বায়ার এলে আপনি ব্যাপারটাকে সামাল দেবেন। খায়রুদ্দিন আপনাকে কাজের ব্যাপারে যা জানার বলবে।

তাহলে তেমন একটা জটিল নয় দেখছি।

কিছুটা জটিলই। তবে আপনার জন্য হয়তো তেমন একটা জটিল হবে না। তবে, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে সেখানে গিয়ে পৌঁছুতে হবে। কবে নাগাদ পারবেন ফ্রি হতে?

দিন পনের লাগতে পারে।

আরে কাল বাদে পরশুইতো পাসপোর্ট বেরিয়ে যাবে। এতটা সময় করবেন কি? গ্রামের বাড়ি কোনো ঝামেলা পাকিয়ে আসেননি তো?

ঝামেলা আমি না পাকালেও ঝামেলা একটা হয়েছে। আমার স্কুল জীবনের নি:সন্তান এক শিক্ষকের বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছি। সেগুলোর একটা ব্যবস্থা না করে, তার ওপর স্যারের বিধবা স্ত্রীর জন্য টাকা-পয়সার রেগুলার একটি ফ্লো তৈরী করে বাড়িটাকে সুরক্ষিত করতে চারদিক দিয়ে দেয়াল করতে হবে। এগুলো না সারতে পারলে যে কোনোদিকে পা বাড়াতে পারবো না!

শরিফ সাহেব কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলেন যেন।

তারপর বললেন, একটি দেয়াল করতে পনের দিনের বেশি লাগার কথা না। প্রপার্টি ভ্যালুজ বেশি হলে সেগুলো ব্যাঙ্কে মর্টগেজ দিয়ে আপাতত টাকাগুলোকে আপনার নামে ডিপোজিট করেন। সেখান থেকে মাসে মাসে একটি নির্দিষ্ট ইন্টারেস্ট সেই ভদ্রমহিলার কাছে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করতে পারেন। সেই সঙ্গে ব্যাংক থেকে যে লোনটা নিচ্ছেন তার কিছু ইন্টারেস্ট দিয়েও লোন শোধ করার ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে লোনের পরিমাণও বাড়বে না। ওদিকে ব্যাঙ্কের টাকাও কমবে না। বাকি যা করতে হয় সময় নিয়ে ভেবে-চিন্তে করতে পারবেন।

ব্যাঙ্কের কথাটা রাহুলের মাথায় আসেনি। শরিফ সাহেবের কথা শুনে সে যেন হঠাৎ করেই নির্ভার হয়ে গেল। আর সময় পেলে সম্পত্তির বেশ কিছু অংশ বিক্রি করে দিয়েও ব্যাঙ্কের লোন শোধ করে ফেলা যাবে।

রাহুলকে গভীর ভাবনায় তলিয়ে যেতে দেখে শরিফ সাহেব একবার কেশে বললেন, কথাটা কি মনে ধরলো?

রাহুল হাসিমুখে বললো, থ্যাঙ্কু স্যার! এমন একটা ব্যাপার আমায় মাথায় ছিলো না।

শরিফ সাহেব বললেন, এ জন্যেই মানুষ পরামর্শ নিতে অভিজ্ঞ জনকে খোঁজে। আমার সঙ্গে লেগে থাকলে সব সময়ই সুপরামর্শ পাবেন!

রাহুল বললো, তাহলে আজ আপনার সঙ্গে লাঞ্চ করা যাবে না। গ্রামের বাড়ি যাবো। এখন আমার সেখানে থাকাটাই জরুরি বোধ হয়।

লাঞ্চ করে গেলেই ভালো করতেন। পথে কি খাবেন না কি কিছুই খাবেন না তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই! আর হ্যাঁ, ব্যাঙ্কের ব্যপারে যদি আমার সাহায্য লাগে করবো। লোনের আর সুদের পরিমাণটা কমবেশি করতে চাইলে ফোন করবেন। আমার যতটুকু মনে হয় গ্রামাঞ্চলের ব্যাংক তেমন বেশি টাকা দিতে পারবে না। পারলে দলিল-পত্রের ফটোকপি নিয়ে মাঝখান দিয়ে এলে কি করতে পারি দেখবো।

শরিফ সাহেবের কাছ থেকে ফিরে এসে বিভাবতীর সঙ্গে দেখা করতে যেতেই তিনি বললেন, বাবা রাহুল, চারদিকে দেয়াল দেবার কি ব্যবস্থা করলি?

কেমন খরচ হবে, আপনার হাতে কেমন টাকা-পয়সা আছে তার ওপর নির্ভর করবে।

বিভাবতী হেসে বললেন, টাকা ব্যাঙ্কে আছে। তা ছাড়া তোর বউয়ের জন্য কিছু গয়নাগাটি রেখে বাকিগুলো বেচে দেবো ভাবছি। বলা যায় না কখন চোর ডাকাত এসে আমার আরেক সর্বনাশ করে যাবে। এ নিয়ে নিহার পোদ্দারের সঙ্গেও কথা বলে নিয়েছি। তুই বললে, কালই ব্যাঙ্কে গিয়ে লকার খুলবো।

তা করা যায়। টাকাটা কি সে সঙ্গে সঙ্গেই দেবে?

বলেছে অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকে টাকা দেবে।

তাহলে তো ভালোই। আমি বরং কালই ইট ভাটার মালিক আর রাজমিস্ত্রির সঙ্গে কথা বলে ফেলি।

করে ফেল! দেরি করার কোনো মানে হয় না। সেই সঙ্গে দেয়ালের ভেতর ছোট্ট একটা মন্দিরও করাবো ভাবছি। ঠাকুরও সেখানেই বসাবো।

হরিচরণ মাস্টারের যত বড় বাড়ি তার পুরোটাতে দেয়াল দিতে গেলে একটি বাড়ি করার টাকাই চলে যাবে হয়তো। তাই সে খানিকটা এলাকা জুড়ে দেয়াল তোলার কথাই ভাবছিলো। বিভাবতীর সঙ্গে কথা বলার পর তাই সাব্যস্ত হয়।

রাহুল বিভাবতীর খরচের টাকার জন্য যে পরিকল্পণা করেছিলো তার আর প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না। বিভাবতী নিজেই জানালেন তার খরচের টাকা নিয়ে তাকে ভাবতে হবে না। মাস দু’য়েক আগে দক্ষিণের হালটের দশবিঘা জমি বিক্রি করে দিয়ে হরিচরণ মাস্টার টাকাগুলোকে বিভাবতীর নামে ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই মাসে মাসে কিছু টাকা তার হাতে আসবে। তা ছাড়া রাহুল তো আর এখনই সব জমি নিয়ে নিচ্ছে না। সে জমি বর্গা-পত্তন দিলেও কিছু ফসল আর টাকা আসবে। সে দিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় রাহুলের তেমন কোনো পিছু টান নেই। দায়ও তেমন একটা নেই। এখন দেয়াল তোলার কাজটা আরম্ভ করলেই হলো। ছাদ করা পাকা ঘর তো তাঁদের আগে থেকেই রয়েছে। কাজেই রাহুল জন্মভূমি আর পৈতৃক ভিটে যদি ছেড়েও যায় মোটমুটি দায় থাকবে না। পিতামাতার কাছে যে দায় তা থেকে মুক্ত হওয়া কোনো সন্তানের পক্ষেই সম্ভব নয়। সে দায় সে মাথায় নিয়েই যেতে পারবে।

রাতের বেলা বিভাবতী রাহুলকে মন্দিরের জন্য জায়গা দেখিয়ে বললেন, আমার শ্বশুর বাবা ঠিক এখানটায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। তাই এখানেই মন্দির করাবো বলে ঠিক করেছি। জাত-পাত আর ছোঁয়াছুয়ির ব্যাপারেও তেমন কোনো ভয় থাকবে না। মন্দির আর ঠাকুর প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে প্রথম পূজা আর তোর স্যারের শ্রাদ্ধের কাজ একই সঙ্গে আরম্ভ করবো। দিনক্ষণও ঠিক করতে বলেছি কার্তিক ঠাকুরকে।

রাহুল বললো, বলছিলেন না স্যারের শ্রাদ্ধের টাকাটা কোনো সৎ কর্মে দান করে দিতে। স্যারের শ্রাদ্ধ-শান্তি অনুষ্ঠান করালে তো দানের ব্যাপারটা না হলেও চলে।

তা কি করে হয়? সেটা তো করতেই হবে। যিনি এতসব কিছু করে রেখে পরপারে চলে গেলেন তিনি যদি এর কিছু না পান, তাহলে এর সবই অর্থহীন। অর্থহীন বেয়াল্লিশ বছর তেমন মানুষের সঙ্গী হয়ে থাকাও।

রাহুল হঠাৎ বলে উঠলো, দানের ব্যাপারে আমার একটা কথা ছিলো।

কি কথা? বিভাবতী খানিকটা চমকে উঠলেও পরে আবার বললেন, তুই কি এটা অন্য কিছুতে ব্যয় করতে চাস?

তা না।

তাহলে?

এ টাকা কি কোনো মুসলমানের কাজে লাগানো যাবে?

সে কিরে? এত বড় শিক্ষিত হয়ে মূর্খদের মত কথা বলছিস কেন?

তা অবশ্য না। ধর্মীয় ব্যাপার বলে কথা। তার অনেক কিছুই কোনো যুক্তি-তর্ক মেনে চলে না।

মানুষের উপকারে লাগে এমন কাজে ব্যয় হলেই তো হয়!

হেনার কথা আপনাকে বলেছিলাম না?

হ্যাঁ।

বাবার চোখা চোখা কথা শুনে গিয়েছিলাম তার কাছে। ভেবেছিলাম তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবো। কিন্তু তার আগেই সে তার অসুস্থ স্বামীকে দেখালে আমার আর কিছু বলার মত ছিলো না। তার কাছ থেকেই জানলাম যে তার স্বামী কবি কামরান মসনবি। খুবই নাম করা কবি সে। কিন্তু কারা যেন রাতের অন্ধকারে রড দিয়ে পিটিয়ে পা দু’টো পঙ্গু করে দিয়েছে। তার এমন অবস্থায় হেনা ছাড়া আর কেউ পাশে নেই। নেই তার পরিবারের লোকজনও। সে যদি ভালো কোনো হাসপাতালে গিয়ে হাঁটুর চিকিৎসা করাতে পারে তাহলে আবার সুস্থ হয়ে হাঁটাচলা করতে পারবে। তাই প্রথমে ভেবেছিলাম আপনার কাছ থেকে কিছুটা জমি বিক্রি করার অনুমতি নিয়ে সে টাকাটা তাদের দেবো। কিন্তু যদি দানের টাকাটা তাদের কাজে লাগে তাহলে জমি বিক্রি করতে হয় না।

দেবো। তাহলে কালই তোকে দুই লাখ টাকার চেক লিখে দেবো। এ নিয়ে আর ভাবিস না।

আরেকটি কথা আছে চাচি।

বল কি কথা?

আপনি যদি কষ্ট করে আমার সঙ্গে গিয়ে নিজে চেকটা দিতেন তাহলে হয়তো ভালো হতো।

তা কি করে হয়! আমি বিধবা মানুষ। এখন আর বাড়ি থেকে বের হবার জো নেই। নিজের সন্তান-সন্ততি থাকলে না হয় কথা ছিলো! তার চেয়ে ভালো ছেলেটাকে বলিস সুস্থ হয়ে যেন আমাকে মাঝে সাঝে দেখতে আসে। ওতেই আমি খুশি হবো!

তারপর বিভাবতী রাহুলের মাথায় হাত রেখে বললেন, উনি মানুষ চিনতে ভুল করেননি। যোগ্য মানুষটিকেই বেছে নিয়েছিলেন। তা ছাড়া তুই যে ওর অহংকারও ছিলি জানিস?

বিভাবতীর কথা শুনে চোখ দিয়ে পানি এসে গেল রাহুলের। এক হাতে চোখ মুছে সে বললো, জানি!

বিভাবতী হাত নামিয়ে বললেন, পাগল ছেলে! এমন কথায় কেউ কাঁদে নাকি?

তবুও! কামরানের জন্য যে টাকাটা পাবো সেটা ভাবতেই আমার অনেক ভালো লাগছে!

হরিচরণ মাস্টারের বাড়িতে দেয়াল আর মন্দির তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলো বলে রাহুল ঠিক মত ঘরে থাকতে পারছিলো না। কিন্তু এরই মধ্যে গ্রামের কারো কারো কাছে শুনতে পেলো যে, রুহুল আর জিনুর বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে। ভাবলো রহিম বক্স বুঝি গুজব ছড়িয়েছে। কারণ ছোট ভাইয়ের বিয়ের কথা পাকা হবে মা কিংবা বাবা তাকে কথাটা জানাবে না কি করে হয়। সে রুহুল আর জিনুর বিয়ের কথাটাকে পাত্তা দিলো না।

চার-পাঁচ দিনেই অর্ধেক দেয়াল তোলার কাজ হয়ে গেলে দু’দিন বিরতি দিতে হলো। বিভাবতী কেন কাজ বন্ধ করতে বললেন সে ব্যাপারে কিছু বললেন না। তখন তাকে বাড়িতে একা পেয়ে তার মা বললেন, কিরে তুই না কার সঙ্গে কথা বলতে ঢাকা গিয়েছিলি? ফিরে এসে মুখে তালা দিয়েছিস কেন?

রাহুল কি বলবে ভেবে পায় না। যে মেয়েকে সে পছন্দ করে তার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। এ কথা কি সে মা’কে বলতে পারবে? আর তিনি এ কথা শুনলে কি ছেলের বুদ্ধি-বিবেচনা নিয়ে কি কটাক্ষ করতে বাকি রাখবেন? তাই সে বললো, ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করতে সময় লাগবে। সে এখনো চাকরিতে যোগ দেয়নি। তখনই আস্তে ধীরে বলবো।

তোর বাবা কি বলেছে জানিস? রুহুলের বিয়ের দিন যেন তোকে এ গ্রামের কোথাও দেখা না যায়। বাবা, তুই এতবছর শহরে থেকেও কি একটা মেয়েকে বিয়ের জন্য ঠিক করতে পারলি না! গার্মেন্টসে কাজ করে এমন বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা বিয়ে করে ফেলছে আর তুই কিনা আইবুড়ো হয়ে গেলি? ছোট ভাইয়ের কাছে মুখ দেখাবি কি করে? আর জিনুকেও বিয়ে করতে রাজি হলি না। তোর ছোট ভাই তাকে বিয়ে করছে শুনে তোর খারাপ লাগছে না? বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন।

মায়ের চোখে পানি দেখে খারাপ লাগলেও বিয়ে সঙ্ক্রান্ত বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাহুলের ভালো লাগে না। সে বলে, বাবা যদি চান আমি গ্রামে না থাকি, তাহলে তাই হবে। তোমরা চেয়েছিলে বলে, আমার ভালো না লাগলেও বাইশ বছর পড়ালেখা করেছি। তোমরা যদি চাও এ গ্রামে আমি কখনোই না আসি, তাহলে সেটাও পারবো!

তোর জন্য পছন্দ করা মেয়েকে নিয়ে তোর ছোট ভাই সংসার করবে তা যদি দেখতে চাস তো থাকিস! এই বলে তিনি চোখে-মুখে আঁচল চেপে ধরে অন্য ঘরে চলে গেলেন।

রাহুলের খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। পৃথিবীতে করার মত অনেক কিছু থাকলেও কেউ কেউ থাকে যাদের সত্যিকার অর্থেই কিছু করার থাকে না।

যদিও সে হেনাকে কথা দিয়ে এসেছিলো সোমবার সে যাবে। কিন্তু কাজের শুরুতে কোনো সমস্যা হয় কিনা, টাকা পয়সা লেনদেনে নিয়ে মিস্ত্রিদের সঙ্গে কোনো ঝামেলা হয় কিনা ভেবে আর ঢাকা যেতে পারলো না। এরই মধ্যে একদিন সে শরিফ সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলো যে, তার পাসপোর্ট তৈরী হওয়া থেকে ভিসা লাগানোও হয়ে গেছে। কোন দিন সে ঢাকা আসতে পারবে জানালে সে অনুযায়ী টিকেট করার ব্যবস্থা করবেন। তখনই সে ঠিক করে ফেললো, যেহেতু তার বাবা রুহুল আর জিনুর বিয়ের দিন তাকে গ্রামে দেখতে চান না এমন কি তার মায়ের কথায় এটাও পরিষ্কার যে, কারো ছোট ভাই তার বড় ভাইয়ের জন্য পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করলে বড় ভাইটি বাড়ি তো দূরের কথা গ্রামের আশপাশেও থাকা উচিত নয়। সে ঠিক করলো রুহুলের বিয়ের তারিখটা জেনে নিয়ে তাই জানিয়ে দেবে শরিফ সাহেবকে।

সে গ্রামের রাস্তা দিয়ে বিকেলের দিকে কয়েকবার অকারণে হাঁটাহাঁটি করার সময়ই আজমলের সঙ্গে দেখা হলে সে জানায় রাহুলের বিয়ে নাকি এ মাসের চব্বিশ তারিখ?

রাহুল সে কথার উত্তর না দিয়ে বলে, আমি তোর কাছেই যাবো ভাবছিলাম। ভালোই হলো দেখা হয়ে গেছে।

আমার কাছে তুই? কেন?

সোমবার আমি ঢাকা যাচ্ছি। সেদিন তো হরিচরণ স্যারের বাড়ির দেয়ালের কাজটা শেষ হবার কথা। মন্দিরটার কাজও শুরু হবার কথা। কষ্ট করে দিনটা যদি সেখানে থাকতি তাহলে খুবই ভালো হতো।

তুই ভাবিস না। আমি থাকবো। দরকারে স্কুল থেকে ছুটি নেবো।

তারপর সে আবার বললো, এই সামান্য একটা কাজের জন্য তুই টেনশন করছিস?

শুরু থেকে থাকলাম। এখন শেষের দিকে যদি না থাকি কেমন দেখায়? সোমবার ঢাকা যাওয়াটাও জরুরি!

তুই ভাবিস না। বলে, আজমল একটি হাত রাহুলের কাঁধে রেখে যেন অভয় আর নিশ্চয়তা দেয়।

মানুষের অনেক ধরনের সম্পর্কের ভেতর দিয়েই আমাদের সমাজ নামের কাঠামোটি কখনো ভালো বা খারাপ বলে বিবেচিত হয়। সে সঙ্গে মানুষে মানুষে তৈরী হয় এক ধরনের বিচিত্র মানসিকতা। তা কখনো কখনো কারো জন্য যন্ত্রণা বা আনন্দের বিষয় হয়েও দেখা দেয়। সময় মত না আসার কারণে হেনা, কামরান এমন কি তার মা আর বোনগুলোও বেশ অস্থির হয়ে উঠেছিলো। যদিও তাদের জন্য রাহুল তেমন কিছুই করেনি। সামান্য কিছু সময় কথা বলেছে কেবল। আর এর ভেতর দিয়েই কখন যে তাদের মনেও তার জন্য একটি ভালোবাসার আসন তৈরী হয়ে গেছে যারা তাকে ভালোবাসে তারাও হয়তো বলতে পারবে না।

রাহুলকে দেখতে পেয়ে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে হেনার মা বললেন, কি হয়েছিলো তোমার?

রাহুল আরো বেশি অবাক হয়ে বললো, তেমন কিছু হয়নি তো!

না হলেই ভালো। সোমবার আসবে কথা দিয়ে গেলে, পর পর দু’টো সোমবার পেরিয়ে গেলে আমরা তো ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। আর বেচারি হেনা তো অসুখই বাঁধিয়ে ফেলেছিলো। দুদিন শুয়ে থেকে আজ কাজে গেছে।

রাহুল বিস্মিত হয়ে ভাবে, এত কিছু ঘটে গেছে! তখনই তার মনে হলে এ মুহূর্তে নিরব থাকাটাও ভালো দেখাচ্ছে না। তাই সে বলে উঠলো, তাহলে তো খুবই অন্যায় হয়ে গেছে! আমার উচিত ছিলো হেনার ওখানকার ফোন নাম্বার নিয়ে যাওয়া।

সেটাই হয়তো ভালো হতো। মেয়েটা যে এত অস্থির হয়ে উঠবে ভাবতে পারিনি। আর বাবা তোমরা কেমন মানুষ? মেয়েটা তোমার ঠিকানা জানে না। বলছিলো, ঠিকানা জানা থাকলে অবশ্যই তোমাকে দেখতে যেতো।

ঘরে ঢুকে তিনি কামরানকে বললেন, রাহুল এসেছে।

রাহুলকে দেখতে পেয়ে কামরানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সে বললো, আসেন, আসেন! আমাদের তো মহাসংকটে ফেলে রেখেছেন!

রাহুল এগিয়ে গিয়ে কামরানের হাত ধরে বললো, ভুলটা আসলে আমারই হয়েছে। কাজের চাপে দিনক্ষণের কথা মনে ছিলো না।

যাক! তবুও তো ভালোয় ভালোয় এলেন। ও তো ভাবছিলো আপনার খারাপ কিছু হয়ে থাকবে।

ঠিকানা ছিলো না বলে ছুটে যাওয়াটা বাকি আছে।

ছি ছি! না বুঝেই আপনাদের কতটা মানসিক কষ্ট দিলাম!

আজ আপনি যেতে পারবেন না। যত কাজই থাকুক। কষ্ট করে হলেও আজ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।

রাহুল সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো, এতে যদি আমার প্রায়শ্চিত্ত হয় তাতে আমি রাজি আছি। এখন হেনাকে কি করে মুখ দেখাবো? বলতে বলতে রাহুল কামরানের পাশে একটি ছোট টুলের উপর বসে পড়লো।

কামরান হাসতে হাসতে বললো, দেখেন আপনাকে কিল-ঘুষি মেরে বসে কি না! তারপর চাপা স্বরে বলে উঠলো এটাকে মমতা বলবো না প্রেম বলবো?

প্রথম আমার দিক থেকে প্রেমই ছিলো বলতে পারেন। বিয়ের প্রস্তাব দিতেও এসেছিলাম। তবে শুরুতেই আপনার বউ আভাস দিয়েছিলো। কিন্তু আমি ব্যাপারটা তেমন পরিষ্কার করে বুঝতে পারিনি। নয় তো আমার ভুল হবার সম্ভাবনা ছিলো না।

আপনি খুবই ভাগ্যবান। হেনাও মেয়েটা খুব ভালো!

ভাগ্যবান তো আপনি!

তাতো স্বীকার করছিই। আপনিও।

হয়তো বা। প্রথম প্রথম কারো সম্পর্কটা এত সহজ হয় না। আসলে তাদের ভাই নেই তো, আমাকে ঠিক ভাই হিসেবেই ভালোবেসেছে হয়তো। কিন্তু আমি এতটাই নির্বোধ যে, বুঝতে পারিনি।

তারও কোনো ভুল হয়ে থাকবে। শুরুতেই যদি ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যেতো তাহলে আপনিও মনের দিক থেকে হোঁচট খেতেন না।

রাহুল হেসে উঠে বললো, হোঁচট খেয়েছি বলা যাবে না। একটি সম্ভাবনার কথা ভেবে সতর্ক হয়েই এগিয়েছিলাম।

আমিও ব্যাপারটা ভেবে দেখেছি। প্রথম প্রথম ও যখন এসে আপনার কথা আমাকে বলতো, এমন একটা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে ধরেই নিয়েছিলাম। তবুও ভালো যে তেমন কিছু ঘটার আগেই আপনার ভুলটা ভেঙে গেছে।

রাহুল দেখলো কামরানের চোখে মুখে কেমন একটা আত্মতৃপ্তির ছাপও ফুটে উঠেছে। কিন্তু রাহুল যদিও ভাইবোনের প্রসঙ্গ টেনে ব্যাপারটাকে কামরানের চোখে আড়াল করেছে এমন কি হেনাও যদি তা বলেই তাকে প্রবোধ দিতে চায় তবুও সে মন থেকে কিছুতেই মানতে পারবে না। একজন নারী যখন কাউকে ভালোবাসে সেটা সাময়িক হোক আর হঠাৎ করেই হোক তাতে কোনো প্রতারণা থাকে না। পরে কোনো কারণে হয়তো নিতান্তই বাধ্য হয়ে সে প্রতারণা বা মিথ্যের আশ্রয় নেয়। হেনার ব্যাপারটাও তেমনি কিছু হয়ে থাকবে হয়তো।

সন্ধ্যার দিকে রাহুল একবার বেরিয়ে গিয়ে শরিফ সাহেবের সঙ্গে দেখা করে চব্বিশ তারিখেই তার যাবার দিন স্থির করতে বলে এসেছে। রুহুল আর জিনু যখন বাসর ঘরে থাকবে, তখন সে হয়তো পেরিয়ে যাবে জন্মভূমির সীমানা। সেটাই হয়তো সব দিক দিয়ে ভালো হবে। বাবা মায়ের মন খারাপ হবে না। রাহুলও অস্বস্তিতে পড়বে না। সে সঙ্গে অপ্রিয় আরো অনেক জিজ্ঞাসার হাত থেকেও বেঁচে যাবে সে নিজেও।

ফিরে আসার সময় বিভিন্ন বইয়ের দোকান ঘুরে কামরানের জন্য ভালো ভালো কটি বই নিয়ে এসেছে রাহুল। সেগুলো পেয়ে কামরান এতটাই খুশি হলো যে, পারলে কেঁদে ফেলে। সে আবেগ মথিত হয়ে বললো, চলতে ফিরতে পারি না বলে কতদিন বাইরেও যেতে পারি না। পারি না লাইব্রেরিতে যেতে। হেনাদের অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, দামী বই তো দূরের কথা শুক্রবার একটি দৈনিক পত্রিকা আনবে সে সামর্থও তাদের হয় না। যে কারণে সাম্প্রতিক সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারি না!

বই হাতে পাওয়ার পর কামরান একটি বই শুঁকে নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে সেটাতেই এক সময় বুঁদ হয়ে যায়। পাশে যে রাহুল বসে আছে তা যেন তার খেয়াল থাকে না।

রাত সাড়ে দশটার দিকে হেনারা চারবোন বাড়ি ফিরে রাহুল আসার সংবাদ পেয়েই তাকে সবাই ঘিরে ধরলো। হেনার অবস্থা যা দেখলো রাহুলের মনে হলো পারলে সে জড়িয়েই ধরতো। হয়তো কামরান আছে বলে নিজকে সামলে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবু সে নিয়ন্ত্রিত ভাবে এগিয়ে এসে রাহুলের একটি হাত দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো, কি হয়েছিলো আপনার? আমার তো কেবল পাগল হইতে বাকি ছিলো!

আমার তেমন কিছু হয়নি। কাজের চাপে আর আসা হয়ে ওঠেনি।

কী এমন কাজ হঠাৎ করে এসে হাজির হইলো?

সবই বলবো। আগে ফ্রেশ হয়ে নেন। আমি আজ কোথাও যাবো না। সব বলবো!

সত্যি?

হেনার দৃষ্টিতে যেন হিরকের দ্যুতি চমকায়। মুখের ভাবটা মুহূর্তেই প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। কেউ দেখলে বলবে না যে, সে এখনি সারাদিনের গাধার খাটুনি সেরে ঘরে ফিরে এসেছে।

কামরান বইয়ের পাতা থেকে দৃষ্টি তুলে বললো, তোমাদের কথা ভেবেই আজ থেকে যেতে বলেছি। ওকে চোখের দেখা এবার না দেখলে তো তোমার ঘুম হবে না।

তুমি তো ঠিকই ঘুমিয়েছো!

অথর্ব মানুষ আমি। কামরানের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। আমার জেগে থাকলেই কি আর ঘুমিয়ে থাকলেই কি। দু’টোই তো এক অর্থে সমান!

বই পেলে কোথায়?

রাহুল নিয়ে এলো।

তাহলে তো তোমার খাবার পেয়ে গেছ। আজ আর ঘুমাতে হবে না!

কামরানের মুখটা ফের হাসি হাসি হয়ে উঠলো। কতদিন বই চোখে দেখি না। রাহুল সাহেবকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। বইগুলো শেষ করতে না পারলে আমার এমনিতেও ঘুম হবে না।

রাহুল হেনার দিকে ফিরে বললো, ঝগড়া করার জন্যে পুরোটা রাতই আছে। এখন যান তো!

চা খেয়েছেন?

হুঁ। শরিফ সাহেবের সঙ্গে একটা কাজ ছিলো। সেখানে কফি খেয়ে এসেছি।

আরে ঘরেই তো চা এনে রেখেছি! মা কি দিতে ভুলে গেল?

চা খাওয়ার সময় অনেক আছে। আপনি এখন যান।

হেনা বললো, শান্তা আগে তারপর অন্তরা। আমার সুযোগ হবে মিথিলার পর। একটা মাত্র বাথরুম আমাদের।

রাহুল বললো, আরেকটা বানিয়ে নিলেই তো পারেন।

আপনার যা কথা! মজা করছেন, না?

কেন? মিথিলা এত এত টাকা জমালো সেগুলো কোথায়?

নিজের প্রসঙ্গ উঠতেই মিথিলা বলে উঠলো, মা সব টাকা তুলে ফেলেছে।

কেন?

আপু বলতে পারবে।

আমাদের দুঃসময়টাতে টাকাগুলো খুবই কাজে এসেছে। বলতে বলতে হেনা মিথিলার দু’গালে আদর করে চুমু খেলো একবার।

তারপর রাহুলের দিকে মুখ তুলে আবার বললো, ও যদি অ্যাকাউন্ট করতে জেদ না ধরতো তাহলে এ সময়টাতেই মনে হয় আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাইতাম!

তাহলে বলতে হয় মিথিলা মেয়েটা অনেক বুদ্ধিমতি!

তা বলতে পারেন! বলে, হেনা মিথিলাকে ছেড়ে দিয়ে বললো, তিনবোনের বাথরুমের কাজ সারতে এক ঘন্টারও বেশি সময় লাগবে। ততক্ষণ কি কথাই বলবো? চা বানিয়ে আনি?

আনবেন?

আসলে এ সময় আমরা সবাই মিলে একবার চা খাই। আজ আপনি আছেন বইলা হয়তো ওই দুইজন পালাইছে!

ঠিক আছে।

কামরান বললো, আমাকেও এককাপ দিও।

হেনা আর মিথিলা চলে গেলে কামরান বললো, আজ ও নিজেও ঘুমাবে না আপনাকেও ঘুমাতে দেবে না।

আসলে এ বাড়িতে রাহুলের ঘুমের জায়গা হবে কি না তারই কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো ড্রয়িং রুমেই তাকে সময় পার করতে হবে। তা ছাড়া একদিন না ঘুমালে কী আর অসুবিধা হবে!

কামরান বললো, মাঝে মাঝে ও এতটাই বেশি কথা বলে যে, মনে হয় কানের পোকা মেরে ফেলবে। আমি ক্লান্ত হয়ে যাই।

রাহুল মনে মনে বললো, ভালোবাসা যখন পানসে হয়ে যায় তখন স্বামী-স্ত্রীর একজনের কথা আরেক জনের কাছে বিরক্তিকরই মনে হয়।

রাহুলকে চুপ থাকতে দেখে কামরান আবার বললো, আমি তো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাই। এমনিতে ঘুম আমার আসে না। তখন হেনার কথা যতক্ষণ শেষ না হয় ততক্ষণ আমি ওষুধ খাই না। বলে হাসতে লাগলো সে।

হেনা চা নিয়ে এসে কামরানের পাশে এক কাপ রেখে বললো, বারোটার আগেই তোমাকে বই রাখতে হবে। রাত জাগতে পারবে না। ব্যথা বাড়লে একা একা কষ্ট পাবে।

সেটাই ভাবছি।

তারপর কামরান বললো, তোমরা যদি কষ্ট করে ও ঘরে চলে যেতে তাহলে তোমাদের জন্য ভালো হতো।

ওরা এ ঘরে আসতেই মিথিলার মা এসে বললেন, রাহুলকে ফ্লোরে ঘুমাতে দিলে কি মনে কষ্ট পাবে বাবা?

রাহুল হেসে উঠলো। বললো, গ্রামের বাড়ি গেলে এখনও আমি মেঝেতে ঘুমাই।

দেখো, মন রাখার জন্য কথা বলো না যেন।

আমি মন রাখার জন্য কথা বলতে পারি না।

শুনে খুশি হলাম।

তারপর তিনি বললেন, যাই। কি আয়োজন করা যায় দেখি।

হেনা চায়ে চুমুক দিয়ে রাহুলের পাশে বসে বললো, এবার বলেন, কী এমন জরুরি কাজ পড়ে গেল?

হরিচরণ মাস্টারের দানপত্র, আকস্মিক স্বেচ্ছা মৃত্যু থেকে আরম্ভ করে তাঁদের বাড়ির দেয়াল আর মন্দিরের কথা বলতেই হেনা বলে উঠলো, তা হইলে তো আপনের আর অভাব নাই!

তা বলতে পারেন। বলে চায়ে চুমুক দেয় রাহুল।

কেমন সম্পদ হবে? বলে ভ্রু তোলে হেনা।

বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী আশি-নব্বই লাখ হয়ে যাবে।

হেনা যেন সত্যিই বিস্মিত। চোখ দু’টো গোল গোল করে তাকিয়ে রইলো। সে দৃষ্টির সামনে রাহুলের কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো।

এ প্রসঙ্গটাকে থামাতেই সে বলে উঠলো, কামরানের চিকিৎসার ব্যাপারে কী ঠিক করলেন?

কি আর! এসব নিয়া চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমাদের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাটাই প্রধান। আর কিছু ভাবার সুযোগ নেই।

ধরেন হঠাৎ করে কিছু টাকা পেয়ে গেলেন, তাহলেও কি হবে না?

আপনি তো এখন বড়লোকদের একজন। পেয়ে যেতেও পারি। কি বলেন? বলে হাসলো সে। কিন্তু রাহুলের মনে হলো যে, কোনো কারণে সে যেন মন থেকে হাসতে পারলো না।

মজা করছি না। কামরানের ব্যাপারটা নিয়ে সত্যিই আমি সিরিয়াস!

তাহলে লাখ দেড়েক টাকা দিয়ে দেন। হাঁটুর প্লেট দু’টো রিপ্লেস করাইতে পারতাম।

আমাদের দেশে কি সম্ভব?

এখন সবই সম্ভব।

তারপর চায়ের কাপ রেখে দিয়ে হেনা বললো, আমরা যেটুকু ভালোবাসা নিয়ে সংসার পাতার জন্য বিয়ে করেছিলাম, এ দু বছরে তা নি:শেষ হয়ে গেছে। কেউ কাউকে আর ভালোবাসতে পারি না।

রাহুল বললো, এটা কেমন কথা। আমি তো দেখছি সবই ঠিক আছে।

ওটা বাইরের দিক থেকে। অভ্যেসটা রয়ে গেছে। একটি বিড়ালরে পুষলেও তারে হঠাৎ ফেলে দেওয়া যায় না। আর কামরান তো একজন মানুষ। তার উপর খুবই ভালো মানুষ।

হেনা একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে কোনো একটা অস্বস্তি কাটালো কিংবা কিছু একটা নিয়ে ভেবে আবার বললো, কামরান তো অনেক আগেই বলে দিয়েছে তাকে ছেড়ে দিতে। আমার বোঝা হয়ে থাকতে তারও নাকি খারাপ লাগছে। কিন্তু একজন অচল মানুষরে কিভাবে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেই। তাই আর পারি নাই। আমাদের চার বোনের আয়ের বড় একটা অংক খরচ হইয়া যায় তার পিছনে।

হরিচরণ স্যারের স্ত্রী লাখ দুয়েক টাকা দান কাজে খরচ করতে বলেছেন।

আপনি রাজি থাকলে সে টাকাটা আমি কামরানকে দিতে পারি।

আমার রাজি হওয়ার কি আছে? হেনার চোখ মুখ সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো, তারে সুস্থ করতে দরকার হইলে আমি ভিক্ষা করতাম। কিন্তু দিনদিন মানুষটা আমার কাছে অসহ্য হইয়া উঠতেছে। মন থেকে তার জন্য কিছু করতে পারি না। আসলে আমি এখন তার বিনা পয়সার নার্স। আর কিছু না। আমারও যে তারে কখনো প্রয়োজন ব্যাপারটা যেন সে ভুইলাই গেছে! বলে, শব্দ করে হাসতে লাগলো হেনা। কিন্তু এবারও রাহুলের মনে হলো তার হাসিটা যেন ঠিক স্বাভাবিক নয়।

রাহুল বললো, কাল-পরশু কি আমরা ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করতে পারি?

আপনি চাইলে করতে পারেন।

আপনার আগ্রহ নেই?

থাকলেও সময় দিতে পারবো না। এই কষ্টটা আমার জন্য কি করবেন না?

তা না হয় করলাম। কিন্তু হাসপাতালের ব্যাপারগুলো সামলাবে কে?

সেটা যখনকারটা তখনই দেখা যাবে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমার হাতে ততটা সময় নেই।

কথাটা শুনেই হেনা কেমন চমকে উঠলো যেন। বললো, কি বললেন?

কাপটা রেখে দিয়ে রাহুল বললো, আমার ততটা সময় নেই। শ্রীলঙ্কা যেতে হবে। শরিফ সাহেবই সব কিছু ঠিক করে দিলেন। সেখানে নাকি একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ভাড়া নিয়েছেন ওরা।

যাওয়ার দিন ঠিক হইলো কবে?

চব্বিশ তারিখ।

সঙ্গে সঙ্গেই হেনার মুখটা কেমন কালো হয়ে গেল। কিন্তু বুঝতে পেরেও রাহুল সে ব্যাপারে ইঙ্গিত না করে বললো, দু’লাখ টাকার চেক সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আপনি বললে, কালই সেটা মিথিলার অ্যাকাউন্টে জমা করিয়ে দেবো। বলতে বলতে রাহুল পকেট থেকে বিভাবতীর সাইন করা চেকটা বের করে হেনার দিকে বাড়িয়ে ধরলো।

হেনা চেকটা দু’হাতে মেলে ধরে তখনই চিৎকার করে উঠলো, আম্মা! আম্মা!

তার চিৎকারের ভেতর এমন কিছু ছিলো যে, তিনি তখনই ছুটে এলেন।

হেনা চেকটা দেখিয়ে বললো, কামরানের চিকিৎসার খরচ রাহুল নিয়ে আসছে!

ভদ্র মহিলার চোখ দু’টো কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলেও কিছু বলতে পারলেন না যেন। ঠোঁট দু’টো বার কয়েক সামান্য কাঁপলো কেবল।

মাঝ রাতে বুকের উপর চাপ পড়তেই হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল রাহুলের। মুখে চোখে কারো গরম নি:শ্বাস টের পায় সে। চোখ মেলতেই দেখতে পায় তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে হেনা।

রাহুল চমকে উঠে বললো, একি! আপনি?

হেনা তখনই মাথা তুলে রাহুলের মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বললো, শরিফ সাহেবরে বইলা কয়দিন পর আমারেও তোমার ওখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করবা। পারবা না?

কিন্তু, বলে, আরো কি একটা বলতে নিয়েও বলতে পারলো না রাহুল। তখনই আচমকা তার দু’ঠোঁটে চেপে বসে হেনার দু’ঠোঁট।

রাহুলের যদিও মনে হয় হেনা ঠিক কাজ করেনি। নৈতিকতার দিক থেকে অনেকাংশে সে সরে এসেছে। সে সঙ্গে পথভ্রষ্ট করেছে তাকেও। কিন্তু তারপরও রাহুল কেন যেন খুব জোর দিয়ে হেনার অন্যায়ের দিকে আঙুল তুলতে পারে না। হয়তো বা নিজেই তার প্রতি দুর্বল ছিলো বলে, তার মনও নানা যুক্তি দিয়ে হেনাকে নির্দোষ প্রমাণ করে তোলে। তা ছাড়া হেনা যে অন্যায় করেনি তাও হয়তো সে অনেকগুলো দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরতে পারবে। তাই রাহুল নিজকেই প্রবোধ দেয়। পৃথিবীতে অনেক ঘটনাই ঘটে যেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট করে কাউকে তেমন অভিযুক্ত করা যায় না হয়তো।

কামরানকে হাসপাতালে ভর্তি করানো থেকে তার আত্মীয় স্বজনকে সংবাদ দেয়া নিজের জন্য কেনাকাটা নিয়ে দিন তিনেক খুবই ব্যস্ততায় কাটলো রাহুলের। যদিও হেনা বলেছিলো সে সময় দিতে পারবে না। কিন্তু সে কাজে যাওয়া বন্ধ রেখেই বলতে গেলে সেঁটে রইলো রাহুলের সঙ্গে। যদিও রাহুল এতে খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু মনের কোথাও যেন একটু অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করে বিঁধছিলো। হেনা হয়তো জেনে বুঝেই তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে সর্বান্তকরণে। তবুও তার মনে হচ্ছিলো বেচারা কামরান এর কিছুই জানে না। তার স্ত্রী কখন অন্যের অধিকারে চলে গেছে, কখন তার বাহু বন্ধন থেকে খসে পড়েছে। এ দু’বছরে যেমন তার কিছুই উপলব্ধি করতে পারেনি, তেমনি তাকে ঘুম পাড়িয়ে সে অবসরে হেনা কোন জগতে চলে যাচ্ছে তাও উপলব্ধি করতে পারছে না। কামরানের জন্য খুবই খারাপ লাগছিলো রাহুলের। হেনা এভাবে এতটা মুখিয়ে ছিলো সেই বা কী করে আগে থেকে অনুমান করবে?

দু’তিনদিনে হেনাও যেন তার পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুন হয়ে উঠেছে। এতদিনকার হারিয়ে যাওয়া ছন্দ যেন সে আবার ফিরে পেয়েছে। কিন্তু তার নবরূপ দেখে কামরান ভাবে অন্যটা। সে ধরে নেয় তার চিকিৎসা করানোর আনন্দে কিংবা সে আবার সুস্থ হয়ে হাঁটাচলা করতে পারবে ভেবেই হয়তো ফের উচ্ছ্বল হয়ে উঠেছে হেনা। তাই তার মুখাবয়বও ছিলো বেশ প্রসন্ন। একটি বারের জন্যও সে প্রশ্ন করেনি যে, তার চিকিৎসার জন্য এতগুলো টাকা কিভাবে ম্যানেজ হলো? কে দিলো? কেনই বা দিলো?

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন কামরান যেন অন্য মানুষ। হয়তো সে ধরেই নিয়েছিলো যে, তার ভবিষ্যত হুইল চেয়ারেই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু যখন জানলো সে সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠতে যাচ্ছে, তখনই জেগে উঠলো তার স্থবির হয়ে পড়া কাব্য প্রতিভা। খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই সে একটানা লিখে চললো। সবাই জেগে ওঠা অবধি সে লিখলো। মিথিলার পুরোনো চার নাম্বার খাতা দু’টো কবিতা লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। রাহুলকে দেখতে পেয়ে সে বলে উঠলো, জেগে উঠছি। যেন বেঁচে উঠছি আবার। ভাবতে পারিনি আর কখনো কবিতা বের হবে আমার মাথা থেকে।

রাহুল বললো, একজন কবির বেঁচে থাকাই হচ্ছে কবিতার মাঝে। সে যখন কবিতা লেখা ভুলে যায় কিংবা থেমে যায় তার সৃষ্টিশীলতা তখনই একজন কবির প্রকৃত মৃত্যু হয়। তখন বেঁচে থাকে তার কায়া।

কামরানের দাড়ি-গোঁফে পূর্ণ মুখাবয়বে যেন আলোর দ্যূতি চমকাচ্ছে বারংবার। হেনাকে ডেকে সে বললো, হেনা আমি আবার বেঁচে উঠছি মনে হয়।

একজনের আবেগ অনেক সময় তার পার্শ্ববর্তী বা সম্মুখের জনকেও কখনো কখনো ছুঁয়ে যায়। হেনাও যেন প্রাণ চাঞ্চল্যে অভিসিক্ত হয়ে বলে উঠলো, আমরাও চাই তুমি বেঁচে ওঠো। পুরানো দিনগুলার মত টিএসসির মঞ্চ আবার তোমার কবিতার ছন্দে কাঁইপা উঠুক!

রাহুল কেমন মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো হেনার মুখের দিকে।

হেনা আবার বললো, তুমি কি নিজে নিজে দাড়ি-গোঁফগুলো কাটতে পারবা? নাকি নাপিত আসতে বলবো?

কামরান হেসে উঠে বললো, কষ্ট করে যদি ব্লেড-রেজর, সাবান আর পানি এনে দিতে পারো তাহলে দশ মিনিটেই চেহারা পাল্টে ফেলবো।

তোমাকে আর কিছুক্ষণ পরই হাসপাতালে নিয়ে যাবো। অ্যাম্বুলেন্স আসতেছে।

এ পর্যন্ত হেনার পরিবর্তনটা কারো চোখে না পারলেও কাজে যাওয়ার সময় মিথিলা তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, আপু তোমারে আজকে খুবই সুন্দর লাগতেছে!

হেনা কেমন চমকে উঠে তাকালো রাহুলের দিকে। রাহুলের চোখে চোখ পড়তেই তার মুখাবয়ব আরক্ত হয়ে উঠলো একই সাথে।

সে নিজকে আড়াল করতে বা লজ্জা ঢাকতেই হয়তো কামরানের দাড়ি-গোঁফ কাটার সরঞ্জামের যোগাড়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে কামরানের সামনে সেগুলো রেখে হেনা রাহুলকে বললো, তুমি বলতেছিলা না যে, তোমার গ্রামের বাড়ি যাওয়া দরকার?

হেনার কথা শুনে কামরান আর রাহুল দু’জনই চমকে উঠে ফিরে তাকায়।

হেনা এতটাই টগবগ করছে, স্থান-কাল-পাত্র ভুলে সে কি করছে বা বলছে তাও হয়তো খেয়াল করতে পারছে না। একই উচ্ছ্বাসে আবার বললো, আমাদেরে হাসপাতালে দিয়াই তুমি চইলা যাও! তেইশ তারিখে এখানে চইলা আসবা আর এয়ারপোর্টেও এখান থাইকাই যাইবা!

এতক্ষণে কামরান কৌতুহলী হয়ে উঠলো রাহুলের ব্যাপারে। বললো, হঠাৎ করে এয়ারপোর্ট কেন?

আরে তুমি তো কিছুই জান না! বলে, খানিকটা কামরানের দিকে এগিয়ে গিয়ে হেনা আবার বললো, ওর শ্রীলঙ্কায় চাকরি হইছে! আমাদের আগের মালিক নাকি সেখানে একটা ফ্যাক্টরি ভাড়া নিছেন। চব্বিশ তারিখ ফ্লাইট!

কামরানের মুখের উজ্জ্বলতা নিমেষেই যেন ম্লান হয়ে যায়। বিষাদ কন্ঠে বলে, একেই হয়তো ছাপ্পড় ফেড়ে পাওয়া বলে। রাহুল সাহেবের সব অপূর্ণতাই পূর্ণ হয়ে উঠছে!

রাহুল কামরানের কথা শুনেই মনে মনে কেমন শক্ত হয়ে উঠলো। কামরান কি তাহলে সবই ধরতে পেরেছে? হেনার উচ্ছ্বলতা, কাজে না গিয়ে তার সঙ্গে নানা ছুতোয় লেপ্টে থাকা! এমন কি তার সামনেই হঠাৎ করে দীর্ঘদিনের পরিচিতের মত তুমি তুমি করে বলা!

তখনই সে ঠিক করে ফেলে যে, গ্রামের বাড়িই যাবে। যদিও সে ভেবেছিলো কামরানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরই যাবে। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরটা যদি গোপনে গোপনে রঙিন হয়ে ওঠে তা সে কোনোভাবেই আড়াল করতে পারে না। আর নিজের অজান্তেই কথায় আর কাজে স্ফুরিত আবেগ উচ্ছ্বাসের কারণেই প্রকাশ হয়ে যায় তার গোপনে কিছু ঘটে যাবার ব্যাপারটা। কিন্তু ঘটনা যদিও সবাই আঁচ করতে পারে না, তবুও আড়ালে আড়ালে কিছু একটা ব্যাপার যে ঘটেছে বা ঘটছে তা নিশ্চিত হয়ে যায়। হেনার জীবনে তেমনি কোনো নতুন একটা কিছু হয়তো আঁচ করতে পেরেছে কামরান। আর সে কারণেই তার উজ্জ্বল মুখ হঠাৎ করেই বিষাদে ছেয়ে গেছে।

রাহুল বললো, অ্যাম্বুলেন্স আসবে দশটার দিকে। আপনারা সব দিক সামাল দিতে পারবেন তো?

হেনা ঝলমলিয়ে উঠে বললো,অসুবিধা নাই! আম্মা আর শান্তাও যাইতেছে!

ঠিক আছে। তাহলে দেরি করে লাভ নেই। হাসপাতালে নামিয়ে দেওয়া যে কথা, এখান থেকে চলে যাওয়াও একই কথা।

তা অবশ্য ভুল বল নাই! বলে, তখনই হেনা আবার রাহুলের একটি বাহু ধরে বলে উঠলো, তেইশ তারিখে এখানে আইসাই উঠবা কিন্তু!

রাহুল একবার কামরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, চলি!

তারপরই সে ব্যাগটা তুলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়।

কামরান পেছন থেকে বলে উঠলো, হাসপাতালে আমাকে দেখতে আসবেন কিন্তু!

রাহুল পেছন ফিরে তাকাতে পারে না কামরানের দিকে। তার ভয় হয় কামরানের চোখে সে পানিই দেখে কি না। সে পেছন না ফিরে একবার মাথাটা কাত করে শুধু।

(সমাপ্ত)

***ভিন্ন ব্লগে আগে প্রকাশিত।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


7 Responses to উপন্যাস: ছায়াম্লান দিন

  1. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 5, 2010 at 8:37 পূর্বাহ্ন

    আপনার সুচিন্তিত ভাবনা ভালো লাগলো। সবটা পড়তে গিয়ে যে ধৈর্য হারাননি সে জন্যে আরো একবার ধন্যবাদ। :heart: :rose:

  2. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 5, 2010 at 8:37 পূর্বাহ্ন

    :heart: :rose:

  3. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 6, 2010 at 8:41 পূর্বাহ্ন

    গল্পের গতি, ধারা, ভাষা বিন্যাস নিয়ে কোন প্রশ্ন নাই তবে একখান কথা হইল কি বেশ বড় হইলে স্ক্রিন তাল রাখা কঠিন হইয়া যায়। শেষ পর্যন্ত আমি কি করছি জানেন? পুরোটা ওয়ার্ডে সেভ কইরা ছোট ছোট :rose: :rose: :musicnote: কইরা পড়ছি।

    • juliansiddiqi@gmail.com'
      জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 6, 2010 at 8:06 অপরাহ্ন

      বুদ্ধিমানরা কখনো কোথাও আটকা পড়ে থাকে না। বাধা তাদের বেশিক্ষণ থামিয়ে রাখতে পারে না। :-D

  4. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি জানুয়ারী 31, 2011 at 2:36 অপরাহ্ন

    এক কথায় অসাধারণ উপস্থাপনা ।

  5. রাজন্য রুহানি জানুয়ারী 31, 2011 at 4:27 অপরাহ্ন

    সরি, মিস হয়ে গিয়েছিল। পুরোটা পড়লাম। তারপর নিজের “প্রিয়” বাড়িতে তুললাম।

You must be logged in to post a comment Login