ছড়াকার ফারুক হোসেনের সাক্ষাৎকার

শিশুসাহিত্য মার্জিত ও পরিচ্ছন্ন সাহিত্য

ছোট্ট একটি মনের জন্য যে মন কেঁদে ওঠে, আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, নেচে ওঠে বৃষ্টির মতো সেই মানুষটি একজন শিশু মানুষ। শিশু মনের মানুষ। ছোটদের মনকে ভালোবেসে কখনোই বড় হয়ে ওঠেনি, কুটিল হয়ে ওঠেনি, জটিল হয়ে ওঠেনি। রয়ে গেছেন ছোট বুলবুলিটির মতো, রয়ে গেছেন কুঁড়ির মতো, রয়ে গেছেন শরতের ছোট্ট শুভ্র মেঘমালার মতো। তিনি আমাদের সকলের প্রিয় মানুষ ফারুক হোসেন।
তিনি প্রতিটি ভোরের প্রার্থনার মতো সত্য বয়ান করেন। আদর্শ, নৈতিকতা, সৌন্দর্য বিলিয়ে যান গোলাপের মতো। অনবরত সৃজন করেন ছোট্ট সোনামণীর মুখের বয়ান এবঙ তার পরতে পরতে ছড়িয়ে দেন সোনালী আঁশের মতো সোনালী নূর। সূর্যালোয় যেভাবে জেগে ওঠে নতুন প্রাণ। প্রাণে প্রাণে জাগে নয়া প্রাণ সে প্রাণের জন্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন নতুন আদর্শলিপি।
ফারুক হোসেন চাঁদপুরের ইলিশের ঝাঁকের মতো মেঘনায় রূপালী ঝলক দিয়ে ওঠেন ঊনিশ একষট্টি সালের এক জানুয়ারীর। ফিরোজা বেগমের কোলে নেমে আসে চাঁদপুরের চাঁদের টুকরোটি। ‘আল্লাহু আকবার; আল্লহু আকবার’ আজানের সুর শুনেই পিতা আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাতে উড়িয়ে দেন শুভ্র কবুতর। রহমত হয়ে নেমে আসে চাঁদের কোমল জোছনা। সেই জোছনার সাথে কথায় কথায় কথার বুনন করে লুটোপুটি, উড়োচিঠি, নকখপতা, ছড়ার জলে জোসনা জ্বলে, টোকিওর টুকিটাকি, একুশের ছড়া কবিতা, পামস্যার, বিশ্বদিবস, কাচ পাহাড়ের রাজকন্যা, সূর্যঘড়ি ও অন্যান্য, বায়োস্কোপ, হঠাৎ হলো জংলী হাতি, সজাগ থাকার দিন, লম্বা মোটা বেঁটে, জোড়াতালি, ফুল ফোটানোর বুড়ো, পাতায় পাতায় ছড়া, বাংলাদেশের মেলা, রূপবদলের খেলা, জাতীয় দিবস, নজর কাড়া নিহন, গল্প নিয়ে গল্প, জাপান মানেই জমজমাট, উড়ানপাখি, রমণীয় রোম, পাখি এবঙ পাখি, দীর্ঘশ্বাস, শত রকমের ছড়া, কিশোরসমগ্র সৃজন করে খেলে যায় তাঁর মাছরাঙা সময়।
দুই হাজার দশ সালের ত্রিশ সেপ্টেম্বর সূর্য যখন হেসে ওঠে সোনালী আঁশের ফাঁক গলে তখন ফারুক ভাইয়ের সাথে চায়ের আড্ডায় মিলিত হই আমি আফসার নিজাম তাঁর কর্মস্থল আন্তর্জাতিক পাট স্টাডি গ্র“প-এ। সবুজ পাতা যেমন বৃষ্টির পরশে মেলে ধরে তার সজিবতা তেমনি সেদিন মেলে ধরেছিলো কিছু সবুজ বয়ান। তাই লিপিবন্ধ করা হলোÑ

আফসার নিজাম : কেমন আছেন ফারুক ভাই??

ফারুক হোসেন : ভালো আছি।।

আফসার নিজাম : ঈদ কেমন কাটিয়েছেন??

ফারুক হোসেন : যেমন কাটাই তেমনি।।

আফসার নিজাম : গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন??

ফারুক হোসেন : না ঢাকাতেই ঈদ করেছি।।

আফসার নিজাম : ঢাকার ঈদ কি খুব মজা??

ফারুক হোসেন : আমার কাছে ঢাকার ঈদে আনন্দটা তখনই, যখন ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়। ফাঁকা, ছিমছাম পরিবেশটাই মূলত কাম্য। ফাঁকা অর্থ আমি এটা বুঝাচ্ছি, মানুষ নেই বা কমে গেছে তা নয়। ঢাকার যে ধারণ ক্ষমতা, সে ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষ আছে। সুতরাং শৃঙ্খলা রাখা সম্ভব এবঙ মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা রাখাও সম্ভব। যখন অতিরিক্ত মানুষ হয়ে যায় তখন কারো প্রতি কারো সহমর্মিতা থাকে না। মমতা থাকে না। আন্তরিকতাও থাকে না বা হেল্প করার প্রবণতা সেটাও থাকে না। সব কিছুই সীমার বাইরে চয়ে যায়।।

আফসার নিজাম : এটা কি নগর সংস্কৃতির প্রভাব। নাকি পুঁজির কেন্দ্রীভূত করার প্রভাব কাজ করছে??

ফারুক হোসেন : এটায় পুঁজির কোনো প্রভাব নেই। এটা আমাদের শাসন ব্যবস্থায় দুর্বলতা। আমরা যদি বিনিয়োগ এবঙ কাজকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারি, যদি সব জেলায়, উপজেলায়, অঞ্চলে নিয়ে যেতে পারি তা হলে মানুষ কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে, সেখানে সে পরিবার নিয়ে বসবাস করবে। কোনো কারণ নেই মানুষ শহরে কষ্টের মধ্যে বসবাস করতে চায়। কারণ একটাই শহরে এসে সে কাজ পায় এবঙ সব কাজের যে ক্ষমতার সুত্র, প্লাটফরম সবই ঢাকা কেন্দ্রীক। সে কারণেই সবাই এখানে ছুটে আসে।।

আফসার নিজাম : তা হলে আপনার প্লানটি হলো সম্পূর্ণ বাংলাদেশকে এক সাথে কর্মচঞ্চল করে তোলা।।

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ এক জায়গায় না থেকে ছড়িয়ে যাবে।।

আফসার নিজাম : প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকিকরণের প্লানের সাথে কি সাহিত্য কিছু করতে পারে??

ফারুক হোসেন : যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সারাদেশের সব জায়গায় সমানভাবে হবে; ঠিক একইভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও সারাদেশে সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। এখন একটা গতানুগতিক ধারনা সবার মধ্যে কাজ করে, সাহিত্য করতে হলে ঢাকায় গিয়ে করতে হবে। আর ঢাকায় যদি সে সুযোগ পায়, সে মনে করে হ্যাঁ আমি এখন মূল ধারায় এসেছি। এখন আমি সাহিত্যিক হয়েছি। আমি ঢাকার। আবার ঢাকায় যারা সাহিত্য করেন তাঁরা বাইরের জেলাগুলোর সাহিত্যকে অনেক সময় মনের অজান্তেই ছোট করে দেখেন। তিনি কুড়িগ্রামের সাহিত্যিক অথবা তিনি কিশোরগঞ্জের সাহিত্যিক কিন্তু সাহিত্যতো কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম বা চট্টগ্রামের সীমারেখায় প্রার্থক্য করা যাবে না। তিনি যেখান থেকেই লিখুন ভালো লিখছেন, সুতরাং তিনি বাংলাভাষার সাহিত্যিক। একইভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণেই আমাদের সংস্কৃতিও কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। সাহিত্যও কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।।

আফসার নিজাম : মানে আমাদের মানুষিকতা এক কেন্দ্রীক হয়ে আছে। বিকেন্দ্রীক হয়নি। এই যে আমরা পুরো বাংলাদেশকে সমানভাবে এগিয়ে নিতে পারিনি এটা কি স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা হিশেবে দেখবো।।

ফারুক হোসেন : এটা ব্যর্থতা এবঙ সাত্যিকার ভাবে বলতে গেলে, যাঁদের হাতে দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে এসেছে বা আছে, প্রত্যেকে মুখে কিন্তু একথাটি বলেন, আমরা বিকেন্দ্রীকীকরন করবো। সব ছড়িয়ে দেবো। দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়ন হবে। মানুষ কর্মসংস্থান পাবে। কিন্তু কাজের সময় সবাই কেন্দ্রীভূত হওয়াটাকেই পছন্দ করে।।

আফসার নিজাম : এতোক্ষণ আমরা যে কথাগুলো বললাম তা মানুষের জীবনের সাথে মানুষের কর্মকাণ্ড যে জড়িয়ে আছে তা নিয়ে আলোচনা করলাম। এবার একটু সাহিত্যের দিকে যাই। আচ্ছা সাহিত্যের এতোগুলো শাখা থাকতে আপনি শিশু সাহিত্যকই বেছে নিলেন কেনো??

ফারুক হোসেন : আমি কিভাবে শিশুসাহিত্য এসেছি, বলা মুসকিল। মনের অজান্তেই এটাকে ভালো লেগে গেছে। এই ভালো লাগার সুত্র আমি কখনো কখনো খুঁজে পাই। আমি প্রথমে পছন্দ করেছি ছড়া লিখতে। যেহেতু ছড়াকে আমরা মনে করি ছোটদের সাহিত্য, সেহেতু আমি ছোটদের জন্য লেখালেখি শুরু করি। ছোটদের জন্য ছড়া লিখতে গিয়ে আমি ছোটদের জন্য গল্পও লিখেছি। ছোটদের জন্য প্রবন্ধ লিখেছি এবঙ এই জায়গাটায় আমি যখন কাজ করছি তখন আমার মনে হলো, নির্দিষ্ট একটি জায়গায় কাজ করা উচিৎ। যে জায়গাটা আমার ভালোলাগে এবঙ যে জায়গায় আমি কাজ করে সফলতা পাচ্ছি, আমার সেখানেই থাকা উচিৎ। সব জায়গায় কাজ করলে মাত্রাহীন হয়ে যাবার অবস্থা সৃষ্টি হয়।।

আফসার নিজাম : মানে সৃষ্টির ক্ষমতাটা ভাগ হয়ে যায়।।

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ ভাগ হয়ে যায়। প্রত্যেকটি মানুষেরই দক্ষতা বা কর্মপরিধির একটা সীমাবন্ধতা আছে। আমি অনেক কিছু করতে চাইলেই পারবো না। কারণ সৃষ্টিকর্তার মতো আমাদের ক্ষমতা অসীম নয়; আমাদের ক্ষমতা সসীম সুতরাং আমি একটি জায়গায় কাজ করতে চাই।।

আফসার নিজাম : তাহলে কি বলবো আপনার ভেতরে শিশু খেলা করে। সেটা আপনাকে প্রতিনিয়ত সৃষ্টির তারনা সৃষ্টি করে।।

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ সেটাই আমাকে প্রতিনিয়ত শিশুসাহিত্য করতে বাধ্য করে। আমার ভালো লাগাটা কিন্তু ওখান থেকেই আসে। শিশুসাহিত্য মার্জিত সাহিত্য, শিশুসাহিত্য পরিচ্ছন্ন সাহিত্য। শিশুসাহিত্যকে নিয়ে রাজীনতি করার কোনা সুযোগ থাকে না। শিশুসাহিত্যটা একদম নিরেট, নিটোল, ইনোসেন্ট।।

আফসার নিজাম : ইনোসেন্ট দিকটা আপনার ভেতরও খেলা করে। এই খেলাটাই কি আপনি ক্রমাগত খেলছেন??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ। আমি খেলছি। আমার শিশুসাহিত্য বা আমার ছড়া, আমার গল্পে এই প্রভাব আছে। যাঁরা আমার লেখা পড়ে বা পড়ে থাকে, তাঁরা আমার লেখাতে আমার চিন্তা-ভাবনা, আদর্শ, নৈতিকতা, সততা, সৌন্দর্যবোধ দেখতে পাবেন।।

আফসার নিজাম : এটা একটা ইউনিভার্সেল বিষয়। আমি আপনার লেখায় দেখি। ইউনিভার্সেল চিন্তাটা বিশ্বব্যাপী একই রকম। আর একটি কথা। বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্য তেমনভাবে বিকশিত হয়নি বলেই আমি মনে করি। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকে শিশুসাহিত্য অত্যন্ত পিছিয়ে। আর এজন্যই আমাদের যৌবনে যে জ্ঞান অর্জন করার কথাছিলো সেই জ্ঞানটি এখন আর বেড়ে ওঠছে না। জ্ঞান শূন্য একটি সমাজ ক্রমান্নয়ে সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হয়।।

ফারুক হোসেন : এর একটা কারণ হলো প্রত্যেকটি দেশেই সাহিত্যের একটা অথরটি থাকে; কর্তৃত্ব যাঁদের হাতে থাকে। যদিওবা সাহিত্যের স্বীকৃতি দেবার তাঁরা কেউ নন, কিন্তু তাঁদের হাতে এমন একটা ক্ষমতা থাকে, তাঁরা চাইলে শিশুসাহিত্যের প্রসার বা প্রচার করতে পারে। কিন্তু তাঁরা শিশুসাহিত্যের প্রতি সব সময় অবজ্ঞা করে। শিশুসাহিত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা মূলক অনুষ্ঠান করা বা শিশুসাহিত্যকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে অথরটির রয়েছে অবহেলা এবঙ শিশুসাহিত্যকে শিশুদের হাতে তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের পরিবারের রয়েছে অবহেলা; সে কারণেই কিন্তু শিশু পাঠক বেড়ে ওঠছে না। একটা দিক থেকেতো আছেই যে আমাদের তথ্য প্রযুক্তির দিকে শিশুরা এখন দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। পড়ার চেয়ে দেখতে তাদের বেশি ভালো লাগে।।

আফসার নিজাম : মানে ইমেজের দিকে??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ ইমেজের দিকে। ছবি দেখছে, কমপিউটার মাউস নিয়ে খেলছে, সময় কাটাচ্ছে। তাই একটি বইয়ের দিকে চোখ রাখার সময় নাই তার। আর সাধাণত যে বয়সে শিশুরা পড়বে; সে বয়সে অনুকরণপ্রিয় থাকে। দেখে আমার বাবা পড়ছে কিনা! মা পড়ছে কি না! ভাই পড়ছে কিনা! তারাই যখন পড়বে না। যে শিশুটি আজকে আসছে বা এখন পড়ার সময় হয়েছে সেও পড়বে না। কারণ সেতো অনুকরণ করছে বা অনুস্মরণ করছে। এই না পড়তে না পড়তে আমাদের সমগ্র শিশুজগতের মননশীলতা, সৃষ্টিশীলতা, অনুধাবণশক্তি, অনুভূতি কিন্তু ভোতা হয়ে যাচ্ছে; মরে যাচ্ছে এবঙ আমরা সামাজিকভাবেও লক্ষ্য করছি এখন শিশুরা সামাজিকভাবে সবার সাথে মিশতে পারে না। বিচ্ছিন্ন থাকে, কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না। অফমোডে থাকতে পছন্দ করে। বন্ধুদের সাথে যে কথাবার্তাগুলো বলে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। একজন আত্মীয় এলে তাঁর সঙ্গে আগে আমরা ছুটে বেড়িয়েছি। তাঁর কোলে গিয়েছি; তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁকে পেয়ে আমরা আনন্দিত হয়েছি এবঙ আমার সে আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে আমি আনন্দিত হয়েছি। এখনকার শিশুরা কিন্তু তার পরিবার-পরিজন এবঙ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাকেও পছন্দ করে না এবঙ খুব কষ্ট হলেও আমাকে কথাটা বলা হচ্ছে আজকের শিশুরা তাদের আগের প্রজন্মকে কখনো কখনো মুর্খভাবে। কিন্তু জন্মদাতা কখনো মুর্খ হতে পাড়ে না; একটা শিশুর কাছে। তারা তাদের বাবা-মা’কে মুর্খ মনে করে কিন্তু বাবা মা’র যে অনুভূতি, যে আবেগ; সেই দিকটা অনুধাবন করার শক্তি তাদের হয় না। তাদের দরকার পড়ছে না।।

আফসার নিজাম : এটা কি অনেকটা তার অভিবাবকের ওপর বর্তায় না? তিনি তাঁর সন্তানকে নৈতিকজ্ঞানে জ্ঞানী করে তুলতে পারেননি??

ফারুক হোসেন : অভিবাবকের ওপর বর্তায়। কিছু কিছু কাজ আছে অভিবাবক নীতির মধ্যে পড়ে করে। যেমন সরকার পরিচালনায় বা রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা আছেন তাঁরা যদি এমন একটা নিয়ম তৈরি করেন। হ্যাঁ ছোটদের পড়তে হবে। তখন পরিবারে একটা চাপ আসবে; পরিবার বাধ্য হবে শিশুর মনন গঠনে, এটা আমাদের বুঝতে হবে। যাঁরা কর্তৃত্ব রাখেন তাঁদেরকে বুঝতে হবে আমাদের শিশুরা ঠিক কিভাবে মননশীলতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এমন কিছু নীতি করতে হবে যাতে শিশুরা পাঠ করে। আর আজকের পড়ার বিমুখ হওয়ার মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে। একাডেমিক পড়ার এতো চাপ, এতোটা বিশাল পরিধির পড়া-শোনা তাদের দেয়া হয়েছে, তারা অন্য কিছু পড়তে চাইলেও পড়তে পারবে না। সুতরাং এর জন্য দায়ি পরিবার, রাষ্ট্র সবাই।।

আফসার নিজাম : আপনাদের সময়ে একাডেমিক পাঠ অল্প হলেও একাডেমির বাইরের পাঠ ছিলো বিশাল। এখন ঠিক উল্টো হয়েছে। একাডেমিক পাঠ বিশাল হয়েগেছে, একাডেমির বাইরের পাঠ ছোট।।

ফারুক হোসেন : নেই। নেই বললেই চলে। কারণটা সময় নেই।।

আফসার নিজাম : এতে কি আমরা শিশুর সময়কে হরণ করছি না??

ফারুক হোসেন : আমরা তাদের অধিকারকে হরণ করলাম এজন্য আমরা অপরাধী, আমরা অপরাধী। একটি শিশু বিকশিত হচ্ছে না। শিশু পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করছে না। তারতো মানসিকভাবে বিকাশ লাভ করতে হবে? মনস্তাত্বিকভাবে বিকাশ লাভ করতে হবে। শারিরীকভাবে বিকাশ লাভ করতে হবে। জ্ঞান-বুদ্ধির ক্ষেত্রে বিকাশ লাভ করতে হবে। শারিরীকভাব সে বড় হচ্ছে। মানসিকভাবে বড় হচ্ছে না।।

আফসার নিজাম : একটার পর একটা ক্লাস উত্তরণ করে যাচ্ছে কিন্তু তার সাথে কথা বললে বুঝা যাবে, তার জ্ঞানের পরিসীমা খুবই ছোট। কিছুক্ষণ আগে আপনি টেকনোলজির কথা বলেছিলেন। সে ইমেজ দেখতে পছন্দ করে। মাউস নিয়ে নাড়াচারা করতে পছন্দ করে। এই ইমেজটাকে আমরা তাদের উপযোগি করে তোলতে পারি না? বাংলাদেশে শিশু-কিশোর উপযোগি কোনো ওয়েবসাইট নেই। আমাদের পাশের দেশ ভারত পাকিস্তানে কিছু আছে কিন্তু বাংলাদেশে শিশু-কিশোর উপযোগি ওয়েবসাইট বা ব্লগ নেই। যেখানে শিশুরা নিজেরাই লিখবে নিজেদের কথা, আদান-প্রদান করবে মনের ভাব??

ফারুক হোসেন : সে রকম নেই। এখানে আমার বক্তব্যে হয়তো একটা ভুল ব্যাখ্যা আসতে পারে। সেটা হলো আমার তথ্য-প্রযুক্তির সাথে কোনো বিরোধ নেই। পৃথিবীর কোনো দেশেই তথ্য-প্রযুক্তিতে পিছিয়ে নেই এবঙ শিশুরাও সাহিত্য পড়ে। তারা কিন্তু হার্ডওয়ার, সফটওয়ার দুটেইকেই ভালোবাসে এবঙ হার্ডওয়ারের গুরুত্ব যে অনেক বেশি সফটওয়ারের চেয়ে তা তারা জানে। তথ্য প্রযুক্তিতে আমি সফটওয়ার ধারন করছি কিন্তু হার্ডওয়ারের গুরুত্ব আমি সমানভাবে দেখছি। কারণ আমার সফটওয়ার যে কোনো সময় ক্রাস করতে পারে; যে কোনো সময় এটা হারিয়ে যেতে পারে। এর বিপরীত অবস্থানের জন্যই হার্ডওয়ারের গুরুত্ব অনেক বেশি। আর এটা আজীবন সংগ্রহিত থাকবে। যতো দিন এই পৃথিবী আছে। সুতরাং হার্ডওয়ারের গুরুত্ব আছে। আর অন্যান্য দেশের শিশুরা কিন্তু কমিকস পড়ছে, গল্প পড়ছে, বিভিন্ন ধরনের সাহিত্য পড়ছে। পাশাপাশি তারা আইটিতেও এক্সপার্ট।।

আফসার নিজাম : হেরি পটার্সের মতো বড় বড় ভলিয়ম মুহূর্তেই পড়ে শেষ করছে??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ কিন্তু বাংলাদেশের শিশুরা শুধুমাত্র এক দিকে চলে যাচ্ছে।।

আফসার নিজাম : ইমেজের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই ইমেজ সংস্কৃতি কি একটা সামাজিক প্রবেলেম হয়ে দাঁড়াচ্ছে? তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎপ্রজন্মের কি হবে? ঐযে বলে নগর সংস্কৃতি মানুষকে এক কেন্দ্রীক করে গড়ে তোলে। আমরা কি সেই কেন্দ্রীকতায় পড়ে যাবো??

ফারুক হোসেন : এমনিতেতো এককেন্দ্রীক হয়ে আছি আমরা। আর এভাবে ক্রমান্বয়ে আমাদের একটা মেধাহীন জাতি তৈরি হবে। এখানে বিল্ডিং হবে; রাস্তা হবে; গতি বাড়বে; মানুষের জীবন-যাপনে চাকচিক্ক আসেব। আসলে এটা একটা মেধাহীন সভ্যতা হয়ে দাঁড়াবে। একটা মেধাহীন জাতি হয়ে দাঁড়াবে।।

আফসার নিজাম : এই মেধাহীন জাতিকে মূল রাস্তায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলা-ভাষা-ভাষি মানুষের চলার পথ যেটা ছিলো। সেই পথে নিয়ে আসার জন্য সাহিত্য একটা গুরুপূর্ণ অবস্থানে আছে। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহিত্যিকদের ভূমিকা অনেক বেশি। সাহিত্যকরা এই বিষয়ে কিভাবে কমিনিকেশন করবে বা প্রযুক্তির পথ এবঙ সৃজনশীলতার পথকে সমন্বয় করার জন্য কি করতে পারে??

ফারুক হোসেন : ভূমিকা বেশি কিন্তু কোনো কাজ করা যাচ্ছে না। কারণ হলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, প্রতিটি জায়গায় বিভক্ত হয়ে গেছে। সাহিত্যিকরা বিভক্ত, সংগীত শিল্পীরা বিভক্ত, কবিরা বিভক্ত, প্রশাসকরা বিভক্ত। রাজনীতিকরা বিভক্ত হবেন এটা ঠিক আছে। রাজনীতিবিধরা হলেন রাজ নীতির ক্ষেত্রে প্রতিযোগি। একদল আরেক দলের সাথে প্রতিযোগিতা করবেন। তারপর জনগণের ভোট নিয়ে একটি দল ক্ষমতায় আসবেন। এখানে প্রতিযোগিতা ঠিক আছে। বাট। এটা ছাড়া বাকি জায়গাগুলোতে কিন্তু ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিৎ। কিন্তু ঐক্য বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে। ঐক্য গঠন করা যায় নিশ্চয়। সাহিত্য এই ঐক্য গঠন করতে পারে।।

আফসার নিজাম : যেভাবে আফ্রিকার ফুটবল খেলা তাদের গোত্রতান্ত্রিকতা ভেঙে একতাববদ্ধ করেছে। আমরা কি এরকম কোনো কিছু করতে পারি না। সেটা কি সাহিত্যিকদের মাধ্যমে হতে পাড়ে না? সাহিত্যিকরা ভালো সাহিত্য লিখলো। তার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হাওয়া মন তৈরি করলো।।

ফারুক হোসেন : অবশ্য আমাদের দেশেও করা যেতে পারে। আমাদের দেশে সে রকম ডাক কে দেবে! আর কে আসবে! কখন আসবে! আমি জানি না। আমাদের যাঁরা অগ্রজ সাহিত্যিক তাঁদের মধ্যে আমি সে রকম কোনো উদ্যোগ দেখছি না বা সেরকম কোনো হাহাকার বা হাপিতেসও দেখছি না এবঙ পাঠক যে কমে যাচ্ছে, শিশুরা পড়ছে না। শিল্পের মননশীলতা থাকছে না। এ নিয়ে আমি কোনো উদবেগ কারো মধ্যে লক্ষ্য করি না।।

আফসার নিজাম : একটা সময় আহমদ ছফা ঐক্যের ডাক দিয়েছিলো আমরা দেখলাম ঐসময় অনেকেই তাঁর বিরোধীতা করেছে??

ফারুক হোসেন : বিরোধিতা করবে; কারণ ঐযে বিভক্তি। বিভক্তির কারণে একজনের উদ্দেশ্যকে আরেকজন এপ্রিসিয়েট করে না। এখানে আবদুল্লাহ আবু সায়িদ বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র করেছে এবঙ তার মধ্যে দিয়ে অনেক পাঠক সৃষ্টি হয়েছে, অনেকেই বই নিয়ে পড়ছে কিন্তু বর্তমানে অনেকটা স্থিমিত হয়েগেছে এবঙ এটাও আমি জানি, তার উদ্যোগকে অনেকেই পছন্দ করে না। আবার অনেকের এর সুফল পৌঁছেনি অথবা কোনো একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। সব জায়গায় সবার কাছে পৌঁছতে পারছে না। আমরা একটা সর্বজনিন উদ্যোগ চাই; সে উদ্যোগটি হয়তো সকল পাঠক সমানভাবে পছন্দ করবে।।

আফসার নিজাম : আমরা একটু অন্য দিকে যাই। লোকসাহিত্য আমাদের বিরাট ভাণ্ডার সেখান থেকে কতোটুকু নিয়ে আমরা নগর সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছি??

ফারুক হোসেন : লোকসাহিত্যতো আমাদের বেইজ। আমাদের ভিত্তি এবঙ লোকসাহিত্যের সবটাই শুদ্ধ এটা আমি বলবো না। লোকসাহিত্যের সবটাই শুদ্ধ নাও হতে পাড়ে। লোকসাহিত্যটা প্রাকৃতিক সম্পদ। যেমন খনিজ পদার্থ পাচ্ছি, লেত পাচ্ছি, গ্যাস পাচ্ছি, আবার খনিজ উৎস থেকে কিছু পাথরও পাচ্ছি। সেটাকে ভেঙে ভেঙে হয়তো টাইলস করছি বা আন্যান্য কনস্ট্রাকশনের কাজ করছি। ঠিক লোকসাহিত্য আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবঙ এই সম্পদকে কিন্তু রিফাইন করতে হয়। এ্যাস্ট্রাকশন করতে হয়। আমাকে বের করে নিয়ে আসতে হবে কোনটা আমার জন্য উপযোগি। তো এই লোকসাহিত্য থেকে ভালোসাহিত্যকে আলাদা করে নিয়ে আসা এবঙ সেটিকে বাস্তবায়ন করা। আমি মনে করি সেটিই আমার বর্তমান সাহিত্য বা সংস্কৃতি। আমরা কিন্তু এ্যাস্ট্রাকশন করি না এবঙ অনেক ক্ষেত্রে যেভাবে ছিলো সেভাবেই এসে গেছে। যেমন একটা ছড়া আছে ‘দাদার হাতে কলম ছিলো ছুড়ে মেরেছে। উফ বড্ড লেগেছে।’ এ ছড়াটি কিন্তু আমাদের লোকসাহিত্য। ঠিক লোকসাহিত্যে ছড়াটি যেভাবে ছিলো, সেভাবে আমরা ছাড়াটি ব্যবহার করছি। আরেকটি আছে যেমন ‘খেকশিয়ালের বিয়ে হবে তিন কন্যা দান।’ এরকম একটা ছড়া আছে সেটাও লোকসাহিত্য। সেটা যেরকম ছিলো সেরকমই আছে কিন্তু এই দুটি ছড়া মিনিংলেইছ এবঙ এগুলো পাঠককে বিভ্রান্ত করে। তিন চার বছরের বা পাঁচ বছরের পাঠক যখন জিজ্ঞেস করে ‘তিন কন্যা কেনো দান করা হবে।’ যদিও এর অন্য একটি অর্থ আছে। তারপর ‘কেনো বা দাদা কলম ছুড়ে মারলো। দাদাতো ডেসট্রাকটিভ, দাদা শিশুদের খেলা পছন্দ করে না। এরকম হবে কেনো? এরকম প্রশ্ন করলে তার উত্তর দেয়া যাচ্ছে না। রিদমের দিক থেকে খুব ভালো লাগে পড়তে কিন্তু অর্থহীন বা বিভ্রান্ত করতে পারে শিশুদের। এ ধরনের সাহিত্যকে বা লোকসাহিত্যকে সরিয়ে ভালো যেগুলো আছে সেগুলোকে তুলে আনাটাই হলো প্রকৃত সাহিত্যিকের কাজ এবঙ যেটা নিয়ে আসবে এবঙ আধুনিক দুটো মিলেই আমাদের সাহিত্যের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ হবে।

আফসার নিজাম : অনেকে মফসসলের সাহিত্য আর ঢাকার সাহিত্যকে বলে পার্থক্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করে??

ফারুক হোসেন : ঢাকার সাহিত্য কিংবা মফস্বলের সাহিত্য এই কনসেপ্ট আমি বিশ্বাসই করি না। বাংলাদেশের কেনো পৃথিবীর সব অঞ্চলেই কোনো না কোনো সাহিত্যের উদ্বব হয়েছে। যেটাকে আমরা লোকসাহিত্য বলতে পাড়ি। আমাদের দেশে হোক বা অন্য দেশে হোক।।

আফসার নিজাম : যেমন আইলেন্ডের সিমাসিনি। সে তো লোকসাহিত্য থেকে ওঠে আসা স্বতন্ত্র এক কবিসত্বা??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ এগুলো খুবই সমৃদ্ধ। তিনি ভালোগুলোই তুলে এনেছেন কিন্তু আমরা যাঁরা তুলে আনি; তাঁরা বাছাই করার ক্ষেত্রে ভুল করি। খনার বচনগুলো যেমন ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।’ এটা অনেক অর্থ বহন করে কিন্তু খনার ৬১টি ছড়াই ভালো বলেছেন তাতো নয়। তার মধ্যে কিছু হয়তো অপ্রসাঙ্গিকভাবে বলেছেন। যেটি বিষয়ের সাথে ম্যাচ করে না। যেটি গ্রহণযোগ্য নয়। খনার ৬১টি থেকে পারফেক্ট ৩০টি বা ৫০টি আমি পাঠ্যপুস্তকে দেবো। পড়তে দেবো। কিন্তু আমরা করি কি? খনার যে ছড়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ বা লোকসাহিত্যের যে ছড়াগুলো ত্র“টিপূর্ণ সেগুলোকে আমরা পাঠ্যপুস্তুকে দিচ্ছি। সেগুলো পড়াচ্ছে এবঙ পড়াতে পড়াতে এক সময় আমরা বলছি হ্যাঁ এটা খুব ভালো কাজ দিচ্ছে। এটাও একটা ভুল করছি। আমি একটা আলোচনা সভায় গিয়েছি; আমি এই ছড়াগুলো নিয়ে কথা বলেছি, এই ছড়াগুলো আমাদের ব্যবহার করাই উচিৎ নয়। তখন আমাদের একজন সিনিয়র, তিনি বলেছিলেন, ‘এর মধ্যে প্রাণ আছে, রস আছে; এগুলো পড়েই আমাদের শিশুরা ঘুমিয়ে পরে, শিশুরা খেলা করে এবঙ শিশুরা বড় হয়েছে সুতরাং এর বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না।’ তখন আমি বলেছিলাম, ‘আমিওতো এক সময় শিশু ছিলাম, আমিও পড়েছি এবঙ আমার সাথেও অনেক শিশুর সম্পর্ক;’ আমি বলেছি, ‘এই ছড়া ত্র“টিপূর্ণ।’ এবঙ বলেছি ‘আপনার যেমন লোকসাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে আমারও তেমনি আছে। সুতরাং আমি জানি। আমার কাছে অনেক শিশু প্রশ্ন করে ‘‘এর অর্থ কি?’’ তো সেরকম সাহিত্য আমি শিশুদের দিতে চাই না’।।

আফসার নিজাম : তাহলে আপনি চাচ্ছেন পরিশিলীত, মার্জিত, সুন্দর সাহিত্য গড়ে ওঠবে আমাদের মাঝে। এই বিষটিকে কেন্দ্র করে আর একটি বিষয়ে প্রবেশ করতে চাই। বিষয়টি সহিত্যিকদের নিয়ে। সাহিত্যিকরা সৌন্দর্যের চর্চা করে কিন্তু অনেকের ভেতর-বাইরে সেই সৌন্দর্য নেই। এই যে পার্থক্য; এটা কেনো??

ফারুক হোসেন : এমনিতেইতো আমরা মুখে বলি এক আর কাজে করি অন্য, আচরণে আমরা সবাই হলাম বন্য। আমরা কিন্তু এমনি, মুখে একটা বলি করি আরেকটা। মুখে সত্যের কথা বলি মিথ্যার চর্চা করি। মুখে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলি; কেন্দ্রীকরণের চর্চা করি। তারপর যাঁরা কবি বা লেখক তাঁরা ব্যক্তিগত বিষয়-আসয়ে সৌন্দর্যবোধ লালন-পালন করতে পারছেন না। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। সৌন্দর্যের কথা বলেন কিন্তু তাঁরা চর্চা করে না। মন এবঙ কাজ এ-দুটোকে এক করতে পারছেন না; এটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তিনিই বলতে পারবেন তিনি কেনো পারছেন না। তিনি কেনো ডিস্ট্রয়। তিনি কেনো বা কিসের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন বলে, কাজকে মনের সঙ্গে মিলাতে পারছে না।।

আফসার নিজাম : একটু আগে যেটা বলছেন মনের সথে পারছে না। কেনো? তাঁর আচরণ সমাজের অন্য ব্যক্তি বা পাঠকের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। যেমন একজন পাঠক আমাকে প্রশ্ন করলেন ‘তিনিতো দেখতে সুন্দর না। [এখানে তার পোষাক-পরিচ্ছেদ, আচার-আচরণকে বুঝিয়েছেন।] কিন্তু তাঁর লেখায় সুন্দরের কথা বলেন, তিনি নিজে নিজের জীবনটাকে পরিপাটি, সুন্দর করতে পারেন না। কিভাবে আমরা তাঁর লেখনির থেকে সৌন্দর্য আহরণ করবো??’

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ এই প্রশ্নটার উত্তরে আমি বলতে পারি যাঁরা সমাজের নির্ধারিত, অগ্রজ এবঙ উল্লেখযোগ্য মানুষ, যাঁদের আমরা আলাদাভাবে বলতে পারি তিনি অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। এরকম যিনি লিখছেন, যিনি সৃষ্টিশীল মানুষ। লেখালেখি হলো মৌলিক সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে কঠিন মাধ্যম এবঙ সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যিনি লিখছেন, বড় লেখক হয়েছেন, তিনিতো অনুকরণীয় হয়ে গেছেন; অনুস্মরণীয় হয়ে গেছেন। পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে দেখবে, তাঁর আচরণ অনুস্মরণ করবে; তাঁর কথা শুনবে; তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে লালন করার চেষ্টা করবে। সুতরাং তাঁর হওয়া উচিৎ একটা মডেল। তাঁর হাত দিয়ে কোনো খারাপ কাজ আসা উচিৎ নয় কারণ তাহলে পাঠক উদাহরণ হিশেবে বলবেন, ‘তিনিতো উটা করতেন সুতরাং আমিও করছি’। তাই এই ধরনের ব্যাক্তিদের অবশ্যই একটা মডেল হয়ে যাওয়া উচিৎ এবঙ সেটি অন্য ক্ষেত্রেও। আমি মনে করি প্রশাসনে, রাজনীতিতে, সাহিত্যে, শিল্পে যাঁরাই এরকম একটা সীমা অতিক্রম করে উল্লেখযোগ্য হয়েছেন। তাঁদের ভাবা উচিৎ হ্যাঁ আমরা এখন মডেল। আমরা এখন অনুস্মরণীয়, অনুকরণীয় সুতরাং আমাদের শতর্ক থাকা উচিৎ, যাতে আমাদের দেখে শিশুরা উৎসাহিত হয়। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এটা পুরোটাই সামাজিক পরিবেশেরই একটা প্রভাব।।

আফসার নিজাম : প্রবীণ ও নবীন সাহিত্যিকদের মাঝে চিন্তার ফাঁক তৈরি হচ্ছে। দুই প্রজন্মের চিন্তার সমন্বয় হয়ে ওঠছে না। তরুণরা পাড়ছে না প্রবীণদের শৈলীকে অনুধান করতে আর প্রবীণরা পাড়ছে না তরুণদের শৈলীকে ছুঁতে। এটা কি সমন্বয় করা যায় না??

ফারুক হোসেন : এর প্রকৃত কারণই হলো তাঁর শৈশব। আজকে যিনি সত্তর তিনি ১৯৪০-এ শিশু ছিলেন। আজকে যিনি পঞ্চাশ উর্ধ্ব তিনি ষাট থেকে সত্তরে শিশু ছিলেন। তাহলে আমি যতো সামনে এগোচ্ছি ততোই শিশুর চিন্তা-ভাবনা, সৃষ্টিশীলতা, মননশীলতা এগুলো কমে যাচ্ছে। একটিই কারণ যতোই আমরা এগুচ্ছি, ততোই আমরা কিন্তু মননশীলতার চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আজকে যাঁর সত্তর কিংবা আশি বয়স। তিনি যখন শিশু-কিশোর ছিলেন তখন তাঁর মধ্যে কিন্তু পরিপূর্ণভাবে মননশীলতা চর্চা ছিলো এর পরের জেনারেশন এসে আরো কমেছে, এর পরের জেনারেশন আরো কমেছে। তো এখন যারা শৈশব থেকে উঠে এসেছে বা পার হয়ে এসেছে তাদের চিন্তা-ভাবনা এবঙ আজকে যাঁরা পঞ্চাশ উর্ধ্ব বা ষাট উর্ধ্ব তাদের শৈশব অনেক সমৃদ্ধ। ঐ অর্থে, মননশীলতার অর্থে, সৃষ্টিশীলতার অর্থে। কিন্তু আজকের শিশুরা বা আরো পরের শিশুরা হয়তো যান্ত্রিকতায়, প্রযুক্তিতে, তথ্যে অনেক বেশি এগিয়ে; অনেক বেশি সমৃদ্ধ। মননশীলতা, সৃষ্টিশীলতা, অনুভব, অনভূতির সমৃদ্ধি এবঙ প্রযুক্তি, যান্ত্রিকতার সমৃদ্ধি এই দুটো ক্ষেত্র আসতে আসতে দ্রুত্ব তৈরি হয়েছে এবঙ সে কারণে আজকের ছোটদের সাথে বড়দের চিন্তা-ভাবনায় ফারাক তৈরি হচ্ছে।।

আফসার নিজাম : আপনার লেখালেখির অঙ্গণে আসি। আপনার লেখা লেখিতো অনেক দিন হয়ে আসলো। পঞ্চাশে পদার্পন করলেন। এই পঞ্চাশে আপনার সাহিত্যিক হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই??

ফারুক হোসেন : আমার খুবই অতৃপ্তি এবঙ খুবই কষ্ট কাজ করছে। এজন্য কষ্ট কাজ করছে, আমার বয়স এখন পঞ্চশ ছুঁই ছুঁই। ঠিক এই পঞ্চাশে আমাদের যাঁরা অগ্রজ সাহিত্যিক তাঁদের পঞ্চাশ বছরে কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেছেন। মানে আমি পঞ্চাশ বছরে পা দিয়ে যে কাজ করেছি, যে ভলিউম গড়েছি আল মাহমুদ তাঁর পঞ্চাশ বছরে আমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কাজ করেছেন। সুতরাং তাঁর যে শক্তি, তাঁর যে সাধনা, তাঁর যে প্রস্তুতি এর এক বিন্দুও কিন্তু আমরা পাইনি। এটা কিন্তু একটা অতৃপ্তি। আমার পঞ্চাশ বছরে জানান দিতে হচ্ছে; জানাতে হচ্ছে; একজনকে বলতে হচ্ছে; আমি বাংলাদেশের একজন লেখক। আপনি আমাকে চেনন না! আমার লেখা পড়েন নি? তিনি আমাকে চেনে না বা আমি লিখি এটা অনেকেই জানে না অথবা অনেক কম সংখ্যক লোকেই জানে। কিন্তু পঞ্চাশ বছরে আল মাহমুদকে সারা দেশের পাঠকরা চিনতো। পঞ্চাশ বছরে সৈয়দ হককে সারা দেশের পাঠকরা চিনতো। পঞ্চাশ বছরে শামসুর রাহমানকে সারা দেশের পাঠকরা চিনতো। কিন্তু পঞ্চাশ বছরে ফারুক হোসেনকে এক লক্ষ লোক চিনবে কি না সন্দেহ আছে।।

আফসার নিজাম : তাঁরা তো একটা জীবন উৎসর্গ করেছে সাহিত্যের জন্য। আপনি তাঁদের মতো করতে পারেন নি এটা কি সেই অতৃপ্তি??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ। তাঁদের মতো এতো বিশাল সময় আমি দিতে পারিনি। তাঁদের মতো এতো বিশাল পরিমাণ লেখা লিখতে পারিনি। তাঁদের মতো এতো জীবনবোধ সম্পন্ন, স্পর্শ করে এরকম লেখাও লিখতে পারিনি। পাঠকদের সন্তুষ্টি দেয়ার মতো কাজও করতে পারিনি। কিন্তু আমি আমার মতো করে কাজ করছি; যেটুকু পাড়ি। কতোটুকু করলাম সেটুকু পাঠকরা বলতে পারবে বাট আমি মনে করি তেমন কিছু করিনি।।

আফসার নিজাম : তা হলে কী আমরা বলবো অতৃপ্তিই সৃষ্টির বেদনা??

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ সেটাই মূলত কারণ। আমি আমার সমসাময়িকদের সাথে যদি কমপেয়ার করি; একটু আগে যেমন আমি কমপেয়ার করলাম বয়োজেষ্ঠ্যদের সাথে। কিন্তু আমি আমার সমসাময়িকদের সাথে আমাকে তুলনা করি তখন আমি আবার তৃপ্তি পাচ্ছি; পাচ্ছি এই অর্থে আমার অনেক বন্ধুরা পুরোপুরি সাহিত্যে সময় দিয়েও যেটুকু কাজ করছে আমি তার চেয়ে বেশি করছি বলবো না তবে তাদের সাথে তাল মেলানোটায় সফল হয়েছি। সাহিত্যটাকে ধরে রাখতে সফল হয়েছি।।

আফসার নিজাম : আপনি পুরোপুরি লিরিকাল। যেটা শিশুদের জন্য সবচেয়ে উপযোগি। আমরা আপনার গদ্যগুলোও দেখছি লিরিকাল মানে সুখপাঠ্য। গদ্যে-পদ্যে লিরিকাল মেলবন্ধনটা কিভাবে করলেন??

ফারুক হোসেন : এটার কারণ আমি শুদ্ধ। আমার মধ্যে কাজ করে তুমি শুদ্ধ হবে, মার্জিত হবে। একটা ঝরঝরে ভাব থাকবে, কারণ আমার প্রথম টারগেট থাকে ছোটরা পড়বে। সে কারণেই ঝরঝরে লেখা তৈরির চেষ্টা থাকে। আর আমি একজন ছড়াকার প্লাস আমি ছোটদের জন্য গল্প লেখি। আমার ভেতরে শিশু বয়সের চিন্তাটা কাজ করে সেটাই আমাকে বাধ্য করে যেনো আমি লিরিকাল লেখা লিখতে পাড়ি।।

আফসার নিজাম : আমরা আপনার ভেতর ইউনিভার্সেল, নৈতিকতার থিংকটা দেখি। গদ্যে হোক আর পদ্যে হোক এবঙ কথায় অথবা মানুষের সাথে সম্পর্কে এটা পেলেন কোথা থেকে। বা এই বোধটা আপনার ভেতরে গড়ে ওঠলো কিভাবে??

ফারুক হোসেন : এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না কিভাবে পেলাম। কিভাবে হলো। তাহলে অনেককেই বলা যেতো তুমি এভাবে করো তাহলে ওটা পাবা। আমি মাকে হারিয়েছি যখন, তখন আমার বয়স তিন। তো আমার জীবনতো মতৃহীন। আর আমার বাবা আমার কাছে খুব একটা ছিলেন না। আমি আমার দাদীর কাছেই বড় হয়েছি বা বড় বোনের লালন-পালনে বড় হয়েছি। সাধারণত এরকম মা-বাবার অনুপস্থিতে এবঙ শৈশবের পরিপূর্ণ অভিভাবকদের পরিচালনার সুযোগ না থাকলে ছোটদের বহমিয়ান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আমি সেটা হয়নি। আমি উল্টোটা হয়েছি। ছোটকালে আমাকে অনেকে উদাহরণ দিয়েছে একটা পুকুর যার চর্তুদিকে পাড়, সে রকম পুকুরেও ঢেউ ওঠে কিন্তু আমার মধ্যে কোনো ঢেউ নেই। আমার ঢেউ নেই মানে দুষ্টুমি বা চঞ্চলতা নেই। অনেকেই আমাকে সেরকম বলতো। এরপর ছাত্রজীবনে সবার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিলো এবঙ আমার জীবনটা অনেক স্টাগল জীবন ছিলো। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অ-নে-কের সহযোগিতা পেয়েছি এবঙ যাঁরা সহযোগিতা করেছেন; তা নিস্বার্থভাবে সহযোগিতা করেছেন এবঙ আমি অবাক হয়ে যাই; আমার জীবনে এতো মানুষের সহায়তা পেয়েছি যাঁরা কখনই তার বিপরীতে তখন নয় এখনও আমার কাছ থেকে কোনো কিছু চাচ্ছে না। এতো সহযোগিতা পেয়েছি এবঙ আমার প্রকৃত সহায়তাকারীরা, যাঁরা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, যাঁদের উপকার পেয়েছি, তাঁদের অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দেখাও করতে পারি না। কথাও বলতে পারি না বা কাছে যেতে পারি না। মনের অবস্থাটা প্রকাশ করতে পারিনি। এটা হয়েছে কিন্তু এই যে মানুষের ভালোবাসা, অকারণেই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, অকারণেই মানুষের সান্বিধ্য পেয়েছি এবঙ সহায়তা পেয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে হ্যাঁ, মানুষ এরকমই বোধ হয়। পৃথিবীটা বোধ হয় এরকমই। সেটাই আমাকে ওভাবে গড়ে তুলেছে।।

আফসার নিজাম : তাহলে মানুষের সাথে মানুষের যে সম্পর্ক, মানুষের জন্য মানুষের যে ভালোবাসা এটাই আপনাকে নৈতিকতার দিকে ধাবিত করেছে।।

ফারুক হোসেন : অবশ্যই। মানুষের সম্পর্কই কিন্তু মানুষেকে ভালো হতে শেখায়।।

আফসার নিজাম : মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক মধুর হোক আমরা এই কামনা করেই শেষ করতে পারি।।

ফারুক হোসেন : হ্যাঁ সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা দিয়ে আমার কথা শেষ করছি।।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

4 Responses to ছড়াকার ফারুক হোসেনের সাক্ষাৎকার

  1. সাক্ষাৎকারটি পড়ে ভালো লাগলো। ছড়াকারের মতামত এবং তাঁর সমন্ধে জেনে খুশি হলাম।
    :rose:

    রাজন্য রুহানি
    মে 4, 2011 at 3:51 অপরাহ্ন

  2. একজন ছড়াকারের অনুভূতি সমন্ধে ধারনা হল। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া।
    :rose:

You must be logged in to post a comment Login